বঙ্গ রাখাল
ঘরহীন মানুষেরা অন্যের ঘরের সন্ধান করে চলেন। পথেই খুঁজে নেন মাথা গোঁজার ঠাঁই। শ্রেণি-বৈষম্যহীন এবং আচারসর্বস্ব, সমাজ সংস্কার ও আদর্শিক মানবতার জায়গা থেকে বাউল বা ফকিরেরা নিজেদের মতো চলতে চান এবং কিতাবি কোনো কিছু মানতে নারাজ। তাদের জীবনাচরণই যেন তাদের ধর্ম। এই রীতি-নীতিতেই তারা খুশি। আর এই ধারার শিরোমণি লালন শাহ। লালন অথবা লোককবিদের তথ্যানুধানে ঘুরে ফিরি পথে-প্রান্তে। নিজের মনকে শান্ত করার বাসনা ও সত্য তালাশ করে ফিরি দিনের পর দিন।
দীর্ঘদিন এই সাধু-সন্তদের জীবনাচরণ নিয়ে ঘুরে বেড়ালেও জানা ছিল না ঝিনাইদহের শৈলকূপার চরগোলকনগর গ্রামে লালনের ভিটে বিদ্যমান। লালনের ভিটের কথা শোনার পরে আমি জায়গাটা দেখার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠি। ছুটে চলি জায়গাটা দেখতে। লালনের ভিটে বলে খ্যাত চরগোলকনগরে সাধুসঙ্গে যে মানুষটা সাধুদের দেখেছেন; সেই প্রত্যক্ষদর্শী রহিমা খাতুন জীবিত আছেন। যার বয়স ১০৭ বছর। জায়গাটা এখন লালনের ভিটে নামে পরিচিত। কথিত আছে, এখানে লালন আসতেন। কুঁড়েঘর করে সেখানে বসে থাকতেন। শিষ্যরাও চারিদিক থেকে এসে গুরুর সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য ভিড় জমাতেন। কয়েকদিন ধরে সাধুসেবা হতো।
রহিমা খাতুনের ভাষ্যমতে, এখানে লালন শাহ, আদু শাহ ও ইদু শাহ আসতেন। সাধুরা ছিলেন ইয়া বড় বড় দাঁড়ি ও চুলওয়ালা। অনেকে আবার মন্ত্র-সাধনাও করতেন। এই দীর্ঘদেহি সাধুরা কবিরাজি ও নানা রোগের চিকিৎসা করতেন। অনেক দিন রহিমা খাতুন (স্বামী জান মাহমুদ জোয়ার্দার) এখানে সিন্নি দিতেন ও বাতি জ্বালাতেন। সাধুদের আচার-আচরণ তাকে মুগ্ধ করতো। মিহিসুরে তারা কথা বলেন। তাদের বাণীর সুর একতারাতে ভেসে ওঠে। ব্যক্তিগত জীবনের নানা অভিজ্ঞতা তাদের গান হয়ে প্রকাশিত হয়। এই গান যেন হৃদয়ের কথা বলতে ব্যাকুল।
আরও পড়ুন
পলাশীর আম্রকানন থেকে আজকের বাংলাদেশ
এখন এখানে আর সাধুসেবা হয় না, রহিমা খাতুনও বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে গেছেন। লালন যেখানে আসন করে বসে থাকতেন; সেই উঁচু ভিটের মতো জায়গাটাও কেটে সমান করে পাশে গড়ে উঠেছে বসতভিটা। নামেই এখন লালনের ভিটে বলে প্রচলিত রয়েছে। সেই বিশাল বটবৃক্ষটাও নেই। তবে এই জায়গা সব লালনের। যা লালন শাহ শুকুর শাহকে দান করে দিয়েছিলেন। এই জায়গা বাদেও লালনের প্রায় ১০০ বিঘা জমি ছিল বলে অনেকে মনে করেন। এই জমি ফুলহরির সাহাদের কাছ থেকে কেনা হয়েছে বলে জানা যায়। তবে আমাদের জানাচ্ছেন শুকুর শাহের পরবর্তী প্রজন্মের সাধু রিপন শাহ। টুলু শাহ নামেও আরেকজন সাধু বা ফকির আছেন; যারা এখনো সাধুদের নিয়ে কাজ করতে প্রস্তুত। বিভিন্ন অনুসন্ধানে গেলে তিনিই সবাইকে তথ্য দেন এবং ঘুরে দেখান। পরবর্তীতে এই জমি শুকুর শাহের পালিত পুত্র আইজদ্দি শাহের সন্তানেরা নিজেদের নামে রেকর্ড করে নেন এবং তা আবার বিভিন্ন জনের কাছে বিক্রিও করে দেন।
