টেকসই উন্নয়ন এখন আর ব্যয়ের খাত নয়, এটি মুনাফা বৃদ্ধির মূল হাতিয়ায়। এটি এখন আর লোক দেখানো শব্দ নয়, এটি মুনাফার অন্যতম চালিকাশক্তিও। টেকসই উন্নয়ন বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে ও কর্মীদের কাজে অনুপ্রেরণা যোগায়। কর্মীদের বোনাস প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখে টেকসই উন্নয়ন।

শনিবার (১৮ জুলাই) রাজধানীর র‍্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘সাসটেইনাবিলিটি সামিট ২০২৬- এর একটি সেশনে বক্তারা এসব কথা বলেন।

বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরাম ও সাসটেইনেবল ব্র্যান্ড ইনিশিয়েটিভের আয়োজনে এবং বাংলাদেশ ইনোভেশন কনক্লেভের উদ্যোগে দিনব্যাপী এ সামিট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে আকিজ বশির গ্রুপ পরিবেশনায়, এসএমসি এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড ও আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ (এআইইউবি) সঞ্চালনায় এবং প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ ও বিজিএমইএ সহযোগী হিসেবে রয়েছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান।

একটি সেশনে এসিআই লজিস্টিকস লিমিটেডের (স্বপ্ন) ম্যানেজিং ডিরেক্টর সাব্বির হাসান নাসির বলেন, ব্যবসায়িক টেকসই উন্নয়ন এখন আর লোক দেখানো শব্দ নয়, এটি মুনাফার অন্যতম চালিকাশক্তি। সাসটেইনেবিলিটি শব্দটি এখন আর কেবল করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (সিএসআর) বিভাগের কোনো লোক দেখানো বা গালভরা শব্দ (বাজওয়ার্ড) নয়। এটি এখন সিএসআর বিভাগ থেকে বেরিয়ে সরাসরি কোম্পানির বোর্ডরুম, ফাইন্যান্স এবং স্ট্র্যাটেজিক বা কৌশলগত বিভাগে জায়গা করে নিয়েছে।

তিনি বলেন, আমি মনে করি, টেকসই উন্নয়ন মানেই হলো অপচয় রোধ করা। সেটি হতে পারে খাদ্যের অপচয়, শক্তির অপচয় কিংবা মানুষের সুপ্ত প্রতিভার অপচয়। আমরা এমন একটি অপারেটিং সিস্টেম বা পরিচালন ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছি, যেখানে পুরো ভ্যালু চেইন এমনভাবে কাজ করবে যা মানুষ, পৃথিবী এবং মুনাফাকে (প্রফিট) একসঙ্গে সুসমন্বিত করবে।

তিনি আরও বলেন, আমরা যখন আমাদের ‘বিফ কম্বো প্যাক’ চালু করি, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল গ্রাহকদের সচেতন করা। বার্তাটি ছিল স্পষ্ট-আপনার ঠিক যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই কিনুন। ধারণাটি কিছুটা নতুন মনে হতে পারে, তবে আমরা মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে টেকসই উন্নয়নের একটি যোগসূত্র তৈরি করতে চাই। অপচয় করবেন না; যেটুকু ব্যবহার করতে পারবেন না, তা কেনার প্রয়োজন নেই। আর এভাবেই অপচয় কমিয়ে আনা সম্ভব।

এ সময় গ্রামীণফোন লিমিটেডের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার ইয়াসির আজমান বলেন, শুধু লোক দেখানো সামাজিক কাজ নয়, ‘সাসটেইনেবিলিটি’ এখন বোনাসেরও অন্যতম শর্ত। এখন আমাদের নিজের বোনাস টার্গেট বা পারফরম্যান্স বোনাসের একটি বড় অংশ সরাসরি যুক্ত রয়েছে আমাদের টেকসই উন্নয়ন বা সাসটেইনেবিলিটি উদ্যোগগুলোর সঙ্গে। আমরা পরিবেশ রক্ষায় কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছি ও সেটির ফলাফল কেমন হচ্ছে-তার ওপরই এখন আমার বোনাস নির্ভর করে। আমরা কার্বন নিঃসরণ কতটা কমিয়ে আনছি, আমাদের ব্যবহৃত ব্যাটারি বা অন্যান্য সামগ্রী কতটা রিসাইকেল (পুনর্ব্যবহার) করতে পারছি-সবকিছুই এখন পরিমাপ করা হয়।

তিনি আরও বলেন, আমাদের প্রযুক্তি বা ডিভাইসগুলো যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে, তার বিপরীতে আমরা অন্য প্রান্তে কতটা নবায়নযোগ্য বা গ্রিন এনার্জি (সবুজ শক্তি) যুক্ত করতে পারছি, তা এখন কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। অর্থাৎ, এটি এখন একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা, নিখুঁত পরিমাপ এবং কোম্পানির কর্মীদের জন্য একটি বড় প্রণোদনা (ইনসেন্টিভ) হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

