পবিত্র কোরআনে সুরা কলমের ৩ ও ৪ নম্বর আয়াতে মহানবী (সা.)-কে লক্ষ করে আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আর নিশ্চয়ই আপনার জন্য রয়েছে অশেষ পুরস্কার। আর নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।’

এই দুই আয়াতের সমন্বিত মর্মার্থ হলো নবী-রাসুলদের মতো মহান ও নিষ্কলুষ চরিত্র অর্জনের মধ্যেই নিহিত রয়েছে পরকালের অশেষ পুরস্কার।

নবী-রাসুলদের এই উত্তম চরিত্র অর্জনের মূল কর্মনীতি ও কর্মকৌশল কেমন ছিল, সে বিষয়ে কোরআন বলে, ‘আমি আপনার পূর্বে এমন কোনো রাসুল পাঠাইনি যার প্রতি আমি এই ওহি নাজিল করিনি যে, ‘আমি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। সুতরাং আমারই ইবাদত করুন’।” (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ২৫)

এই আয়াতে স্বয়ং আল্লাহ বলছেন, ‘আমি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই’, যা মূলত ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এরই সমার্থক। একই আয়াতে তিনি আরও বলেছেন, ‘আমারই ইবাদত করুন।’

ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্য, অন্য কারও জন্য নয়। এই চিরন্তন মহাসূত্র অনুসরণ করেই নবী-রাসুলেরা চরিত্রের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করেছিলেন।

এর মাধ্যমে তাওহিদের বনিয়াদি কথাটি স্পষ্ট হয়ে যায়। তা হলো ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্য, অন্য কারও জন্য নয়। এই চিরন্তন মহাসূত্র অনুসরণ করেই নবী-রাসুলেরা চরিত্রের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করেছিলেন।

উত্তম চরিত্রের জন্য যে অশেষ পুরস্কার রয়েছে—এ কথাটি কোরআনে বারবার বিভিন্নভাবে এসেছে। যেমন সুরা ইনশিকাকের ২৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যারা ইমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, তাদের জন্য রয়েছে অফুরন্ত পুরস্কার।’

আবার সুরা রাদের ২৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যারা এমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, তাদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ ও শুভ পরিণাম।’

ইসলামে নামাজ হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক ইবাদত বা সৎকাজ। এই নামাজের মূল সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কাজ নিয়ে কোরআন বলে, ‘নিশ্চয়ই নামাজ নির্লজ্জ ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৪৫)

মানুষ ও পরিবেশের সম্পর্ক: ইসলাম যেভাবে মূল্যায়ন করে

সৎকাজ করা আর নির্লজ্জ ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকা—এটাই হচ্ছে সচ্চরিত্রের মূল সংজ্ঞা। নামাজসহ সব ইবাদত ও নেক কাজ মূলত মানুষকে এই পরম সচ্চরিত্রের দিকেই ধাবিত করে।

কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী, ইমানের ভিত্তিতে ‘আমলে সালেহ’ বা সৎকাজ করাই হলো সচ্চরিত্র অর্জনের একমাত্র পথ। এই চরিত্র অর্জনে নবী-রাসুলেরা ছিলেন সর্বোচ্চ পর্যায়ে। ওহির সুরক্ষার কারণে তাঁরা ছিলেন মাসুম বা নিষ্পাপ। তাঁদের জীবনের এই অনন্য বৈশিষ্ট্যকে সমকালীন পরিভাষায় বলা যায় ‘শূন্য অনৈতিকতা’ বা ‘জিরো ইমমোরালিটি’ (The Law of Zero Immorality)।

কোরআনের আয়াতের—এমনকি প্রতিটি শব্দেরও রয়েছে এক গভীর ব্যাপকতা। একেকটি আয়াতে থাকে অনেক বড় বক্তব্য, সমস্যার পূর্বাভাস এবং তার মনস্তাত্ত্বিক সমাধান।

সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩০৫আল্লাহ তোমার জন্য যা বণ্টন করেছেন, তাতে সন্তুষ্ট থাকো; তাহলে তুমিই হবে মানুষের মধ্যে সর্বাধিক ঐশ্বর্যশালী।

কোরআন বলে, ‘আল্লাহ ছাড়া আর কারও ইবাদত কোরো না। নিশ্চয়ই আমি তাঁর পক্ষ থেকে সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা।’ (সুরা হুদ, আয়াত: ২)

সুরা কাহফের ৫৬ নম্বর আয়াতেও এসেছে, ‘আমি রাসুলদের একমাত্র সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপেই পাঠিয়ে থাকি।’

