কানসাসের অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন কম্পাস মিনারেলস সেন্টারটা (সিএমসি) গত দেড় মাসে আর্জেন্টিনা দলের কাছে যেন নিজেদের ঘরের মতোই আপন হয়ে উঠেছিল। বিশ্বকাপের শুরু থেকে দেড় মাস ধরে আর্জেন্টিনা দল প্রস্তুতি সেরেছে এ ট্রেনিং সেন্টারেই। যেখানে এতটা দিন সময় কেটেছে, নিশ্চিত মেসিদের বড্ড মায়া পড়ে গেছে জায়গাটার জন্য।
যদি সেমিফাইনাল থেকে বিদায় ঘটে যায় কিংবা ফাইনালেও যদি ওঠা হয়, এ মাঠে সাকল্যে আর দু-তিন দিন অনুশীলন করবে আর্জেন্টিনা দল। বিশ্বকাপের শেষ দিকে এসে ট্রেনিং সেন্টারের কর্মীরাও কি একটু আবেগতাড়িত হয়ে পড়ছেন? বড় বড় তারকার তৈরি হওয়ার সব ফ্যাসিলিটিজ চাহিবামাত্র তৈরি রেখেছেন। তাঁদের খুব কাছ থেকে দেখেছেন এই দেড় মাস। যতই পেশাদারির খোলসে সব করুন না কেন, বিদায় বেলায় মেসিদের জন্য একটু আবেগ ছুঁয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক।
সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে সেমিফাইনালে ওঠার পরদিনও কানসাসে নিজেদের পরিচিত মাঠে অনুশীলন করেছে আর্জেন্টিনা। সবার আগে মাঠে এলেন কোচ লিওনেল স্কালোনি। পুরো মাঠ ঘুরে ঘুরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সহকারী কোচ পাবলো আইমার, ওয়াল্টার সামুয়েল, রবার্তো আয়ালা এবং ভিডিও বিশ্লেষক মাতিয়াস মান্না। খেলোয়াড়দের মুখে হাসি, মনে প্রশান্তি। ব্যস্ত সূচির কারণে বিশ্রামের সুযোগ খুবই সীমিত, সেই অল্প সময়টুকুই যেন উপভোগ করছিল পুরো দল।
সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে যাঁরা মাঠে নামেননি বা কম সময় খেলেছেন, তাঁদের নিয়ে আলাদা অনুশীলন পরিচালনা করেন ফিটনেস কোচ লুইস মার্তিন। সব মিলিয়ে দলের ছবিটা নির্ভার আর প্রাণবন্ত।
কিছুক্ষণ পর জিম থেকে বেরিয়ে আসেন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো ‘দিবু’ মার্তিনেস। অন্য গোলকিপারদের সঙ্গে মাঠে এসে স্কালোনির সঙ্গে আগের দিনের কোনো বিষয় নিয়ে কিছুক্ষণ আলোচনা করেন। কিন্তু দলের প্রাণভোমরা লিওনেল মেসি কোথায়?
