টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা এবং কয়েক জেলায় বন্যার মধ্যেও সোমবার দেশের বিভিন্ন এলাকায় এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কোথাও কোমরসমান পানি পেরিয়ে, কোথাও নৌকা ও ভ্যানে চড়ে কেন্দে পৌঁছাতে হয়েছে পরীক্ষার্থীদের। ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে বেশ কিছু জেলায় শিক্ষার্থীদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রোববার থেকেই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা সোমবার ও আশপাশের তারিখের কয়েকটি পরীক্ষা স্থগিতের দাবি জানান। তবে তাদের দাবি মানা হয়নি। ফলে ভারি বর্ষণের ভেতর কোমর পানি ডিঙিয়ে অনেক কষ্ট করে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীদের কেন্দে যেতে হয়েছে।

এদিকে সোমবার পরীক্ষা স্থগিতের একই দাবি তুলেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠনও। যদিও শিক্ষা বোর্ড বলছে, স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরীক্ষা চালিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ব্যাখ্যাও দিয়েছে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি। বোর্ডের দাবি, স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিবেদন ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে।

সোমবার দেশজুড়ে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের ষষ্ঠ দিনের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। তবে বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড এবং ওই বোর্ডের আওতাধীন মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডের ১৬ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত থাকায় অন্য আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা যথারীতি অনুষ্ঠিত হয়। বৃষ্টি উপেক্ষা করে সকাল থেকেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীরা উপস্থিত হতে থাকেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন অভিভাবকরাও। এদিন দেশের কয়েকটি অঞ্চলে পরিস্থিতি ছিল অনেক বেশি দুর্বিষহ। রাজধানীর ঢাকা, কুমিল্লা ও নোয়াখালীর হাতিয়ার কয়েকটি কেন্দ্রে পানি জমে যায়।

শিক্ষার্থীদের কষ্ট দিয়ে পরীক্ষা গ্রহণ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান বলেন, ‘পরীক্ষা হবে কি না, সেটি আমরা কেন্দ্রীয়ভাবে বসে সিদ্ধান্ত দেই না। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসন কেন্দ্র ও আশপাশের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে আমাদের কাছে প্রতিবেদন পাঠায়। তারা যদি জানান পরীক্ষা নেওয়ার মতো পরিবেশ নেই, তখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।’

রাজধানীর উত্তরার একটি কলেজের পরীক্ষার্থী হালিমা আক্তার বলেন, টানা বৃষ্টি, রাস্তায় জলাবদ্ধতা এবং বাসায় বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনা করা সম্ভব হচ্ছে না। এমন অবস্থায় পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষায় বসতে হবে। বৈরী আবহাওয়ার বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

সালাউদ্দিন নামে আরেক শিক্ষার্থী বলেন, শুধু চট্টগ্রাম নয়, দেশের বিভিন্ন জেলাতেই একই ধরনের পরিস্থিতি। তাই সব শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা অন্তত এক সপ্তাহ পিছিয়ে দেওয়া উচিত। দুর্যোগের মধ্যে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় বসানো ঠিক হবে না। এছাড়া অনেকে পরীক্ষা দিতে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে। এ অবস্থায়ই আবার পরীক্ষায় অংশ নিতে হচ্ছে। শিক্ষা বোর্ডের উচিত ছিল পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া।

আন্তঃশিক্ষা শিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার যুগান্তরকে বলেন, এই বিষয়ে মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত দেবে। এই মুহূর্তে কিছু বলা যাচ্ছে না ।

সাময়িক পরীক্ষা স্থগিতের দাবি বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের : এদিকে সোমবার সাময়িকভাবে পরীক্ষা স্থগিতের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। পৃথক বিবৃতিতে সংগঠন দুটি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, যাতায়াতের দুর্ভোগ এবং মানসিক চাপের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পরীক্ষা পেছানোর আহ্বান জানিয়েছে।

সোমবার ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, দেশের কয়েকটি জেলায় আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের কারণে লাখো মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আশ্রয়কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং বিভিন্ন এলাকার সড়ক যোগাযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পরীক্ষার্থীদের নিরাপদে কেন্দ্রে যাতায়াত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এদিকে একই দাবিতে বিবৃতি দিয়ে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ বলেন, দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীবান্ধব নয়। এ অবস্থায় পরীক্ষা অব্যাহত থাকলে উচ্চশিক্ষায় ভর্তি প্রস্তুতিও ব্যাহত হতে পারে। তাই বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি এবং পরীক্ষা গ্রহণের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত চলমান এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তারা।

এর আগে পরীক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম। রোববার নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, পরীক্ষা দিতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির ভিডিও সবারই নজরে এসেছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় তাদের দাবিটি পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানান তিনি।

সোমবার আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামানের সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দেশের ২ হাজার ৬৯৭টি কেন্দ্রে ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা ১৬ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত করা হলেও অন্য বোর্ডগুলোর কেন্দ্রগুলো পরীক্ষা নেওয়ার উপযোগী রয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে সাময়িক ভোগান্তি হলেও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় তারা পরীক্ষায় অংশ নিতে সক্ষম হয়েছেন। একই সঙ্গে ১২ লাখের বেশি পরীক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম, ফল প্রকাশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়া বিবেচনায় বারবার পরীক্ষা স্থগিত করা বাস্তবসম্মত নয় বলেও উল্লেখ করা হয়। কোনো এলাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরীক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বা পরীক্ষা গ্রহণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবেন বলে বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়।