বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) থেকে পণ্যের হালাল সনদ নিতে গেলে গাড়ি ও টাকা ঘুস চাওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়া দেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণে (এক্সপোর্ট ডাইভার্সিফিকেশন) হালাল পণ্যকে অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে উল্লেখ করেছেন ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকরা।

তারা বলেছেন, বৈশ্বিক হালাল পণ্যের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও বাংলাদেশ এখনো সেই সম্ভাবনার তুলনায় অনেক পিছিয়ে। এ অবস্থায় দেশের জন্য একটি একক হালাল অথরিটি বা হালাল বোর্ড গঠন, আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার স্থাপন এবং ‘বাংলাদেশ হালাল’ ব্র্যান্ডিংয়ের উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

শনিবার (১৮ জুলাই) সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) আয়োজিত ‘রপ্তানি বহুমুখীকরণে হালাল’ শীর্ষক কর্মশালায় ব্যবসায়ীরা এসব কথা বলেন। এতে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির সভাপতি আনোয়ার- উল আলম চৌধুরী। এতে সম্মানিত অতিথি ছিলেন রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ হাসান আরিফ।

অনুষ্ঠানে বিসিআইয়ের পরিচালক ও ইজি ফুডের চেয়ারম্যান জিয়া হায়দার বলেন, বিএসটিআই থেকে হালাল সনদ আনতে গেলে তারা বলে গাড়ি দাও, টাকা দাও। কত টন রপ্তানি হবে, সেই অনুপাতে চাঁদা দাও।

বোম্বে সুইটস লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক খুরশীদ আহমাদ ফরহাদ একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, সনদ নিতে মাশুল দিতে হয় ১৬ থেকে ১৮ লাখ টাকা। এখন কিছুটা কমানো হয়েছে। কিন্তু এসব সনদ সৌদি আরবে টেকে না। কেননা, সৌদি আরবের সঙ্গে চুক্তি নেই। বাধ্য হয়ে আমাদের ভারত, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুর থেকে সনদ নিতে হয়।

সভাপতির বক্তব্যে আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী বলেন, এলডিসি উত্তরণ এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গঠনের লক্ষ্য অর্জনে স্থানীয় শিল্পের বিকাশ ও রপ্তানি বাড়ানোর বিকল্প নেই। বর্তমানে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮২ শতাংশই তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত থেকে আসে। তাই নতুন পণ্য ও নতুন বাজারের দিকে গুরুত্ব দিয়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণ জরুরি।

তিনি বলেন, খাদ্য ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম, হালাল অর্থনীতি, প্রযুক্তিনির্ভর পোশাক, ইলেকট্রনিকস, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, আইসিটি, চামড়া, আসবাবপত্র এবং জাহাজ নির্মাণ খাত ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত হতে পারে।

বিসিআই সভাপতি জানান, বর্তমানে দেশের হালাল পণ্যের রপ্তানি প্রায় ৮৫ কোটি (৮৫০ মিলিয়ন) ডলার হলেও বৈশ্বিক হালাল বাজারের আকার ২০২৫ সালে প্রায় ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার এবং ২০৩৪ সালে তা ৯ দশমিক ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্বের প্রায় ২০০ কোটি মুসলিমের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও স্বাস্থ্য, নৈতিকতা ও মানের কারণে হালাল পণ্যের প্রতি আগ্রহী হচ্ছেন।

আরও পড়ুন

‘টেকসই উন্নয়ন এখন আর ব্যয়ের খাত নয়, মুনাফা বৃদ্ধির হাতিয়ার’

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়ায় ‘বাংলাদেশ হালাল’ ব্র্যান্ড গড়ে তোলার বড় সুযোগ রয়েছে। তবে, বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও বিএসটিআই আলাদাভাবে হালাল সনদ দেওয়ায় ব্যবসায়ীদের ব্যয় বাড়ছে। এ কারণে একক হালাল কর্তৃপক্ষ গঠন সময়ের দাবি।

প্রধান অতিথি মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এখন সময়ের দাবি এবং হালাল খাত এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শুধু কৃষিভিত্তিক ও খাদ্যপণ্য নয়, হালাল অর্থনীতির আরও বহু ক্ষেত্র রয়েছে, যেগুলো বাংলাদেশ কাজে লাগাতে পারে।

তিনি বলেন, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে, রপ্তানি বাড়াতে ব্যবসায়ীদের সব ধরনের সহযোগিতা দিতে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো কাজ করে যাবে।

কর্মশালায় এফবিসিসিআই এর সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন, বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ডের মহাপরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম, অ্যাসোসিয়েশন অব টেস্টিং ল্যাব বাংলাদেশ-এর সভাপতি আহাশান হাবিব, বিসিআই পরিচালক জিয়া হায়দার মিঠুসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি অংশ নেন।

কর্মশালা থেকে হালাল পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে বাংলাদেশকে একটি ‘হালাল হাব’ হিসেবে গড়ে তোলা, একক হালাল বোর্ড প্রতিষ্ঠা, আন্তর্জাতিক মানের ল্যাব সুবিধা সম্প্রসারণ, উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত শরিয়াহ, স্বাস্থ্য ও নৈতিক মান নিশ্চিত করা, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও অন্যান্য সফল দেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো এবং সরকার-বেসরকারি খাত ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমন্বয়ে গবেষণা ও দক্ষ জনবল উন্নয়নের সুপারিশ করা হয়।

ইএইচটি/এএমএ