২০২৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাত। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় সড়কে শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাঈফ মামুনকে লক্ষ্যবস্তু বানায় প্রতিপক্ষ। চারটি মোটরসাইকেলে আসা অস্ত্রধারীরা মামুনের গাড়ি আটকে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে এবং কুপিয়ে জখম করে। তাদের ছোড়া গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে আইনজীবী ভুবন চন্দ্র শীলের মাথায় বিদ্ধ হয়। তিনি ভাড়ায় চলিত একটি মোটরসাইকেলে ওই পথ ধরে বাসায় ফিরছিলেন। এ ঘটনায় ছয় দিন চিকিৎসার পর মারা যান ভুবন। তার মৃত্যুর প্রায় তিন বছর হয়ে গেল। কিন্তু এখনো জড়িতদের গ্রেফতার এমনকি শনাক্তও করতে পারেনি পুলিশ। ঘটনার পর থেকে প্রায় দুই বছরের তদন্তেও কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা। এরপর মামলা হস্তান্তর করা হয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে। পরিবারের সদস্যরা দ্রুত বিচারের প্রত্যাশা করছিলেন। তবে এখন তদন্তেই আশাহত হয়ে পড়েছেন। এক অর্থে বিচারের আশা ছেড়ে দিয়েছেন নিহত ভুবনের স্বজনরা।

জানতে চাইলে ভুবনের স্ত্রী রত্না রানী শীল যুগান্তরকে বলেন, ‘ওই ঘটনার পর মানসিকভাবে এখনো স্বাভাবিক হতে পারিনি। পুলিশ আমাদেরকে তদন্তের কোনো অগ্রগতির কথা জানায়নি, যোগাযোগও করেনি। শারীরিকভাবে অসুস্থতার জন্য স্কুলের চাকরিটাও ঠিকমতো করতে পারছি না। বাবা ও ভাইয়েরা আর্থিক সহযোগিতা করছেন। মামলা নিয়ে তৎপর থাকার মতো কোনো পরিস্থিতি নেই আমার। তদন্ত বা বিচার নিয়ে এখন আর ঘাঁটতে চাই না। মেয়েকে নিয়ে বাঁচতে চাই।’

শুধু ভুবন চন্দ্র শীল হত্যা মামলা নয়, ডিবিতে দুই বছরের বেশি ঝুলছে এমন অন্তত ৪৪টি মামলা। এর মধ্যে আদালতের নির্দেশে তদন্ত কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে ১১টির। ১৫ বছরের আগে করা মামলাও এ তালিকায় রয়েছে। ডিবির মামলার রেকর্ড পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

এতে দেখা যায়, জুন পর্যন্ত ১ হাজার ১২টি মামলা তদন্তাধীন। এর মধ্যে ১ বছরের বেশি তদন্ত চলছে ১৭১টির। আর দুই বছরের বেশি রয়েছে ৪৪টি মামলা। সর্বশেষ মাসে নিষ্পত্তি হয়েছে ১৪৩টি মামলা। আর নতুন করে তদন্তের জন্য এসেছে ১৫৭টি। এছাড়া এর আগের মাসে তদন্ত শেষ না হওয়া ৯৯৮টি মামলা যোগ হয়েছে তদন্তাধীন মোট মামলার সংখ্যায়। বিভাগ অনুযায়ী মামলার সংখ্যায় দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি মামলা সাইবারের দুই বিভাগে। সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম-উত্তরে ১৪২টি এবং দক্ষিণে ১৫২টি। অন্যদিকে গোয়েন্দা-রমনা বিভাগে ৭২, লালবাগ ৫০, ওয়ারী ৯৯, মতিঝিল ১২৫, তেজগাঁও ১০৯, মিরপুর ১০২, গুলশান ৭৩ এবং উত্তরা বিভাগে ৮৮টি মামলা তদন্তাধীন। আর সর্বশেষ মাসে নিষ্পত্তি হয়েছে রমনা বিভাগে ১২টি, লালবাগে ১৭, ওয়ারী ২০, মতিঝিল ১৪, তেজগাঁও ১১, মিরপুর ১৩, গুলশান ১৯, উত্তরা ১৬, সাইবার উত্তর ১২ এবং দক্ষিণে মাত্র ৯টি।

