আমাজন অরণ্য পৃথিবীর সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল। এই বিশাল জঙ্গলে এমন অনেক প্রাণী রয়েছে, যাদের চেহারা ও আচরণ প্রথম দেখায় অবিশ্বাস্য মনে হয়। তেমনই এক বিস্ময়কর প্রাণী হলো বাল্ড উকারি। উজ্জ্বল লাল মুখ, টাক মাথা এবং ছোট লেজের জন্য পরিচিত এই বানরকে পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত চেহারার প্রাইমেটদের অন্যতম বলে মনে করা হয়।

প্রথমবার বাল্ড উকারিকে দেখলে অনেকেরই মনে হতে পারে, যেন কোনো শিল্পী কল্পনার রঙে এ প্রাণীটিকে এঁকেছেন। কিন্তু প্রকৃতির সৃষ্ট এই প্রাণীর প্রতিটি বৈশিষ্ট্যের পেছনেই রয়েছে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।

লাল মুখের পেছনের রহস্য

বাল্ড উকারির বৈজ্ঞানিক নাম কাকাজাও ক্লাভস। এদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো উজ্জ্বল লাল মুখ। সাধারণত স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মুখে এত উজ্জ্বল রং দেখা যায় না। গবেষকদের মতে, এই লাল রঙের কারণ হলো মুখের ত্বকের নিচে থাকা অসংখ্য সূক্ষ্ম রক্তনালী। যেহেতু মুখের অংশে লোম প্রায় নেই বললেই চলে, তাই রক্তের লাল আভা স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

আরও মজার বিষয় হলো, একটি সুস্থ বাল্ড উকারির মুখ যত বেশি উজ্জ্বল লাল হবে, তাকে তত বেশি সুস্থ ও শক্তিশালী হিসেবে ধরা হয়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই রং সম্ভাব্য সঙ্গীর কাছে স্বাস্থ্য ও প্রজননক্ষমতার সংকেত হিসেবে কাজ করে। বিপরীতে অসুস্থ বা দুর্বল উকারির মুখ তুলনামূলকভাবে ফ্যাকাশে হয়ে যায়। অর্থাৎ মুখের রংই যেন এদের ‘স্বাস্থ্য রিপোর্ট’।

jago

অদ্ভুত গড়ন

বাল্ড উকারির শরীর সাধারণত ঘন বাদামি বা লালচে-বাদামি লোমে ঢাকা থাকে। তবে মাথার ওপরের অংশে প্রায় কোনো লোম থাকে না, যা তাদের টাক দেখায়। এদের আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো ছোট লেজ। অধিকাংশ গাছে বসবাসকারী বানরের লেজ দীর্ঘ হয় এবং ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করে। কিন্তু বাল্ড উকারির লেজ শরীরের তুলনায় বেশ ছোট। প্রাপ্তবয়স্ক বাল্ড উকারির ওজন সাধারণত ৩ থেকে ৪ কেজির মধ্যে হয় এবং দেহের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৫ থেকে ৬০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে।

বাল্ড উকারির আবাসস্থল

বাল্ড উকারির আবাস দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন অববাহিকা। বিশেষ করে ব্রাজিল ও পেরুর প্লাবিত বনাঞ্চল, জলাভূমি ও নদীঘেরা জঙ্গলে এদের বেশি দেখা যায়। বছরের একটি বড় সময় এসব বনাঞ্চল পানিতে ডুবে থাকে, তবুও বাল্ড উকারিরা সেখানে সহজেই মানিয়ে নিয়েছে। জীবনের অধিকাংশ সময় তারা গাছের উঁচু ডালে কাটায়। খুব প্রয়োজন না হলে মাটিতে নামে না। গাছ থেকে গাছে লাফিয়ে চলাফেরা করাই তাদের স্বাভাবিক জীবনধারা।

লালমুখো বানরের খাবার

বাল্ড উকারি মূলত ফলভোজী প্রাণী। তারা বিভিন্ন ধরনের ফল, বীজ, কচি পাতা, ফুল ও উদ্ভিদের অন্যান্য অংশ খেয়ে থাকে। বিশেষ করে শক্ত খোসাযুক্ত বীজ ভাঙার জন্য তাদের দাঁত অত্যন্ত শক্তিশালী। অনেক সময় মৌসুমি ফলের প্রাপ্যতা কমে গেলে তারা বিকল্প খাদ্যও গ্রহণ করে। ফলে পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা তাদের বেশ ভালো।

jago

সামাজিক জীবনে ব্যতিক্রম

বাল্ড উকারিরা অত্যন্ত সামাজিক প্রাণী। তারা সাধারণত বড় দলে বসবাস করে। একটি দলে ৩০ থেকে ১০০টিরও বেশি সদস্য থাকতে পারে। দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করলে শিকারির আক্রমণ থেকে বাঁচা সহজ হয় এবং খাদ্য খোঁজাও সুবিধাজনক হয়। দলের সদস্যদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ডাক ও অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে যোগাযোগ হয়। গবেষকদের মতে, তাদের সামাজিক সম্পর্ক বেশ জটিল এবং সংগঠিত।

হুমকির মুখে বাল্ড উকারি

প্রকৃতির এই বিস্ময়কর প্রাণী বর্তমানে নানা হুমকির মুখে রয়েছে। আমাজন অঞ্চলে বন উজাড়, কৃষিজমি সম্প্রসারণ, অবৈধ শিকার এবং আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে এদের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমছে। সংরক্ষণবিদরা মনে করেন, আমাজনের বন রক্ষা করা না গেলে ভবিষ্যতে বাল্ড উকারির অস্তিত্বও ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই এই বিরল প্রাণীকে বাঁচাতে বন সংরক্ষণ এবং শিকার নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি।

লাল মুখের জন্য পরিচিত বাল্ড উকারি শুধু একটি অদ্ভুত বানরই নয়, বরং প্রকৃতির বিবর্তনের এক অনন্য উদাহরণ। তাদের মুখের রং যেমন স্বাস্থ্য নির্দেশ করে, তেমনি আমাদেরও মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টি কতটা বিস্ময়কর ও রহস্যময়।

সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফি

কেএসকে