বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) আরবান ও রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাকিল আক্তার বলেছেন, বাংলাদেশে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হলে মানুষের আচরণ পরিবর্তন করতে হবে। পাশাপাশি শিশুদের ছোটবেলা থেকেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরে বিশ্ব পরিবেশ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে টেকসই প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: চ্যালেঞ্জ ও অংশীদারদের দায়িত্ব’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে সমাপনী বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি। যৌথভাবে এ বৈঠকের আয়োজন করে পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। এর মিডিয়া পার্টনার ছিল জাগোনিউজ২৪.কম।
তিনি বলেন, ‘এসি রুমে বসে আমরা অনেক সুন্দর সুন্দর কথা বলতে পারি। কিন্তু বাস্তব দুনিয়ায় আসলে কী হচ্ছে, সেটিও আমাদের বুঝতে হবে। আমরা অনেক সুন্দর নীতিমালা করছি, কিন্তু সেগুলোর বাস্তবায়ন যারা করবেন এবং যেখান থেকে বাস্তবায়ন শুরু হবে, সেই জায়গার চ্যালেঞ্জগুলো আমরা কতটা বুঝতে পারছি সেটি গুরুত্বপূর্ণ।’
আরও পড়ুন
সত্য ভট্টাচার্য / প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উৎস পর্যায়ে পৃথকীকরণে গুরুত্ব দিতে হবে
পরবর্তী সময়ে এ ধরনের আলোচনায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ভাঙারি ব্যবসায়ী ও অন্যান্য অংশীজনদের অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।
শাকিল আক্তার বলেন, প্লাস্টিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক সংগঠনের প্রতিনিধিদেরও এ ধরনের আলোচনায় থাকা প্রয়োজন। কারণ, বৈশ্বিক পর্যায়ে কমিটমেন্ট থাকা বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ করবে। তবে স্থানীয় পর্যায়ে বর্জ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের দায়িত্ব ও প্রতিশ্রুতির বিষয়টিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
সোর্স সেগ্রিগেশন বা উৎস পর্যায়ে বর্জ্য পৃথকীকরণের বিষয়ে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে শুধু জনগণকে দায়িত্ব দিলে হবে না, সিটি করপোরেশনগুলোকেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
জাপানের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সেখানে সিটি করপোরেশন প্রতিদিন বর্জ্য সংগ্রহ করে না। সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিন নির্দিষ্ট ধরনের বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। কোনোদিন রান্নাঘরের বর্জ্য, কোনোদিন নন-রিসাইকেল বর্জ্য এবং ভারী ইলেকট্রনিক বর্জ্যের জন্য রয়েছে আলাদা ব্যবস্থা।
‘আমরা কেন এ ধরনের ব্যবস্থায় যেতে পারছি না?’ প্রশ্ন রাখেন তিনি।
গোলটেবিল বৈঠকে বুয়েটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাকিল আক্তার/ছবি: জাগো নিউজ
অধ্যাপক শাকিল আক্তার বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমরা বিভিন্ন ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে শিখছি। কিন্তু বিদেশে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করছি, তা দেশের বাস্তবতায় প্রয়োগের ক্ষেত্রে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ভ্যালু চেইনের গুরুত্ব তুলে ধরে ড. শাকিল আক্তার বলেন, আলোচনায় ভ্যালু চেইনের বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে আসা দরকার। প্লাস্টিক বর্জ্যের একটি অংশ মূল্যবান হলেও বড় একটি অংশের ক্ষেত্রে কী হচ্ছে, সেটি নিয়ে ভাবতে হবে। বিশেষ করে সিঙ্গেল-ইউজ প্লাস্টিক ও মাইক্রোপ্লাস্টিক বর্তমানে বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, ‘প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলছি, কিন্তু আমাদের নিজেদের দৈনন্দিন কাজেও পরিবর্তন আনতে হবে। চ্যারিটি বিগিনস অ্যাট হোম পরিবর্তন নিজের ঘর থেকেই শুরু করতে হবে।’
বিভিন্ন সংগঠন ও এনজিওর উদ্যোগের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কিছু প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে নো-ওয়েস্ট নীতিতে কাজ করছে এবং প্লাস্টিকের পরিবর্তে কাচের বোতল ও গ্লাস ব্যবহার করছে। এ ধরনের উদ্যোগ আরও বাড়াতে হবে।
সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি কার্যকর অবকাঠামো তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। বিদেশে মানুষ কীভাবে নিজেদের বর্জ্য বহন করে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলে, তার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় মানুষের আচরণ পরিবর্তনের পাশাপাশি সঠিক ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, শিশুদের ছোটবেলা থেকেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। জাপানের স্কুল ব্যবস্থার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সেখানে শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হিসেবেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শেখানো হয়। ফলে তারা কোথায় কীভাবে বর্জ্য ফেলতে হবে, তা ছোটবেলা থেকেই জানে।
পরিবেশ অধিদপ্তরে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত অতিথিদের একাংশ, ছবি: জাগো নিউজ
পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (বর্জ্য ও কেমিক্যাল ব্যবস্থাপনা) রাজিনারা বেগমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান। পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (আইন) খালেদ হাসান, পরিচালক (প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা) এ কে এম রফিকুল ইসলাম, পরিচালক (পরিকল্পনা শাখা) মো. হাসান হাসিবুর রহমান, পরিচালক (আইটি) মো. সাদিকুল ইসলাম, উপ-পরিচালক (বর্জ্য ও রাসায়নিক পদার্থ ব্যবস্থাপনা) ড. আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ পরিবেশ অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. মাহবুবুর রহমান তালুকদার, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা, বাংলাদেশ পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেডের (বিপিসিএল) প্রধান নির্বাহী খাদেম ইউসুফ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিব আহমেদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল কাদের ইবনে কামাল, বিইউপির পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আরিফুর রহমান ভূঁইয়া, জাতিসংঘ শিল্প উন্নয়ন সংস্থা (ইউনিডো) বাংলাদেশের ন্যাশনাল প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর সত্য ভট্টাচার্য, ইউনিলিভার বাংলাদেশের কান্ট্রি প্রকিউরমেন্ট লিড দিলরুবা আহমেদ চৌধুরী, ব্র্যাকের পরিচালক ড. মো. লিয়াকত আলী, লাফার্জ হোলসিমের ডেপুটি ম্যানেজার (জিওসাইকেল) তামরিন চৌধুরী, নেসলে বাংলাদেশের এইচআর ডিরেক্টর হোসনে আরা লোমা, ম্যারিকো বাংলাদেশের ডিরেক্টর (লিগ্যাল অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স) রাশেদ এহসান, ওয়েস্ট কনসার্নের কো ফাউন্ডার ও ডিরেক্টর ইফতেখার এনায়েতুল্লাহ, জাগো নিউজের সম্পাদক কে এম জিয়াউল হক, সমকালের সিনিয়র রিপোর্টার জাহিদুর রহমান প্রমুখ বৈঠকে অংশ নেন।
আরএএস/এমএএইচ/