সংবাদমাধ্যমের জন্য উন্মুক্ত রাখা প্রথম ১৫ মিনিটে দেখা যায়নি অধিনায়ক মেসিকে। তিনি বিশ্রামে নাকি সংবাদমাধ্যম এড়িয়ে গেছেন? পরে জানা গেল মেসি তখন সময় কাটিয়েছেন জিমে। তিনি পরে মাঠে যোগ দেন। তার আগে রদ্রিগো দি পল, নাউয়েল মলিনা, লিয়ান্দ্রো পারেদেস, হুলিয়ান আলভারেস, এনসো ফার্নান্দেসসহ ঘনিষ্ঠ সতীর্থদের সঙ্গে গল্প-আড্ডায় সময় কাটান। আড্ডায় হাতে হাতে ঘুরেছে আর্জেন্টিনার চিরচেনা সঙ্গী মাতে। আড্ডা ও জিম শেষে পুরো দলের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হয় একটাই লক্ষ্য—ইংল্যান্ডকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠতে হবে।
কিন্তু আর্জেন্টিনা দলকে কি ক্লান্ত দেখাচ্ছে? যেভাবে নকআউটে আর্জেন্টিনাকে জিততে ঘাম ছুটে যাচ্ছে, অতিরিক্ত সময় ম্যাচ গড়াচ্ছে, প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে দেরি করছে, সে কারণেই প্রশ্নটা আসছে। আর্জেন্টিনা টানা জিতলেও তাঁদের খেলার ধরন নিয়ে প্রশ্ন আছে খোদ আর্জেন্টিনা সংবাদমাধ্যমেরই।
আর্জেন্টিনার জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম ‘ওলে’র প্রতিবেদক নিকো বেরার্দো গতকাল আজকের পত্রিকাকে বিষয়টির ব্যাখ্যা দিলেন এভাবে, ‘বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ওঠা বাকি দলগুলোর মতোই আর্জেন্টিনা স্কোয়াডেও একই রকম ক্লান্তি ভর করছে। এই স্কোয়াডটি এমন সব খেলোয়াড় নিয়ে গড়া, যাঁরা বিশ্বের প্রধান লিগগুলোয় খেলেন। উয়েফা বা আমেরিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতাগুলোয় অংশ নেওয়া ক্লাবগুলোর হয়ে খেলে থাকেন তাঁরা। অন্য সব দলের মতোই ঠাসা সূচি তাঁদের ওপর প্রভাব ফেলেছে, কিন্তু তাঁদের পারফরম্যান্সের জন্য এটিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।’
ম্যাচের পরের দিন আর্জেন্টিনা অনুশীলন করলেও ইংল্যান্ড ছিল পুরোপুরি বিশ্রামে। ম্যাচের আগে মজার একটা পরিসংখ্যান আসছে সামনে, দীর্ঘ দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে মেসি কখনো ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হননি। তাঁর ইন্টার মায়ামির মালিক ডেভিড বেকহাম তো বটেই, সব ইংলিশকে ‘কাঁদাতে’ তৈরি হচ্ছেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক।
সেমিফাইনালের আগে আর্জেন্টিনাকে আরেকটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হচ্ছে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোন জার্সি পরে খেলবে তারা? সোমবার আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ), ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ) ও ফিফার প্রতিনিধিদের সমন্বয় সভায় ম্যাচ-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ের পাশাপাশি দুই দলের জার্সির রংও চূড়ান্ত করা হবে। আর্জেন্টিনাকে যদি অ্যাওয়া জার্সি পরতে হয়, তাহলে সেটি হবে নীল—যে জার্সি পরেই ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন ডিয়েগো ম্যারাডোনার দল। যদি জার্সি পরিবর্তন করে ইংল্যান্ড, তাহলে তারা মাঠে নামবে লাল জার্সিতে।
ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, নকআউট পর্বের ড্রয়ে যে দল ব্র্যাকেটের ওপরে থাকে, তাকে ‘টিম এ’ ধরা হয়। এ ক্ষেত্রে সেই দল হলো ইংল্যান্ড। নিজেদের মূল সাদা জার্সি পরার অধিকার তাদেরই বেশি, আর সে ক্ষেত্রে আর্জেন্টিনাকে নীল জার্সি পরতে হতে পারে। আরেকটি ব্যাখ্যাও রয়েছে। চাইলে ইংল্যান্ড তাদের বিকল্প লাল জার্সি বেছে নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে আর্জেন্টিনা স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের ঐতিহ্যবাহী আকাশি-সাদা জার্সি পরে খেলবে। ফিফার মূল লক্ষ্য থাকে দুই দলের জার্সির মধ্যে যেন সর্বোচ্চ দৃশ্যমান বৈপরীত্য থাকে। সে দিক থেকে লাল বনাম আকাশি-সাদা কিংবা সাদা বনাম নীল—দুই ক্ষেত্রেই সেই শর্ত পূরণ হয়।
এবারের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড ছয় ম্যাচের পাঁচটিতেই সাদা জার্সি পরে খেলেছে। আর্জেন্টিনাও তা-ই। বুধবারের মহারণে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে কি না, সেটাই দেখার।







