রাজধানীর জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ একবার ব্যবহারযোগ্য (সিঙ্গেল ইউজ) প্লাস্টিক। এসব প্লাস্টিক উৎস পর্যায়ে আলাদা করে সংগ্রহ করা না গেলে কার্যকর পুনর্ব্যবহার (রিসাইক্লিং) সম্ভব নয়।

বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরে বিশ্ব পরিবেশ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে ‘বাংলাদেশে টেকসই প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: চ্যালেঞ্জ ও অংশীদারদের দায়িত্ব’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. মোহাম্মদ সফিউল্লাহ সিদ্দিক ভূঁইয়া।

পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ যৌথভাবে গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। মিডিয়া পার্টনার ছিল জাগোনিউজ২৪.কম।

ড. সফিউল্লাহ বলেন, পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জ্যের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ড্রেন, বক্স কালভার্ট ও খালে গিয়ে জমা হয়। ফলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।

তিনি বলেন, উৎস পর্যায়ে প্লাস্টিক সংগ্রহ করা গেলে পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাঁচামালের গুণগত মানও বাড়বে। কারণ মিশ্র বর্জ্যের সঙ্গে ধুলাবালি ও অন্যান্য উপাদান মিশে প্লাস্টিকের মান নষ্ট করে দেয়। উৎস পর্যায়ে এগুলো আলাদা করার কোনো বিকল্প নেই।

ডিএসসিসির এ কর্মকর্তা জানান, এর আগে পাইলট প্রকল্প হিসেবে সোর্স সেগ্রিগেশন কার্যক্রম নেওয়া হলেও জনসচেতনতা ও ভ্যালু চেইন ধরে রাখতে না পারায় কাঙ্ক্ষিত সফলতা আসেনি। তবে নতুন করে ধানমন্ডি, আজিমপুর ও মিন্টো রোডসংলগ্ন মন্ত্রীপাড়া এলাকায় দুই-বিন পদ্ধতিতে আবারও এ কার্যক্রম শুরু করা হবে।

উৎসে প্লাস্টিক সংগ্রহে বাড়বে পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাঁচামালের মানগোলটেবিল বৈঠকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. মোহাম্মদ সফিউল্লাহ সিদ্দিক ভূঁইয়া/ছবি: জাগো নিউজ

তিনি বলেন, পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য সপ্তাহে একদিন আলাদাভাবে সংগ্রহ করলেই যথেষ্ট, আর জৈব বর্জ্য প্রতিদিন সংগ্রহ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রাণ-আরএফএলসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) কর্মসূচির আওতায় এগিয়ে এলে পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য ভাঙ্গারি দোকান ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত করা সম্ভব হবে। এতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান ‘লিকেজ’ অনেকটাই কমে আসবে।

ড. সফিউল্লাহ বলেন, প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এক্সটেন্ডেড প্রডিউসার রেসপনসিবিলিটি (ইপিআর) কার্যকর করা জরুরি। তার মতে, প্লাস্টিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পুনর্ব্যবহৃত কাঁচামাল ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা উচিত। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠান ১০০ টন প্লাস্টিক উৎপাদন করলে অন্তত ১০ টন পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যেতে পারে।

ডিএসসিসির এ কর্মকর্তা আরও বলেন, শুধু উৎপাদনকারী নয়, নির্মাণ প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন খাতে পুনর্ব্যবহৃত পণ্য ব্যবহারেরও বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত। সরকারের নীতিমালায় মোট ব্যবহৃত পণ্যের অন্তত ৫ থেকে ১০ শতাংশ রিসাইকেলড পণ্য ব্যবহারের বিধান রাখা হলে এ খাত আরও শক্তিশালী হবে। পাশাপাশি সরকারকে কর ও ভ্যাটসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রণোদনা দেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।

ডিএসসিসির চলমান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের বিষয়ে ড. সফিউল্লাহ বলেন, পুরোনো ল্যান্ডফিল পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি নন-রিসাইকেলেবল সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিককে পাইরোলাইসিস প্রযুক্তির মাধ্যমে বায়ো-অয়েল, কার্বন ব্ল্যাক ও সিনগ্যাসে রূপান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে প্লাজমা গ্যাসিফিকেশন প্রযুক্তিও যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে উৎপাদিত জ্বালানির গুণগত মান আরও উন্নত করা যায়।

তিনি বলেন, বর্তমানে প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের নেতৃত্বে সরকার, সিটি করপোরেশন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বয়ে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা গেলে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকর ও টেকসই অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হবে।

উৎসে প্লাস্টিক সংগ্রহে বাড়বে পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাঁচামালের মানগোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত অতিথিরা/ছবি: জাগো নিউজ

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (বর্জ্য ও কেমিক্যাল ব্যবস্থাপনা) রাজিনারা বেগমের সঞ্চালনায় গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান। পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (আইন) খালেদ হাসান, পরিচালক (প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা) এ কে এম রফিকুল ইসলাম, পরিচালক (পরিকল্পনা শাখা) মো. হাসান হাসিবুর রহমান, পরিচালক (আইটি) মো. সাদিকুল ইসলাম, উপ-পরিচালক (বর্জ্য ও রাসায়নিক পদার্থ ব্যবস্থাপনা) ড. আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ পরিবেশ অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা, বাংলাদেশ পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেডের (বিপিসিএল) প্রধান নির্বাহী খাদেম ইউসুফ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিব আহমেদ, বুয়েটের আরবান ও রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাকিল আক্তার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল কাদের ইবনে কামাল, বিইউপির পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আরিফুর রহমান ভূঁইয়া, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল, ইউনিলিভার বাংলাদেশের কান্ট্রি প্রকিউরমেন্ট লিড দিলরুবা আহমেদ চৌধুরী, ব্র্যাকের পরিচালক ড. মো. লিয়াকত আলী, লাফার্জ হোলসিমের ডেপুটি ম্যানেজার (জিওসাইকেল) তামরিন চৌধুরী, নেসলে বাংলাদেশের এইচআর ডিরেক্টর হোসনে আরা লোমা, ম্যারিকো বাংলাদেশের ডিরেক্টর (লিগ্যাল অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স) রাশেদ এহসান, ওয়েস্ট কনসার্নের কো-ফাউন্ডার ও ডিরেক্টর ইফতেখার এনায়েতুল্লাহ, জাগো নিউজের সম্পাদক কে এম জিয়াউল হক, সমকালের সিনিয়র রিপোর্টার জাহিদুর রহমান প্রমুখ বৈঠকে অংশ নেন।

এমএমএ/এমএমএআর