দুই বছর আগে শুল্কমুক্ত ফেব্রিক্স ঘোষণায় চীন থেকে মদ ও সিগারেট আমদানি এবং খালাস চেষ্টায় জড়িত চক্রের হোতাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। তার নাম শেখ সেজান (২৬)।
নেপালে পালিয়ে যাওয়ার সময় ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গত বুধবার সন্ধ্যায় (১৫ জুলাই) তাকে গ্রেফতার করা হয়।

শুক্রবার (১৭ জুলাই) বিকেলে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে। সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

আরও পড়ুন

এবিবি আরোপিত চার্জ ও বর্ধিত ফি, আপত্তি জানিয়ে চট্টগ্রাম চেম্বারের চিঠি

সিএমপির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ২০২৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর বন্দর থানায় দায়ের হওয়া মামলায় বিগত বিভিন্ন সময়ে ঘটনায় জড়িত আরও সাতজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তারা হলেন মদের চালানটি খালাসে নিয়োজিত সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠান হাফেজ ট্রেডিং প্রাইভেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান খালেদ হোসেন মামুন, পরিচালক বাকির হোসেন, প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী খোরশেদ আলম রিপন ও মিজান এবং চক্রের সদস্য আশরাফ হোসেন রাজু, খায়েজ আহমেদ ওরফে আরিফ এবং বড় রাজু।

পুলিশ জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দরে শুল্কমুক্ত ফেব্রিক্স ঘোষণায় মদ ও সিগারেট আমদানির ঘটনায় একটি সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্র জড়িত। চক্রটি ১১ হাজার ৬৭৬ লিটার বিদেশি মদ আমদানি করে ১০-১২ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অপচেষ্টা করেছে। তাছাড়া তারা কাস্টমসের এসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সার্ভারে অবৈধভাবে প্রবেশ করে চালানটি খালাসের চেষ্টা করে। ওই ঘটনায় বন্দর থানায় দায়ের হওয়া মামলায় গ্রেফতার ৭ আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদে শেখ সেজানের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়।

গ্রেফতার সেজানের তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষতা রয়েছে। সেজান অন্য আসামিদের সহায়তায় কাস্টমসের এসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সার্ভার হ্যাক করে বন্দর থেকে মিথ্যা ঘোষণার পণ্য খালাসের যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করে।

আরও পড়ুন

বাড়ছে নিরাপত্তা শঙ্কা / অনলাইনে ‘অস্ত্র বিক্রি’, হোম ডেলিভারি দেওয়ার প্রলোভন

পুলিশ জানায়, এসাইকুডা ওয়ার্ল্ড এবং সিপিএ (বন্দর) পোর্টালের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে অন্যের ইউজার আইডি ব্যবহার, পাসওয়ার্ড পরিবর্তন এবং প্রতারণামূলক কাস্টমস কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি কার্যক্রম সম্পন্ন করে বলে আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে স্বীকার করেন আগে গ্রেফতার হওয়া আশরাফ হোসেন ওরফে রাজু।

তদন্তে প্রাপ্ত ডিজিটাল আলামত পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, ২০২৪ সালের ২০ মে একটি মোবাইল অপারেটরের মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করে কাস্টমসের একজন অফিসারের ইউজার আইডি দিয়ে অননুমোদিতভাবে লগইন করা হয়। পরবর্তীতে একই ইউজার আইডি ব্যবহার করে সিগারেট চোরাচালানের মামলায় এলসি-আই রেজিস্ট্রেশন এবং ওপেন কার্যক্রম সম্পন্ন করে সেজান। তদন্তে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া শেখ সেজানকে গ্রেফতারে এর আগে নড়াইল জেলার লোহাগড়া থানাধীন তার বাড়িতে পুলিশ অভিযান চালায়। কিন্তু সেজান ওই সময়ে পলাতক থাকায় তাকে গ্রেফতার করা সম্ভব না হলেও তার বাড়ি হতে এসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেম হ্যাক করে এলসি আই রেজিস্ট্রেশন ও ওপেন করার কাজে ব্যবহৃত এমটি মোবাইল সেট জব্দ করা হয়।

আরও পড়ুন

‘যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানিতে অতিরিক্ত ব্যয়ের শঙ্কা নেই’

আসামি শেখ সেজান এর আগে সরকারি বিভিন্ন জনসেবামূলক ওয়েবসাইট ক্লোনিং, জাতীয় পরিচয়পত্র, ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ, জন্মনিবন্ধন, টিকা সনদসহ বিভিন্ন সরকারি ডিজিটাল সেবা জালিয়াতির অভিযোগে সিএমপি সিটি ও ডিএমপি সিটিটিসি টিমের অভিযানে গ্রেফতার হন। সেজান ও তার সহযোগীরা সরকারি ওয়েবসাইট ক্লোন করে অনুরূপ প্ল্যাটফর্ম তৈরি, নাগরিক তথ্য সংগ্রহ এবং বিভিন্ন ডিজিটাল জালিয়াতির মাধ্যমে লোকজনের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করে একাধিকবার গ্রেফতার হয়েছেন। শেখ সেজানের নামে দেশের বিভিন্ন থানায় সাইবার ক্রাইম ও প্রতারণা সংক্রান্ত সাতটি মামলা রয়েছে।

এর আগে ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম বন্দরের অভ্যন্তরে একটি কনটেইনারভর্তি মদের চালান আটক করে চট্টগ্রাম কাস্টমসের অডিট ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড রিসার্চ (এআইআর) শাখার একটি টিম। ওই কনটেইনারে এক হাজার ১১৪ কার্টনে বিদেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ১১ হাজার ৬৭৬ লিটার মদ পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন

ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি দূর করতে পরিকল্পনার কথা জানালেন মন্ত্রী

ওই সময়ে চট্টগ্রাম কাস্টমসের অডিট ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড রিসার্চ (এআইআর) শাখার ডেপুটি কমিশনার একেএম খাইরুল বাশার জানিয়েছিলেন, ‘গার্মেন্টস ফেব্রিক্সের মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে নারায়ণগঞ্জের আদমজি ইপিজেডের সুপ্রিম স্মার্ট ওয়্যার লিমিটেড চালানটি আমদানি করে। চালানটি খালাসের দায়িত্ব পায় চট্টগ্রামের গোলবাগ এলাকার সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান হাফেজ ট্রেডিং প্রাইভেট লিমিটেড। গোপন খবরের ভিত্তিতে মদের চালানটি আটক করা হয়। আটক মদের চালানের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য প্রায় দুই কোটি টাকা। এর বিপরীতে সরকারি প্রায় ১২ কোটি টাকার রাজস্ব রয়েছে। মিথ্যা ঘোষণায় ওই ১২ কোটি টাকা সরকারি রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করা হয়। এ ঘটনায় কাস্টমসের পক্ষ থেকে বন্দর থানায় মামলা করা হয়।

এমডিআইএইচ/এমএমকে