নবী-রাসুলেরা ছিলেন মূলত দুই ভূমিকায় অবতীর্ণ।

  • প্রথমত, তাঁরা ছিলেন সতর্ককারী; কারণ অনৈতিকতা ও অসৎ কাজই মানবজীবনের যাবতীয় ব্যক্তিগত ও সামাজিক সংকটের মূল কারণ।

  • দ্বিতীয়ত, তাঁরা ছিলেন সুসংবাদদাতা; কারণ নৈতিকতা ও সৎ কাজই মানুষের সব সমস্যার সমাধান করে।

‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর ভেতরের প্রজ্ঞা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর প্রথমে ‘লা’ (নেই) বলে সব অন্যায়, অনৈতিকতা ও অসৎকর্মকে দৃঢ়ভাবে ‘না’ বলা হয়েছে। অতঃপর আল্লাহকে একমাত্র ইলাহ স্বীকার করে সব ন্যায়, নৈতিকতা ও সৎকর্মকে ‘হ্যাঁ’ বলা হয়েছে।

সংকটকালে নেতৃত্ব দিতে সুরা কাহাফের ৩ শিক্ষা

ইসলামি জীবনদর্শনে অন্যায়-ন্যায় কিংবা অনৈতিকতা-নৈতিকতা—এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। এই দুই বিপরীত বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে এক অটুট মনস্তাত্ত্বিক সংযোগ।

অসৎকর্ম থেকে বেঁচে থাকতে হলে সৎকর্মের চর্চা করতে হয়; আবার সৎকর্মকে অর্থবহ করতে হলে অসৎকর্ম থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হয়। কোরআনে যখনই ‘ইমান আনা ও সৎকাজ করা’র কথা বলা হয়, তার অন্তর্নিহিত অর্থই হলো অসৎ কাজ বর্জন করা।

ঠিক একইভাবে, ‘শূন্য অনৈতিকতা’র ধারণার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে ‘শতভাগ নৈতিকতা’। আর কোরআনে একেই আখ্যায়িত করা হয়েছে ‘মহান চরিত্র’ হিসেবে।

এ জন্যই হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তোমার জন্য যা বণ্টন করেছেন, তাতে সন্তুষ্ট থাকো; তাহলে তুমিই হবে মানুষের মধ্যে সর্বাধিক ঐশ্বর্যশালী।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩০৫)

সুতরাং, ‘শূন্য অনৈতিকতা’র এই চর্চায় রয়েছে দুনিয়া ও আখেরাতের সব সমস্যার নিখুঁত সমাধান। সুরা কলমের ৩ ও ৪ নম্বর আয়াতে ‘নিশ্চয়ই’ শব্দ যোগে এই সফলতার শতভাগ গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছে।

এই সূত্র মানুষের জন্য তার একমাত্র ইলাহ, মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহার। এটাই ইসলামের মূল মর্মকথা, যা মানবজাতিকে সফলতার নিশ্চয়তা দেয়।

বাস্তবে মহানবী (সা.) যেভাবে পৃথিবীর ইতিহাসে সফলতার শীর্ষে পৌঁছেছেন এবং তাঁর সময়ের মুসলিম উম্মাহ যেভাবে শ্রেষ্ঠ উম্মত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল—তা কেবল কোনো তাত্ত্বিক কথা (থিওরি) নয়; বরং এটি একটি প্রমাণিত জীবনসূত্র (Law)।

এই সূত্র মানুষের জন্য তার একমাত্র ইলাহ, মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহার। এটাই ইসলামের মূল মর্মকথা, যা মানবজাতিকে সফলতার নিশ্চয়তা দেয়।

আজকের বৈশ্বিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে মুসলিম উম্মাহ যে বহুমুখী সংকটে জর্জরিত, তার মূল কারণ প্রিয় নবী (সা.)-এর সুন্নাহ তথা এই ‘শূন্য অনৈতিকতা’র পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া।

কোরআনে সুরা মুহাম্মদের ১৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘ভালো করে জেনে রাখো, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। আসলে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ হচ্ছে এই জগৎ ব্যবস্থাপনার মহাসূত্র (The Master Formula of the Management of Universe)।

আর ‘শূন্য অনৈতিকতা’ হলো এই মহাসূত্রেরই এক বাস্তব ও নৈতিক প্রতিফলন। এ জন্যই হাদিস শরিফে রাসুল (সা.) মানবজাতিকে সফলতার পথ দেখিয়ে বলেছেন, ‘হে মানুষ, তোমরা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলো, তাহলেই সফলকাম হবে।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৬০২৩)

  • মোহাম্মদ নাছির হোসাইন : মাস্টার মেরিনার (ক্যাপ্টেন), মেরিন সার্ভেয়ার ও কনসালট্যান্ট, চট্টগ্রাম

ইসলামের প্রাচীনত্ব: সব আসমানি ধর্মের মূল সূত্র কি একই