তদন্তের ধীরগতি বিষয়ে জানতে চাইলে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আমরা প্রতিটি মামলার তদন্ত শতভাগ নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করছি। যাতে কোনো অপরাধী ছাড় না পায় আবার কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন। এজন্য আমরা যাবতীয় তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ, পর্যালোচনা এবং সঠিকভাবে উপস্থাপনে গুরুত্ব দিচ্ছি। একই সঙ্গে তদন্ত দ্রুততম সময়ে শেষ করার জন্য তদন্তসংশ্লিষ্ট ও জেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত তদারকি করছি। তিনি বলেন, পুরোনো অল্প কিছু মামলা রয়েছে, সেগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ করার জন্য আমরা কাজ করছি। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে আদালতের নির্দেশে কিছু মামলার তদন্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল। এসব মামলার বিষয়ে আদালতের পরবর্তী নির্দেশনা অনুযায়ী তদন্ত কার্যক্রম চলবে।

ভুবন হত্যা মামলার অগ্রগতি : ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ভুবন হত্যার ঘটনায় মামলা থানায় তদন্তাধীন থাকার সময় সন্দেহভাজন এক যুবককে গ্রেফতার করা হয়। তার নাম মারুফ বিল্লাহ হিমেল। তবে তাকে গ্রেফতারের প্রায় ৫ মাস পর জামিনে বেরিয়ে ভারতে আত্মগোপনে চলে যায়। ডিবির তদন্তে দেখা যায়, ওই যুবক শীর্ষ সন্ত্রসী মামুনের সঙ্গে ঘটনার আগে যোগাযোগ করেছিল। তাকে আবার গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে ভুবন হত্যায় জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

প্রসঙ্গত, শীর্ষ সন্ত্রাসী মামুনকে তেজগাঁওয়ে হত্যাচেষ্টা ব্যর্থ হলেও দুই বছর পর গত বছরের ১০ নভেম্বর ফের টার্গেট করা হয়। পুরান ঢাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় তাকে। পরে এ ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজের সূত্র ধরে গ্রেফতার করা হয় ৫ জনকে। ভুবন হত্যা মামলার কর্মকর্তারা জানান, মামুন হত্যায় গ্রেফতার ব্যক্তিদের ভুবন হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তাদের এ মামলায় রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তবে তারা তেজগাঁওয়ের হামলায় অংশ নেয়নি বলে জানা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ভুবন ও মামুন হত্যায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের অনুসারীরা জড়িত।

মামলা বেশি ঝুলছে সাইবারে : ডিবির মামলার পরিসংখ্যান অনুযায়ী সাইবারের দুই বিভাগে তদন্তাধীন মামলা সবচেয়ে বেশি ঝুলছে। আবার নিষ্পত্তির গতিও সবচেয়ে কম দেখা গেছে। সর্বশেষ মাসে সাইবার উত্তর ১২টি ও দক্ষিণ মাত্র ৯টি মামলার তদন্ত শেষ করেছে। যেখানে অন্য বিভাগগুলো ১২ থেকে ২০টি পর্যন্ত তদন্ত শেষ করেছে। কারণ জানতে চাইলে বিভাগ দুটির কর্মকর্তারা বলছেন, মামলাগুলোর অধিকাংশ আর্থিক প্রতারণাসংক্রান্ত। তদন্তে ফরেনসিক রিপোর্ট পেতে বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। বর্তমানে সাইবার উত্তরের প্রায় অর্ধেক মামলা আটকে আছে শুধু ফরেনসিক রিপোর্ট না পাওয়ায়। এরপর আর্থিক লেনদেনের তথ্যপ্রাপ্তি ও তা পর্যালোচনা এবং পরিচয় শনাক্তের বিড়ম্বনায় তদন্তে সময় লেগে যায়। প্রায় সব ঘটনায় দেখা যায়, অপরাধীরা অন্যের পরিচয়ে ব্যাংক অথবা মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেন। আবার সিমও অন্যের তথ্যে কেনা।