‘শ্রাবনের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে
অঝোরে নামবে বুঝি শ্রাবণে ঝরায়ে,
আজ কেন মন উদাসী হয়ে
দূর অজানায় চায় হারাতে’
নব্বই দশকের জনপ্রিয় ব্যান্ড ডিফারেন্ট টাচ-এর এই গানটি এখনও শ্রাবণের কথা মনে করিয়ে দেয়। গীতিকার আলী আশরাফ বাবুর কথায় এবং আলী আহমেদ বাবুর কণ্ঠে গাওয়া গানটি একসময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। শ্রাবণ মানেই যেন মেঘ, বৃষ্টি আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য- গানটি এ অনুভূতিকেই জীবন্ত করে তোলে।
আষাঢ়ের বিদায়ের পর বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) শুরু হলো বাংলা বছরের বর্ষামুখর মাস শ্রাবণ। অতীতে বহুবার দেখা গেছে, শ্রাবণের প্রথম দিনে আকাশ সাধারণত মেঘলা থাকে। কোথাও রিমঝিম, কোথাও ঝুম বৃষ্টি, আবার কখনও ভ্যাপসা গরম-সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন নতুন রূপে ধরা দেয়।
এবারও শ্রাবণের প্রথম দিনে রাজধানীর আকাশে দেখা মিলেছে সেই চিরচেনা দৃশ্যের। সকাল থেকে কখনও কালো মেঘ, কখনও হালকা গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি, আবার কখনও মেঘ সরিয়ে উঁকি দিয়েছে ঝলমলে রোদ।
অবশ্য সদ্য বিদায় নেওয়া আষাঢ় ছিল ব্যতিক্রমী। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মাসজুড়ে প্রকৃতির আচরণ ছিল অস্বাভাবিক। দেশে বছরে গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ২ হাজার ২০০ মিলিমিটার হলেও, আষাঢ়ের শেষ সাত দিনেই শুধু চট্টগ্রাম বিভাগে রেকর্ড হয়েছে ১ হাজার ৪৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত। সেই অস্বাভাবিকতার পর শ্রাবণের প্রথম দিন যেন অনেকটাই ফিরিয়ে এনেছে বর্ষার পরিচিত আবহ।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও হালকা বৃষ্টি হয়েছে, আবার কোথাও এক ফোঁটাও পড়েনি। কোনো এলাকায় রাস্তা ভেজা, কোথাও আবার শুকনো। একই শহরে কয়েক কিলোমিটারের ব্যবধানে আবহাওয়ার এমন ভিন্নতা ছিল চোখে পড়ার মতো।
লালবাগের বাসিন্দা আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, সকালে মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দিতে যাওয়ার সময় আকাশ ছিল কালো মেঘে ঢাকা। মনে হচ্ছিল যে কোনো মুহূর্তে বৃষ্টি নামবে। কিন্তু বৃষ্টি হয়নি। আবার দুপুর দেড়টার দিকে মেয়েকে বাসায় নিয়ে ফেরার সময় দেখা যায় ঝকঝকে রোদ।
নীলক্ষেতে বই ব্যবসায়ী এবং ধানমন্ডির বাসিন্দা হাবিবুর রহমান হাবিব জানান, গত কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে তারা ব্যবসায়িকভাবে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সকালে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় আবারও অঝোরে বৃষ্টি হবে কি না, সেই দুশ্চিন্তা ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ভারী বৃষ্টি হয়নি। ক্রেতার উপস্থিতিও মোটামুটি ছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক আনসার আলী জানান, শাহজাহানপুর থেকে যাত্রী নিয়ে আসার সময় হালকা বৃষ্টি শুরু হওয়ায় যাত্রীর জন্য রিকশার পর্দা নামিয়ে দেন। কিন্তু হাতিরপুলে পৌঁছাতেই দেখা যায় ঝলমলে রোদ। বর্ষাকালে কখন যে বৃষ্টি নেমে আসে, তার ঠিক নেই। তাই সবসময় যাত্রীর জন্য পর্দা এবং নিজের জন্য রেইনকোট সঙ্গে রাখেন।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার দুপুর ১টা থেকে পরবর্তী ৬ ঘণ্টায় ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার আকাশ আংশিক মেঘলা থেকে মেঘলা থাকতে পারে। কোথাও কোথাও বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে ঘণ্টায় ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার বেগে বাতাস প্রবাহিত হতে পারে। দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় ঢাকায় তাপমাত্রা ছিল ৩২ দশমিক ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৬১ শতাংশ। এর আগের ছয় ঘণ্টায় হিসাবযোগ্য কোনো বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়নি। কারণ, ০ দশমিক ১ মিলিমিটারের কম বৃষ্টিপাতকে আবহাওয়ার ভাষায় ‘ট্রেস’ বা সামান্য বৃষ্টি বলা হয়, যা পরিমাপযোগ্য বৃষ্টিপাত হিসেবে রেকর্ড করা হয় না।

তবে, শ্রাবণের আসল রূপ দেখা এখনও বাকি। এই মাসের প্রধান আকর্ষণই হলো টানা মুষলধারে বৃষ্টি। কখনও ঝিরিঝিরি, কখনও প্রবল বর্ষণ, আবার কখনও ঝড়বৃষ্টি- এসবই শ্রাবণের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। বৃষ্টির জলে সতেজ হয়ে ওঠে প্রকৃতি। গাছপালা, ঘাস ও ফসলের ক্ষেত ধারণ করে গাঢ় সবুজ রং। নদী, খাল ও বিল পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এ সময় ফুটতে শুরু করে কদম, কামিনী, জুঁই, বেলি ও হাসনাহেনার মতো বর্ষার ফুল। তাদের সুবাসে ভরে ওঠে চারপাশ। ঘন কালো মেঘে আকাশ ঢেকে যায়, বিদ্যুতের ঝলকানি আর মেঘের গর্জন যেন জানিয়ে দেয় বাংলার প্রকৃতিতে তার নিজস্ব চিরচেনা রূপ নিয়ে শ্রাবণ এসে গেছে।
আগামী দিনগুলোতে শ্রাবণ মাসের বাকি দিনগুলো কীভাবে ধরা দেয় তা দেখার অপেক্ষায় থাকতে হবে।
এমইউ/এএমএ








