জর্জকুট্টি ‘দৃশ্যম’ ফ্র্যাঞ্চাইজির কেন্দ্রীয় চরিত্র। সম্ভবত পর্দার খুব কম অপরাধীকেই তাঁর মতো বোঝা বয়ে বেড়াতে হয়েছে। জর্জকুট্টি জন্মগত অপরাধী নন। বরং তাঁর অপরাধবোধ তৈরি হয়েছে একজন আদর্শ পারিবারিক মানুষের পরিচয়ের ওপর, যিনি নিজের পরিবারকে রক্ষা করতে যেকোনো পর্যায়ে যেতে পারেন। অপরাধ করতে তিনি আনন্দ পান না, যদিও পুলিশকে বারবার ফাঁকি দিতে পারার মধ্যে তাঁর একধরনের গোপন আত্মতৃপ্তি খুঁজে পাওয়া যায়। সদ্য ওটিটিতে আসা এই ফ্র্যাঞ্চাইজির তৃতীয় কিস্তি দেখার সময় প্রথমেই মনে হয়, জর্জকুট্টির মতো কোনো মানুষের বন্ধু হওয়া কি আদৌ সম্ভব? এমন একজনকে কি বিশ্বাস করা যায়, যাঁর প্রতারণার ক্ষমতা এতটাই নিখুঁত যে শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেই নিজের মনের কাছে বন্দী হয়ে পড়েছেন? ছবির একাধিক মুহূর্তে সেই বন্দিত্বের প্রতীকও দেখা যায়—জর্জকুট্টি যেন নিজের বাড়ির জানালার শিকের আড়ালেই আটকে আছেন।
এ প্রশ্ন থেকেই শুরু হয় জিতু জোসেফের ‘দৃশ্যম ৩’। ছবিটি যেমন একজন মানুষকে বোঝার চেষ্টা, তেমনি এক সাধারণ পরিবারের কর্তা ও তাকে ধরতে বদ্ধপরিকর পুলিশ বাহিনীর মধ্যে বুদ্ধির লড়াইও।
একনজরেসিনেমা: ‘দৃশ্যম ৩’ধরন: থ্রিলার, ড্রামাপরিচালনা: জিতু জোসেফঅভিনয়: মোহনলাল, আনসিবা হাসান, মীনা, এস্থার অনিলস্ট্রিমিং: অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওদৈর্ঘ্য: ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট
দ্বিতীয় সিনেমার পর ছয় বছর পেরিয়ে গেছে। জর্জকুট্টি (মোহনলান) এখন ব্যস্ত বড় মেয়ে অঞ্জুর (আনসিবা হাসান) বিয়ের আয়োজন নিয়ে। একের পর এক ঘটক আসে, সম্ভাবনাময় সম্বন্ধও আসে, কিন্তু পরিবারের অন্ধকার অতীতের কারণে সবকিছুই ভেস্তে যায়। এর ভেতর পাড়ার কিছু অজ্ঞাতপরিচয় মানুষও বিয়ে বানচাল করার চেষ্টা চালায়। মজার বিষয় হলো, প্রথমার্ধে বিয়ে এত গুরুত্বপূর্ণ যে ছবির উপশিরোনাম অনায়াসে হতে পারত ‘একটি বিয়ের গল্প’।
এবার জিতু জোসেফ যেন ‘দৃশ্যম’ ফ্র্যাঞ্চাইজিকে ঘিরে দর্শকের প্রচলিত প্রত্যাশা থেকে কিছুটা সরে এসেছেন। সাম্প্রতিক কয়েকটি ছবিতে তিনি যেভাবে একের পর এক চমকপ্রদ মোচড় দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, এখানে সে পথে হাঁটেননি। বরং একটি অপরাধ কীভাবে এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রত্যেক মানুষের জীবন বদলে দেয়, সেটিই আরও বিস্তৃতভাবে অনুসন্ধান করেছেন।
প্রথম ছবিতে জর্জকুট্টিই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু পরের দুই ছবিতে তাঁকে সব সময় ভাবতে হয়েছে, সেই একটি ঘটনার মূল্য শেষ পর্যন্ত তাঁর পরিবারকে কতটা দিতে হবে। পুরোনো মামলাটি পুলিশ আবার খুলবে কি না, এ প্রশ্ন ছবির প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রকেই তাড়া করে বেড়ায়।
