• উদ্বোধনের পরদিন থেকেই অচল
  • নষ্ট স্বয়ংক্রিয় মোটর
  • ভেতরের অংশে জমেছে বৃষ্টির পানি

বছরখানেক আগে দেশে প্রথমবারের মতো তৈরি হয়েছিল রেলের ইঞ্জিন ও কোচ ঘোরানোর ‘টার্ন টেবিল’। তবে যে উদ্দেশ্য নিয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল, তা ভেস্তে গেছে উদ্বোধনের পরদিনই। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে অকেজো হয়ে পড়ে থাকা কোটি টাকার এই প্রকল্পটি এখন রেলওয়ের চরম উদাসীনতার সাক্ষী।

রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে টার্ন টেবিলের ভেতরের অংশজুড়ে জমেছে বৃষ্টির পানি, যা রূপ নিয়েছে মশা ও ব্যাঙের এক মিনি জলাশয়ে। নষ্ট হয়ে গেছে এর স্বয়ংক্রিয় মোটর। এ অচল অবস্থার কারণে প্রতি দুই থেকে তিন মাস পরপর ট্রেনের ইঞ্জিন ও কোচ ঘোরানোর জন্য লালমনিরহাট থেকে নিয়ে যেতে হচ্ছে ঢাকায়। এতে অর্থ ও সময় দুটোই অপচয় হচ্ছে।

রেলওয়ের উদাসীনতা, কোটি টাকার প্রকল্পে মশা-ব্যাঙের বাসা

‘আধুনিক এই প্রযুক্তিটি এখন পুরোপুরি পরিত্যক্ত। টার্ন টেবিলের চারপাশের বিশাল গর্তে জমে আছে বৃষ্টির পানি। সেখানে মশা ও ব্যাঙ আবাসস্থল গড়ে তুলেছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের যেন এদিকে কোনো নজরই নেই। অথচ কর্তৃপক্ষ শুরুতে বলেছিল, ইঞ্জিন না হলেও অন্তত বগি বা কোচগুলো এখানে ঘোরানো যাবে। বর্তমানে সেটিও সম্ভব হচ্ছে না’

আরও পড়ুন

দেশে প্রথম তৈরি হলো রেলের ইঞ্জিন ও কোচ ঘোরানোর ‘টার্ন টেবিল’

রেলওয়ে সূত্র জানায়, লালমনিরহাট রেলওয়ে স্টেশন থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরে টার্ন টেবিলটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত লালমনিরহাটের পুরোনো টার্ন টেবিলটি প্রায় ৩০ বছর আগে বিকল হয়ে যাওয়ার পর এটি ছিল একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ। পরীক্ষামূলকভাবে চালানোর পর ২০২৫ সালের ২৬ মে এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু বিধি বাম! উদ্বোধনের ঠিক পরদিনই এর অটোমেশন ব্যবস্থায় বড় ধরনের ত্রুটি ধরা পড়ে। এরপর থেকে এটি আর সচল করা যায়নি।

রেলওয়ের উদাসীনতা, কোটি টাকার প্রকল্পে মশা-ব্যাঙের বাসা

সরেজমিন দেখা গেছে, আধুনিক এই প্রযুক্তিটি এখন পুরোপুরি পরিত্যক্ত। টার্ন টেবিলের চারপাশের বিশাল গর্তে জমে আছে বৃষ্টির পানি। সেখানে মশা ও ব্যাঙ আবাসস্থল গড়ে তুলেছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের যেন এদিকে কোনো নজরই নেই। অথচ কর্তৃপক্ষ শুরুতে বলেছিল, ইঞ্জিন না হলেও অন্তত বগি বা কোচগুলো এখানে ঘোরানো যাবে। বর্তমানে সেটিও সম্ভব হচ্ছে না।

আরও পড়ুন

সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টেশন / ছোটদের নামতে হয় লাফ দিয়ে, বয়স্কদের কোলে করে

রেলওয়ে প্রকৌশলীদের মতে, ট্রেনের একটি ইঞ্জিন বা কোচ দীর্ঘদিন একই অভিমুখে চললে চাকার একদিকে অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং চাকা দ্রুত ক্ষয় হয়। নির্দিষ্ট সময় পরপর ইঞ্জিন ও কোচ ঘুরিয়ে দিলে চাকার ওপর সমান চাপ পড়ে। ফলে যন্ত্রাংশের আয়ু বাড়ে। এছাড়া বেশিরভাগ লোকোমোটিভের চালকের কেবিন (ক্যাব সাইড) একদিকে বেশি কার্যকর থাকে। টার্ন টেবিলে ইঞ্জিন ঘুরিয়ে চালকের কেবিন সামনের দিকে রাখা হলে চালক সহজে রেললাইন ও সিগন্যাল দেখতে পারেন, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।

