কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক, কে বলে তা বহুদূর? এক অরল্যান্ডো গিলের জীবনেই ধরা দিয়েছে স্বর্গ ও নরক—দুটোই, সেটাও মাত্র চার বছরের ব্যবধানে। সাক্ষী এক জোড়া গ্লাভস!
২০২২ সালের কথা। গিলের জীবন আলো করে জন্ম নেয় তাঁর সন্তান লাওতারো দানিয়েল। দুর্ভাগ্য, সুস্থ সন্তানের দেখা তিনি পাননি। জন্ম থেকেই কী একটা রোগে ভুগছিল দানিয়েল।
গিলের জীবনে নেমে আসে অমানিশা। পরিবারের খরচ ও সন্তানের চিকিৎসার ব্যয়ভার মেটাতে তাঁকে বেছে নিতে হয় চরম পথ। নিজের জামা–জুতা থেকে শুরু করে বেচে দেন প্রায় সবকিছু–ই।
গিলের বয়স তখন ২২ বছর। খেলতেন জন্মশহরের ক্লাব স্পোর্তিভো সান লরেঞ্জোর বয়সভিত্তিক দলে। হাসপাতালের বিল, সংসার খরচ—সব মেটাতে তাঁকে আরও বেশি ত্যাগ স্বীকার করতেই হতো।
গিল করলেন কী, নিজের স্বপ্নটাই বিসর্জন দিয়ে দিলেন। প্যারাগুয়ের যেকোনো পর্যায়ের জাতীয় দলে খেলা ছিল তাঁর স্বপ্ন। সেই তিনি বেচে দেন ২০১৯ দক্ষিণ আমেরিকান অনূর্ধ্ব–২০ চ্যাম্পিয়নশিপে পরা জাতীয় দলের জার্সিটাও।
শুধু একটি জিনিস গিল রেখে দিয়েছিলেন নিজের কাছে। ইতালিয়ান সংবাদমাধ্যম ‘লা গাজেত্তা দেয়ো’র তথ্যমতে, সেই জিনিস নিয়েই গিল পরশু রাতে দাঁড়িয়েছিলেন বোস্টনে প্যারাগুয়ের গোলপোস্টের নিচে। কিপিং গ্লাভস! বাকিটা তো এখন সবারই জানা।

শেষ ৩২ দলের রাউন্ডে জার্মানির বিপক্ষে ১২০ মিনিটে সেভ করেন ৬টি। টাইব্রেকারে আরও দুটো। প্যারাগুয়ে গিলের হাতে ভর করেই জন্ম দিয়েছে বিশ্বকাপের ইতিহাসেই অন্যতম সেরা অঘটনের। এ ম্যাচে জার্মানির হার যদি সেই ‘অঘটন’ হয়, তাহলে গিল যা করেছেন, তাতে প্যারাগুয়েতে তিনি এখন ‘জাতীয় বীর’। স্বর্গ বুঝি এভাবেই এসে ধরা দেয় মানুষের জীবনে!