‘দৃশ্যম ৩’ জর্জকুট্টির চরিত্রের আরও গভীরে প্রবেশ করে। সময়ের নানা আঘাত তাঁর ও তাঁর আশপাশের মানুষদের কতটা বদলে দিয়েছে, সেটাই ছবির মূল অনুসন্ধান। এখানে একটি আকর্ষণীয় দিক হলো, বিপদের সময় যাঁরা জর্জকুট্টিকে সাহায্য করেছিলেন, তাঁদের অনেকের পরবর্তী সংগ্রামের কথা তিনি নিজেই জানেন না।
জর্জকুট্টি এখন ১০০ কোটি রুপির ছবির সফল প্রযোজক। প্রথম ছবিতে কেবল টিভি অপারেটর থেকে সিনেমা হলের মালিক হওয়ার যে উত্থান শুরু হয়েছিল, এবার তা পূর্ণতা পেয়েছে। একেবারে নিম্নবিত্ত থেকে সমাজের উচ্চস্তরে উঠে এসেছে তাঁর পরিবার।

কিন্তু এ সাফল্যের মূল্যও দিতে হয়েছে। একসময় শহরের মানুষ তাঁকে নিজেদের একজন ভাবত। এখন তিনি আর ‘আমাদের’ নন; তিনি ‘ওদের’ একজন—ক্ষমতাবান, প্রভাবশালী, প্রয়োজনে নিজের পথ নিজেই করে নিতে পারেন, এমন একজন মানুষ। তাঁর ছবির পাইরেটেড কপি অনলাইনে ছড়িয়ে পড়তেই তিনি সরাসরি ডিজিপির কাছে অভিযোগ জানান। জনমতের তোয়াক্কা করার প্রয়োজনও বোধ করেন না।
সব সময়ের মতোই জর্জকুট্টিকে বোঝা কঠিন। তবে এবার বয়স যেন তাঁর মস্তিষ্কের ধার কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে। আগে যেভাবে মানুষকে দাবার ঘুঁটির মতো ব্যবহার করতেন, এখন আর সেভাবে সবার ওপর নজর রাখতে পারেন না। বড় মেয়ে অঞ্জুর বিয়ের আলোচনা শুরু হতেই বোঝা যায় যে তাঁর নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে যাচ্ছে। চারদিকে অসংখ্য চোখ তাঁকে অনুসরণ করছে। প্রশ্ন হলো, পরিবারকে বাঁচাতে তিনি কি আবারও সব সীমা অতিক্রম করবেন, নাকি অনেক আগেই এমন এক জায়গায় পৌঁছে গেছেন, যেখান থেকে আর ফিরে আসা সম্ভব নয়?
এ জায়গাতেই ‘দৃশ্যম ৩’ কেবল একটি থ্রিলার হয়ে থাকে না; এটি ধীরে ধীরে এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের গল্পে রূপ নেয়। জর্জকুট্টির অন্ধকার দিক এবার এতটাই স্পষ্ট যে তাঁর পক্ষে দাঁড়ানো সহজ নয়। প্রথম দুই ছবিতে আমরা দেখেছি, তাঁর পরিবারের কারণে আরেকটি পরিবার কীভাবে ভেঙে পড়েছিল। এবার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা আরও অনেক বেশি।
আলোচিত ‘দৃশ্যম ৩’, ওটিটিতে আরও যা দেখবেনসবকিছু হারিয়ে ফেলা রাজনকে (দীনেশ প্রভাকর) যখন আবার দেখি, তখন প্রথমবারের মতো মনে হয় যে হয়তো এবার জর্জকুট্টির হারাই উচিত। কারণ, নিজের পরিবারকে বাঁচাতে গিয়ে তিনি যতগুলো পরিবার ধ্বংস করেছেন, তার সংখ্যা তিনি যাদের রক্ষা করেছেন, তার চেয়ে বেশি। আত্মরক্ষার গল্প বলতে বলতে ‘দৃশ্যম’ ফ্র্যাঞ্চাইজি যেন আত্মকেন্দ্রিকতার গল্পে পৌঁছে গেছে।
তবে চিত্রনাট্যকার জিতু জোসেফ নিজের ছবির নৈতিক অবস্থান সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন। এক চলচ্চিত্র পরিচালক যখন জর্জকুট্টির কাছে আসেন, তখন শুরু থেকেই বোঝা যায় যে সম্পর্কটির পেছনে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য আছে। আবার দরিদ্র পরিবারের এক তরুণী যখন তার সাহায্যের জন্য কৃতজ্ঞতা জানায়, তখনো স্পষ্ট হয় যে জর্জকুট্টির প্রতিটি ‘সাহায্য’ই আসলে শর্তসাপেক্ষ। নিজের মেয়ের বিয়ের নিমন্ত্রণপত্রে খরচ করতেও কার্পণ্য করেন যে মানুষ, প্রয়োজনে মানুষের আনুগত্য কিনতে তিনি আবার অকাতর অর্থ ব্যয় করেন।