‘বর্তমানে উত্তরাঞ্চলের এই রেল বিভাগে ইঞ্জিন ও কোচ ঘোরানোর নিজস্ব কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেই। ফলে বাধ্য হয়ে প্রতি দুই-তিন মাস পরপর ইঞ্জিনগুলো ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনের টার্নটেবিলে ঘুরিয়ে আবার লালমনিরহাটে ফিরিয়ে আনতে হচ্ছে। এতে রেলওয়ের অতিরিক্ত জ্বালানি, সময় ও বিপুল অর্থ অপচয় হচ্ছে’

রেলওয়ের উদাসীনতা, কোটি টাকার প্রকল্পে মশা-ব্যাঙের বাসা

সহকারী লোকোমোটিভ তাজুল ইসলাম রাজু জাগো নিউজকে বলেন, ‌‘টার্ন টেবিলটি চালু থাকলে ইঞ্জিন ও কোচ ঘোরানোর জন্য আমাদের কষ্ট করে কমলাপুরে যেতে হতো না। ইঞ্জিনের ক্যাব সাইড সবসময় সামনে থাকলে আমরা রেললাইন ও সিগন্যাল আরও ভালোভাবে দেখতে পারি, যা নিরাপদ ট্রেন পরিচালনার জন্য জরুরি।’

আরও পড়ুন

স্বপ্নের রেলপথ এখন মৃত্যুফাঁদ

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অটোমেটিক টার্ন টেবিলটি নির্মাণ করে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগের সাবেক বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী (ডিএমই-ক্যারেজ অ্যান্ড ওয়াগন) তাসরুজ্জামান বাবু ২০২৪ সালে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ‘শ্রেষ্ঠ উদ্ভাবক’ সম্মাননাসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পেয়েছিলেন। অথচ কাজে লাগোনো যাচ্ছে না তার এ উদ্ভাবন।

রেলওয়ের উদাসীনতা, কোটি টাকার প্রকল্পে মশা-ব্যাঙের বাসা

‘কেন এই আধুনিক প্রযুক্তি অকেজো হয়ে রইল’—এমন প্রশ্নের জবাবে লালমনিরহাট রেলওয়ের বর্তমান বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী (লোকো) ধীমান ভৌমিক জাগো নিউজকে বলেন, ‘উদ্বোধনের পরদিনই টার্ন টেবিলের অটোমেশন সিস্টেমে ত্রুটি দেখা দেয়। মূল সমস্যা হচ্ছে, এটি ভারী ইঞ্জিনের ওজন বহন করতে পারছে না। একটি ইঞ্জিনের ওজন সাধারণত ৭০-৯০ টন এবং কোচের ওজন ২০-৩০ টন হয়। বর্তমান টার্ন টেবিলটি এই পূর্ণ ভার নিতে পারছে না বলেই নিরাপত্তার স্বার্থে এটি বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে এটি আরও শক্তিশালী করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।’

আরও পড়ুন

ট্রেনের ছাদের যাত্রীরা টয়লেট করে কিভাবে?

বর্তমানে উত্তরাঞ্চলের এই রেল বিভাগে ইঞ্জিন ও কোচ ঘোরানোর নিজস্ব কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেই। ফলে বাধ্য হয়ে প্রতি দুই-তিন মাস পরপর ইঞ্জিনগুলো ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনের টার্নটেবিলে ঘুরিয়ে আবার লালমনিরহাটে ফিরিয়ে আনতে হচ্ছে। এতে রেলওয়ের অতিরিক্ত জ্বালানি, সময় ও বিপুল অর্থ অপচয় হচ্ছে।

রেলওয়ের উদাসীনতা, কোটি টাকার প্রকল্পে মশা-ব্যাঙের বাসা

আরও পড়ুন

স্বপ্নের জামালপুর এক্সপ্রেস এখন ভোগান্তির কারণ

লালমনিরহাট রেলওয়ের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) মোহাম্মদ তসলিম আহমেদ খান প্রযুক্তিগত জটিলতার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘ইঞ্জিন ও কোচ ঘুরিয়ে আনতে রেলওয়ের অতিরিক্ত অর্থ ও সময় ব্যয় হচ্ছে। তাই লালমনিরহাটের টার্ন টেবিলটি দ্রুত চালু করা জরুরি। বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছি।’

এসআর/জেআইএম