গিল তাঁর জীবনের সেই নরক–পর্ব নিয়ে আগে কখনো মুখ খোলেননি। কিন্তু যে ‘স্বর্গ’ এবার ধরা দিল জীবনে, সেটা কাউকে বলে দিতে হয়নি। গোটা দুনিয়া এখন তাঁকে নিয়েই কথা বলছে।
সাড়ে ছয় ফুট উচ্চতার কারণে আর্জেন্টাইন ফুটবলে গিলকে ডাকা হয় অন্য এক নামে—‘প্যারাগুয়ের কোর্তোয়া।’ নামটি কার থেকে ধার নেওয়া সেটাও সবাই জানেন—বেলজিয়াম কিংবদন্তি থিবো কোর্তোয়া। আসল কোর্তোয়া যেমন শুরুতে লেফটব্যাক ছিলেন, তেমনি প্যারাগুয়ের এই ‘কোর্তায়া’ও ক্যারিয়ারের শুরুতে ছিলেন মিডফিল্ডার। সেটা সান লরেঞ্জোর দল ‘ক্লাব ১৩ জুনে।’
ভালো করায় এই পজিশনে তাঁর ভবিষ্যৎও দেখা হয়েছিল শুরুতে। কিন্তু ক্লাব আর সান লরেঞ্জোর বয়সভিত্তিক দলে থাকতে পোস্টের নিচে দাঁড়ানো শুরু করেন। তখন গিলও নিজেকে পাল্টে ফেলেন। প্যারাগুয়েরই কিংবদন্তি গোলকিপার হোসে লুই চিলাভার্টের মতো ফ্রি–কিক নিতে শুরু করেন। প্যারাগুয়ের ঘরোয়া ফুটবলে ফ্রি–কিক থেকে তাঁর চারটি গোলও আছে।
২০২৩ সালের শেষ দিকে গিলের জীবন পাল্টাতে শুরু করে। প্যারাগুয়ের ফুটবল ছেড়ে পাড়ি জমান আর্জেন্টিনার ঘরোয়া ফুটবলে। যোগ দেন সান লরেঞ্জো বয়সভিত্তিক দলে। ২০২৪ সালে ক্লাবটির মূল দলে সুযোগ পেলেও একাদশে নিয়মিত হন গত বছর। পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট হয়ে পাঁচ লাখ ডলারে গিলের ৫০ শতাংশ স্বত্ব কিনে নেয় সান লরেঞ্জো। গিল তত দিনে তাঁর দেশের অন্যতম সেরা গোলকিপার। সে সুবাদে জাতীয় দলে তাঁর অভিষেক হয় গত বছর সেপ্টেম্বরে।
গিলের জীবনের নরকময় দিনগুলো নিয়ে বছরখানেক আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুখ খুলেছিলেন তাঁর স্ত্রী মেলিসা। সেটা প্যারাগুয়ে বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জনের পর।
জার্মানির গোলটি বাতিল হলে ‘আর্সেনালের চ্যাম্পিয়ন হওয়ারই কথা নয়’মেলিসা বলেছিলেন, ‘ছেলের যখন জন্ম হয়, তখন আমাদের কিছুই ছিল না। অরল্যান্ডো ওর পুরোনো ক্লাবের কাপড়, জুতা, এমনকি অনূর্ধ্ব-২০ দলের জার্সিও বিক্রি করে দিয়েছিল। পথ সহজ ছিল না, কিন্তু ভালোবাসা ও ত্যাগ থাকলে সবকিছু সম্ভব। আমি চাই পুরো পৃথিবী জানুক তোমার হৃদয় কত বড়।’
গিলের হৃদয়ের ভেতরটা কেমন সেটা বোঝা যায় জার্মানির বিদায়ের পর। টাইব্রেকারে জয় নিশ্চিতের পর সতীর্থরা যখন দৌড়ে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন, তেমন কোনো বিকার ছিল না তাঁর।

জার্মানির বিপক্ষে জয়টাও যেমন উৎসর্গ করেছেন অসুস্থ ভ্রাতুষ্পুত্রকে, ‘এই উত্তরণ আমার ভাতিজাকে উৎসর্গ করছি, যে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং হাসপাতালে ভর্তি আছে। আশা করি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে।’
মাঠে গিল তেমন একটা কথা বলেন না সতীর্থদের সঙ্গে। এ নিয়ে সমালোচনাও আছে। চিলাভার্ট কিছুদিন আগে বলেছিলেন, ‘গিল তো কথাই বলে না! মাঠে পুরো বোবা হয়ে খেলে। ফুটবল হলো যোগাযোগের খেলা।’
চিলাভার্টকে এর জবাব দিয়েছিলেন প্যারাগুয়ের কোচ। তবে আসল জবাবটা কিংবদন্তি পেয়েছেন পরশু রাতে। গোলকিপারের দুই হাত যখন ‘কথা’ বলে ওঠে, তখন ‘বোবা’ বনে যেতে হয় প্রতিপক্ষকে। যেমন জার্মানি!
টাইব্রেকারে মহানাটকে ডাচদের কান্না, শেষ হাসি মরক্কোর







