বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেছেন আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি। সেখানে তিনি দল, লিওনেল মেসি, সম্ভাব্য একাদশ, সুইজারল্যান্ড এবং বিশ্বকাপের নানা বিষয় নিয়ে নিজের মতামত তুলে ধরেন।
সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে সম্ভাব্য একাদশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি আগেও কয়েকবার একই কাজ করেছি, তাই এবারও যদি একই একাদশ নামাই, তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। শেষ ম্যাচে অনেক নাটকীয়তা থাকলেও দল ভালো খেলেছে। আমি যা দেখেছি, তাতে সন্তুষ্ট।’
অন্যদিকে স্প্যানিশ তারকা লামিনে ইয়ামাল সেমিফাইনালে স্পেন বনাম ফ্রান্স ম্যাচটিকে ‘ফাইনালের আগেই ফাইনাল’ বলেছেন। এই প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে স্কালোনি বলেন, ‘স্পেন ও ফ্রান্স- দুটি দুর্দান্ত দল। লামিনে ইয়ামাল ঠিকই বলেছে, এটি ফাইনালের আগেই একটি ফাইনাল। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে, শেষ পর্যন্ত একটি দলই এগিয়ে যাবে।’
২০২১ সালের কোপা আমেরিকার শিরোপা জয়ের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘সেই শিরোপা জয়ের পর থেকেই আমাদের জন্য সবকিছু বদলে যেতে শুরু করে। এটি এই প্রজন্মকে অসাধারণ আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল। বিশেষ করে যারা এর আগে বহুবার চেষ্টা করেও পারেনি, তাদের জন্য এটি ছিল বিরাট স্বস্তির মুহূর্ত। করোনাভাইরাস মহামারির সময়ের সেই অভিজ্ঞতা ছিল অবিশ্বাস্য এবং অত্যন্ত আবেগঘন।’
দলে পরিবর্তন বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা পরিবর্তন করেছি, কারণ আমরা বিশ্বাস করি দল আরও উন্নতি করতে পারে। লিয়ান্দ্রো পারেদেস আসার পর বলের দখল ও পাসের গতি বেড়েছে। এখন আমরা প্রতিপক্ষের অর্ধে আরও বেশি সময় কাটাতে পারছি। কিছু সমস্যার মুখোমুখি হওয়ায় আমরা কিছু পরিবর্তন এনেছি। প্রস্তুতি শিবিরের শুরুতে কয়েকটি কারণে পরিস্থিতি অনেক বেশি কঠিন ছিল, যেগুলো হয়তো আপনারা কল্পনাও করতে পারবেন না। তবে আজ আমি বলতে পারি, আমরা সেই বাধাগুলো কাটিয়ে উঠেছি এবং এখন ভালোভাবেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি।’
কোয়ার্টার ফাইনালের প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ড সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমাদের মতো কোনো দল নেই, আমরা সহজ কোনো প্রতিপক্ষ নই। আমরা বিষয়টি ভালোভাবেই জানি এবং সে সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন। আমার কাছে তারা একটি খুবই ভালো দল। বিশ্বের সেরা জাতীয় দলগুলোর বিপক্ষেও তারা সমানতালে লড়াই করে এবং প্রায়ই ভালো ফল নিয়ে মাঠ ছাড়ে। বিশ্বকাপে তাদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে, দলে অভিজ্ঞ খেলোয়াড় আছে, পাশাপাশি তারা শারীরিকভাবেও অত্যন্ত শক্তিশালী।’
তিনি আরও বলেন, ‘তারা আমাদের জন্য কঠিন প্রতিপক্ষ হবে। আমরা অন্য সব দলের মতোই তাদেরও যথেষ্ট সম্মান করি। কলম্বিয়াও দারুণ খেলছিল এবং আমরা অনেকেই ভেবেছিলাম তারা এই পর্যায়ে উঠবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সুইজারল্যান্ড তাদের ছাড়িয়ে গেছে।’
আর্জেন্টিনা দলের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি চাই এই দলকে এমন একটি দল হিসেবে মনে রাখা হোক, যারা কখনোই আত্মতুষ্ট ছিল না। আমি চাই আর্জেন্টাইনরা এভাবেই আমাদের দেখুক। আমাদের দল আবেগের প্রতীক। সাত বছর বয়সে যেমন মাটির মাঠে আনন্দ নিয়ে খেলতাম, সেই আনন্দ নিয়েই খেলতে হবে। আমি মনে করি, এটাই এই দলের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার হবে।;’
স্পেন ও ফ্রান্সের সেমিফাইনাল ম্যাচের উপর আলোকপাত করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘স্পেন জয়ের যোগ্য ছিল, তবে ম্যাচটি খুব কঠিন ছিল। ফ্রান্সও দেখিয়েছে তারা কতটা শক্তিশালী দল। কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচ বাদ দিলে আমরাও ভালো খেলছি। কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় এবার আমাদের একটি বাড়তি সুবিধা আছে- এই দলটি ইতোমধ্যেই একটি বিশ্বকাপ জিতেছে। তাই চাপ তাদের ওপর তেমন প্রভাব ফেলছে না।’