সম্ভবত এ কারণেই জিতু জোসেফ শেষ পর্যন্ত একটি স্পষ্ট খলনায়কের প্রয়োজন অনুভব করেছেন, যাতে জর্জকুট্টির ধূসর চরিত্রের বিপরীতে আরেকটি শক্ত অবস্থান তৈরি হয়। দীর্ঘ সময় ধূসর আবহে চলার পর ছবিটি শেষ ভাগে কিছুটা প্রচলিত থ্রিলারের পথে হাঁটে। জর্জকুট্টিকে ধরতে একের পর এক পরিকল্পনা সাজানো হয় আর মনে হতে থাকে যেন পুরো পৃথিবীই তাঁর বিরুদ্ধে। কিন্তু এত দিন ধরে জর্জকুট্টিকে দেখে আমরা তাঁকে কখনোই হালকাভাবে নিই না। বরং তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়েই অতিরিক্ত ভাবতে শুরু করি।

ছবিতে ভুলত্রুটিরও অভাব নেই। বিশেষ করে জনপ্রিয় এক প্রতিপক্ষ চরিত্রের পুনরাগমন ঘটে অদ্ভুত লালচে চোখ নিয়ে, যা হাস্যকর লাগে। আবার সাংবাদিক চরিত্রে বীনা নন্দকুমারকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হলেও মাঝপথেই তাঁকে কার্যত ভুলে যায় চিত্রনাট্য। অতিরিক্ত আবেগনির্ভর নাটকীয়তা আর ভারী সংলাপ ছবির গতি বারবার থামিয়ে দেয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুরোনো ঢঙের দৃশ্যায়ন, যা ছবিটিকে আরও ভারাক্রান্ত করে তোলে। তবে সিনেমাটিকে বাঁচায় চিত্রনাট্যের কয়েকটি বুদ্ধিদীপ্ত মোচড় আর মোহনলালের অসাধারণ অভিনয়। জর্জকুট্টির মানসিক জগৎকে তিনি যেভাবে উপলব্ধি করেছেন এবং পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন, সেটিই এ ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি।
এ ছবিতে জর্জকুট্টি চরিত্রে মোহনলালকে এমন এক চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে হয়েছে, যাঁর ভেতরের সংকট প্রকাশ করার মতো প্রায় কোনো মানুষই নেই। তাঁর সব দ্বিধা, ভয় আর অপরাধবোধ স্তরের পর স্তর চাপা পড়ে আছে। তিনি জানেন, কাউকেই পুরোপুরি বিশ্বাস করা যায় না। মোহনলাল সেই নীরব ভাঙন অসাধারণ সংযমে পর্দায় তুলে ধরেছেন।

যদিও ছবিটির কিছু চরিত্রের অতিরঞ্জিত অভিনয় ও সংলাপ বিরক্তি বাড়ায়। জটিল পরিকল্পনাগুলো এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয় যেন ছোট শিশুদের বোঝানো হচ্ছে। একের পর এক এমন দৃশ্যের পর ছবি কিছুটা ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে।
তবু ‘দৃশ্যম ৩’শেষ পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়ায়, কারণ দর্শকেরা চরিত্রগুলোর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছেন। ‘দৃশ্যম’ লিখতে বসলেই যেন জিতু জোসেফ অন্য একজন নির্মাতায় পরিণত হন। গল্প এমন সব দিকে মোড় নেয়, যা অনুমান করা কঠিন।
শেষের মোচড়টি কার্যকর শুধু অপ্রত্যাশিত বলেই নয়, বরং ৩টি ছবি আর ১৩ বছর পেরিয়েও আমরা এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি যে পরিবারকে রক্ষা করতে জর্জকুট্টি ঠিক কত দূর যেতে পারেন।
হয়তো ‘দৃশ্যম ৩’ এই ট্রিলজির সবচেয়ে দুর্বল ছবি। কিন্তু এটুকু নিশ্চিত করে বলা যায় যে জর্জকুট্টিকে আমরা কখনোই পুরোপুরি বুঝতে পারব না।