সমস্ত জমি থাকলেও এখন আইজদ্দি শাহের বংশধরেরা নিজেদের নামে রেকর্ড করে তা নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছিলেন এবং জমি বিক্রিও করে দিয়েছেন। বর্তমানে লালনের ঘনিষ্ঠ শিষ্য শুকুর শাহের যে কবরটা আছে; সেটাও এখন মো. আমজাদ হোসেনের ভাগের ভেতরে বিদ্যামান। মো. আমজাদ হোসেন ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের শিক্ষক। তিনিই এই আখড়ার জমি- জিরাতের দলিল লালন গবেষক মো. আবু তালিবকে দেন। আবু তালিব এই প্রমাণ পেয়ে লালনকে নিয়ে আবার নতুন করে গবেষণা শুরু করেন বলেও প্রমাণ মিলেছে বা ভক্ত-পাগল ফকিরদের মুখে মুখে প্রচলন রয়েছে।
এই জমিতে আমজাদ হোসেনসহ আরও কিছু লালন অনুসারীর কবর রয়েছে। দুঃখের বিষয়, এই জমিতে এখন কলার চাষ হচ্ছে। আবার আমজাদ হোসেনের মেয়েরা এই জমির কিছু অংশ মসজিদের জন্য দান করেছেন। সেখানে এখন পাকা মসজিদ তৈরি করা হয়েছে। যে কারণে এখন এখানে সাধুসেবা বন্ধ রয়েছে। এখানে সাধুরা আর আসেন না। এখানে সাধুরা দূর-দূরান্ত থেকে আসতেন এবং গানে গানে গুরুকে স্মরণ করতেন। তা-ও আজ এখানে মসজিদ তৈরি করার কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যেই সাধু ফকিরদের জায়গা অথচ তারাই আজ এখান থেকে তাড়িত। তারা আজ এখানে দাঁড়ানোর জায়গা পান না। তাদের ঘুরতে হয় অন্যদের জায়গায়।
আরও পড়ুন
নারী সাহিত্য নাকি সাহিত্যে নারী: অন্তর্গত বিতর্ক
লোকমুখে প্রচলিত আছে যে, বর্তমানে যেখানে লালনের আখড়া আছে; সেখানে আগে ছিল না। শুকুর শাহ তার গ্রাম ছেড়ে তৎকালীন ঝিনাইদহ মহকুমার চড়িয়াগ্রামে এসে বসবাস শুরু করেন। তার কাছে অনেক সাধু-সন্ন্যাসীরা আসতেন এবং রাতে প্রাকৃতিক কাজে সাড়া দিতে গিয়ে রাতের অন্ধকারে অন্যের বাড়ির উঠান ব্যবহার করে ফেলতেন। সকালে অনেকে শুকুরের কাছে অভিযোগ করলে তিনি বর্তমানে যেখানে আখড়া; সেই জায়গা এক ব্যক্তির কাছ থেকে নিয়ে বসবাস শুরু করেন। জায়গাটা সে সময় পতিত এবং ফাঁকা নিরিবিলি ছিল।
অনেকের মুখে শোনা যায়, আখড়ার পাশেই কুমার নদ। কেউ সরাসরি এপার থেকে ওপারে যেতে পারতেন না। কারো বাড়ি অনুষ্ঠান হলে এই নদের ঘাটে বলে এলে সকালে সেখানে থালা-বাটি পানিতে ভাসতে থাকতো। সেখান থেকে যাদের বাড়িতে অনুষ্ঠান; তারা নিয়ে আসতেন। এই আখড়া আর সাধু-ফকিরদের ঘিরে নানা কিংবদন্তির প্রচলন রয়েছে। তবে এ কথা বলতে দ্বিধা নেই যে, লালন এখানে আসতেন এবং তার শিষ্যদের নিয়ে সাধুসেবা করতেন। শুকুর শাহ লালনের ঘোড়াকে খুব আদর-যত্ন করতেন। ঘোড়ার নাম ছিল দুলদুল। দুলদুলও শুকুরের প্রতি অনুগত ছিল।
লালন মারা গেলে শীতল ও ভোলাই ঘোড়াটিকে শুকুরের এখানে রেখে যান। ঘোড়াটি এখানে থাকা অবস্থায় মারা গেলে এখানেই কবর দেওয়া হয়। এ আখড়াতে লালনের অনেক স্মৃতি এবং তা প্রমাণিত সত্য। মিথ্যা বলার কোনো অবকাশ নেই। তবে লালনের এত জায়গা-জমি থাকার সত্ত্বেও আজ তা বিলীনপ্রায়। সংরক্ষণের অভাবে ভাগাভাগি হয়েছে এবং প্রকৃত ফকিরেরা যে জমির মালিক; তারাই হয়েছেন অধিকার ছাড়া।
আরও পড়ুন
আকিরা কুরোসাওয়ার ‘রাশোমন’ ও হেরোডোটাসের উপাখ্যান
ফকিরদের ধর্মে বিভেদহীন মানব জীবনের ঐক্য স্থাপন করাই তাদের কাজ। আর ফকিরেরা সারাজীবন ধরে এ কাজটাই করে চলেন। যারা তাদের খতিয়ান শূন্য করে পথের সাথী করেছেন; তাদের প্রতিও নাই সাধু-ফকিরদের কোনো অভিমান-ক্ষোভ। এ জন্যই সাধু-ফকিরেরা বলতে পারেন, এই পৃথিবী একদিন বাউলের হবে।
লেখক: কবি ও লোকগবেষক।
এসইউ








