হোয়াটসঅ্যাপে আসা ‘হ্যালো... আমি দিব্যা বলছি’- সাধারণ এই একটি মেসেজের ফাঁদে পা দিয়ে জীবনের সব উপার্জন হারিয়েছেন এক বৃদ্ধ। তথাকথিত ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগের প্রলোভনে পড়ে ওই বৃদ্ধ ও তার পরিচিতরা মিলে হারিয়েছেন ২১ কোটি ৬ লাখ রুপি, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ২৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের গোয়ালিয়রের এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা বর্তমানে দেশটির অন্যতম বৃহৎ ক্রিপ্টোকারেন্সি জালিয়াতি হিসেবে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।

ভুক্তভোগী অশোক বিজয়বর্গীয় গোয়ালিয়রের একজন প্রবীণ চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (সিএ) ও রাজ্যের চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রধান রিটার্নিং অফিসার। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে তার মোবাইলে ‘দিব্যা’ পরিচয় দিয়ে এক নারী বিনিয়োগ উপদেষ্টার বার্তা আসে। প্রথমে ভারতীয় নম্বর থেকে যোগাযোগ শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ভার্চুয়াল নম্বর থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয়।

আরও পড়ুন

ব্যাংক থেকে ৩ হাজার টাকা তুলতে গিয়ে অ্যাকাউন্টে পেলেন ৭৫৯ কোটি!

প্রতারকরা তাকে একটি ভুয়া অনলাইন ট্রেডিং পোর্টালে যুক্ত করে ইউএসডিটি (USDT) ও বিটকয়েনে বিনিয়োগের মাধ্যমে বিপুল মুনাফার লোভ দেখায়। বৃদ্ধের বিশ্বাস অর্জনের জন্য শুরুতে ছোট অঙ্কের বিনিয়োগের বিপরীতে ১ লাখ ৮৮ হাজার রুপি সরাসরি তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ফেরত পাঠানো হয়। এই টোপেই গলে যায় বৃদ্ধের মন ও তিনি পোর্টালটিকে আসল বলে বিশ্বাস করে বসেন। এরপরই তিনি সেখানে কোটি কোটি টাকা ঢালতে শুরু করেন। শুধু তিনি একাই নন, তার আর্থিক সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা রেখে তার প্রায় ৩৫ জন ব্যবসায়ী অংশীদার ও পরিচিতজনও এই ফাঁদে অর্থ বিনিয়োগ করেন।

২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুলাইয়ের মধ্যে দফায় দফায় মোট প্রায় ২১ কোটি ৫ লাখ ৯২ হাজার রুপি হাতিয়ে নেয় প্রতারক চক্রটি। এর বিপরীতে ভুয়া পোর্টালে তাদের অবাস্তবভাবে প্রায় ৩৩ কোটি ২৫ লাখ রুপি মুনাফা দেখানো হয়। তবে বিপত্তি ঘটে যখন তিনি সেই টাকা তুলতে যান।

প্রতারকরা টাকা তোলার পূর্বশর্ত হিসেবে আয়কর বাবদ আরও ১০ কোটি ৮৪ লাখ টাকা দাবি করে ও পরবর্তী সময়ে ‘রিস্ক মার্জিন’ হিসেবে আরও ১ কোটি রুপি দাবি করে। তখনই বৃদ্ধ বুঝতে পারেন যে তিনি এক মহাপ্রতারণার শিকার হয়েছেন।

আরও পড়ুন

বন্যায় ভেসে গিয়ে যেন বিপদে পড়েছে সাপ, কাড়াকাড়ি করে ধরছে মানুষ

তদন্তে নেমে গোয়ালিয়র স্টেট সাইবার সেল দেখতে পায়, এই বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিতে প্রতারকেরা অত্যন্ত জটিল চার স্তরের ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেছে। জালিয়াতির অর্থ দ্রুত ছড়িয়ে দিতে দেশজুড়ে ২০ হাজার ৪৯টি ডিজিটাল লেনদেন করা হয়েছে।

প্রথম স্তরে ৭৭টি অ্যাকাউন্ট, দ্বিতীয় স্তরে ৪৯৩টি, তৃতীয় স্তরে ১২ হাজার ৭০০টি ও চতুর্থ স্তরে প্রায় ৭ হাজার ৫০০টি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে টাকা মুহূর্তের মধ্যে রূপান্তর ও এটিএমের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়েছে। কর্নাটক, তামিলনাড়ু, উত্তরপ্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গসহ দেশের ১২টি রাজ্যে এই চক্রের ‘মানি মিউল’ বা ভাড়ায় চালিত অ্যাকাউন্টের সন্ধান মিলেছে।

এরই মধ্যে জাতীয় সাইবার ক্রাইম পোর্টাল ও ১৯৩০ হেল্পলাইনের সহায়তায় সাইবার পুলিশ প্রায় ২ কোটি টাকা ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৩১৮(৪) ও ৩১৯(২) ধারা ও তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৬ডি ধারায় মামলা রুজু করে পুলিশ এখন মূল হোতাদের সন্ধানে আইপি অ্যাড্রেস ও হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরগুলো ট্র্যাক করছে।

সূত্র: এনডিটিভি

এসএএইচ