লিওনেল মেসিকে নিয়ে স্কালোনি বলেন, ‘মেসি ম্যাচে প্রায় একই দূরত্ব দৌড়ায়। সে বেশি বা কম দৌড়াচ্ছে—এমন নয়। তবে এখন সে অনেক বেশি কার্যকর। দলও তাকে অনেক সাহায্য করছে। শারীরিকভাবে সে যে প্রস্তুতি নিয়েছে, তার সুফল পাচ্ছে। একটি বিষয় পরিষ্কার, সে ম্যাচে নিজের সবটা দিচ্ছে। সুযোগ পেলেই সে প্রতিপক্ষের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, যেন একটি যন্ত্র! আমাকে এটি অবাক করে না, তবে যারা তাকে ভালোভাবে চেনে না, তাদের কাছে হয়তো বিস্ময়কর লাগে।’
তিনি মেসির সম্পর্কে আরও বলেন, ‘সে যত দিন অনুপ্রাণিত থাকবে, তত দিন বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় থাকবে। আমরা যারা প্রতিদিন তাকে দেখি, তার অনুশীলন দেখি, তারা জানি সে কী করতে পারে। ২৩ বছর বয়সে পেপ গার্দিওলার অধীনে বার্সেলোনায় সে যা করেছে, তা ভাষায় বোঝানো কঠিন। আমার বিশ্বাস, সে যত দিন চাইবে, তত দিনই বিশ্বের সেরা থাকবে।’
স্পেন সম্পর্কে স্কালোনি বলেন, ‘স্পেন ধীরে ধীরে আরও উন্নতি করছে। বেলজিয়ামের বিপক্ষে তারা ভালো খেলেছে। তবে মাঠের অবস্থা তাদের জন্য সহায়ক নয়। ঘাস শুকনো থাকায় বল ঠিকমতো গড়ায় না। মাঠের ঘাস শুকনো, আর দুপুর দুইটার প্রচণ্ড গরমেও খেলতে হচ্ছে। তারপরও তারা নিজেদের খেলার স্বকীয়তা ধরে রেখেছে। এবার তাদের সামনে কঠিন একটি পরীক্ষা অপেক্ষা করছে, যা দুই দলেরই প্রকৃত অবস্থান বুঝিয়ে দেবে। তারা যে দুর্দান্ত একটি দল, সেটা নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই।’
মিশরের বিপক্ষে ম্যাচে দলের পারফরম্যান্স নিয়ে কথা উঠলে তিনি বলেন, ‘এই ম্যাচটিকে কোথায় রাখব জানি না। এমন আবেগ অনুভব করতে জয় পাওয়াও জরুরি নয়। যার সঙ্গেই কথা বলেছি, সবাই একই অনুভূতির কথা বলেছে। আমরা জানি, সম্ভবত এটিই লিওর শেষ বিশ্বকাপ। মুহূর্তটি ছিল অবিশ্বাস্য।’
এছাড়া দলের সামগ্রিক পারফরম্যান্স নিয়ে স্কালোনি বলেন, ‘কিছু ছোটখাটো সমস্যা থাকলেও দল ভালো খেলছে। আমরা সুযোগ তৈরি করছি, ভালো ফুটবল খেলছি। তবে এখন থেকে প্রতিটি ম্যাচই আরও কঠিন হবে। কারণ প্রতিপক্ষের জন্যও এগুলো জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোর একটি। কাতার বিশ্বকাপের মতো প্রতিটি ম্যাচে একই মানের ফুটবল খেলা সব সময় সম্ভব নয়।’
রেফারিদের পক্ষপাতের অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে স্কালোনি বলেন, ‘১৯৮৬ সাল থেকেই বলা হচ্ছে রেফারিরা আর্জেন্টিনাকে সুবিধা দেয়। এটি নতুন কিছু নয়। আর্জেন্টিনা সব সময়ই বিশ্বকাপের আকর্ষণের একটি অংশ, তাই অনেক মানুষ আমাদের জিততে দেখতে চায় না। এটা স্বাভাবিক।’
‘আমাদের খেলোয়াড়রা এটিকে এক ধরনের প্রেরণা হিসেবে নেয়। কিন্তু আমি আবারও বলছি, ভিএআর যুগে কাউকে সুবিধা দেওয়া খুবই কঠিন। লিসান্দ্রো মার্তিনেজের পায়ের ওপর স্পষ্টভাবে পা দেওয়া হয়েছিল। এরপরও বলের দখলে কোনো পরিবর্তন হয়নি এবং তারপর গোলটি বাতিল করা হয়েছে। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে সবকিছুই অতিরঞ্জিত হয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবে কোনো পক্ষপাত নেই। বর্তমান সময়ে রেফারিদের পক্ষে কোনো দলকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া খুবই কঠিন।’
বিশ্বকাপে সর্বাধিক জয়ের রেকর্ডে আর্জেন্টিনার জয়যাত্রা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি এই পরিসংখ্যান জানতাম না। আমাকে বলা হয়েছে, এখন আমি সেই তালিকায় আছি। কার্লোস বিলার্দোর সঙ্গে তুলনা করাও আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে। আমরা যদি জিততে থাকি, তার মানে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। এখানে এখনো থাকতে পারাটা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়।’
আরএএইচইউএল/আইএইচএস/