সাসটেইনেবিলিটি এখন আর কেবল ভালো লাগার কোনো বিষয় নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি সরাসরি আমাদের পারফরম্যান্স ও প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়নের অংশ। এটি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ায় ও কর্মীদের মনে কাজের অনুপ্রেরণা যোগায়।

অনুষ্ঠানে লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ পিএলসির চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী বলেন, টেকসই উন্নয়ন এখন আর ব্যয়ের খাত নয়, এটি মুনাফা বৃদ্ধির মূল হাতিয়ার। এটি এখন আর কোনো সাধারণ লোক দেখানো সামাজিক কাজ নয়, বরং ব্যবসার লাভজনক প্রবৃদ্ধি (প্রফিট্যাবল গ্রোথ) নিশ্চিত করার মূল চালিকাশক্তি।

তিনি বলেন, আমাদের কোম্পানিতে সাসটেইনেবিলিটি সরাসরি মুনাফা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। আমাদের মূল সূত্রটি হলো-রিইউজ (পুনর্ব্যবহার), রিডিউস (হ্রাস করা) এবং রিসাইকেল (পুনর্ব্যবহারযোগ্য করা)। এর মানে হলো, আপনি একাধারে আপনার পরিচালন ব্যয় (কস্ট) কমিয়ে আনছেন, নিজের গ্রহ বা পরিবেশকে রক্ষা করছেন এবং একইসঙ্গে স্টেকহোল্ডার বা অংশীজনদের প্রত্যাশাও পূরণ করছেন। আর এটাই বর্তমান করপোরেট বিশ্বের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।

আরও পড়ুন

দেশে এখনো কার্যকর বন্ড বাজার গড়ে ওঠেনি: বিএসইসি চেয়ারম্যান

জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে লাফার্জ হোলসিমের রূপান্তর তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, আমরা আমাদের জ্বালানি খাতে বড় পরিবর্তন এনেছি। প্রাকৃতিক গ্যাস বা কয়লার মতো জীবাশ্ম জ্বালানি (ফসিল ফুয়েল) ছেড়ে আমরা এখন বর্জ্য থেকে তৈরি বিকল্প জ্বালানি (অল্টারনেটিভ ফুয়েল) ব্যবহার করছি। এটি আমাদের পিঅ্যান্ডএল (লাভ-ক্ষতির হিসাব) তথা ব্যবসায় বিশাল ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর ফলে আমাদের জ্বালানি খরচ প্রায় ১০ ভাগের ১ ভাগে নেমে এসেছে! একদিকে আমরা কার্বন নিঃসরণ কমাচ্ছি, অন্যদিকে বর্জ্য পুড়িয়ে ল্যান্ডফিলিং বা মাটির নিচে বর্জ্য ফেলার পরিমাণ কমিয়ে পরিবেশ রক্ষা করছি।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, টেকসই অর্থায়নের মূল ভিত্তি হলো ইএসজি (পরিবেশ, সমাজ ও সুশাসন)। তবে, দুর্ভাগ্যবশত আমাদের দেশে পরিবেশের বিষয়টি এখনো পেছনের সারিতে। প্লাস্টিক দূষণ ও নদী দূষণ আমাদের চারপাশকে গ্রাস করছে। এছাড়া, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষায় আমাদের দেশে কঠোর আইনি প্রয়োগের বিকল্প নেই।

দেশের করপোরেট সুশাসনের দুর্বলতা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশে করপোরেট সুশাসন এখনো কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ, বাস্তবে এর প্রয়োগ কম। বিশেষ করে অনেক স্বাধীন পরিচালক (ইন্ডিপেনডেন্ট ডিরেক্টর) বোর্ডরুমের আলোচনায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছেন না। তাদের পেশাগত দক্ষতা ও সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ব্যাপক প্রশিক্ষণের প্রয়োজন।

সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরিফুল ইসলাম বলেন, টেকসইতা এখন আর বছরে একবার আলোচনা করে ফেলে রাখার মতো কোনো ধারণা নয়। এটি এমন একটি চর্চা, যা প্রতিটি ব্র্যান্ড ও প্রতিষ্ঠানের মূল সত্তায় প্রোথিত হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশ যখন ২০৩০ সালের এসডিজি লক্ষ্যমাত্রার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন দায়িত্বশীল ব্যবসা কোনো বিকল্প নয়-এটাই আমাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ভিত্তি। এখনই সময় দায়বদ্ধতা থেকে কার্যকর প্রভাবে এবং কমপ্লায়েন্স থেকে দায়িত্বশীল আচরণে উত্তরণের।

ইএইচটি/এএমএ