বিশ্বকাপের মঞ্চে আজ্জেদিন উনাহি মরক্কোর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছেন। উনাহি শেষ ষোলোর লড়াইয়ে কানাডার বিপক্ষে জোড়া গোল করে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে তুলে দিয়েছেন দলকে।
২০০০ সালের ১৯ এপ্রিল কাসাব্লাঙ্কায় জন্ম উনাহির। ফুটবলের প্রতি ভালোবাসাই তার সম্পদ। কৈশোরে তিনি পাড়ি জমান ফ্রান্সে। সেখানে শুরু হয় কঠিন সংগ্রাম। কঠোর পরিশ্রম, অনিশ্চয়তা আর নিজেকে প্রতিনিয়ত প্রমাণ করার লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠেন তিনি। পরিবারের সমর্থন এবং মানসিক শক্তি তাকে এগিয়ে দেয় স্বপ্নের পথে।
উনাহির ফুটবল-শিক্ষা শুরু মরক্কোর বিখ্যাত রাজা ক্লাবের একাডেমিতে। পরে তিনি যোগ দেন মোহাম্মদ ষষ্ঠ ফুটবল একাডেমিতে। ফ্রান্সে গিয়ে স্ট্রাসবুর্গের দ্বিতীয় দলে খেললেও খুব বেশি সুযোগ পাননি। অ্যাভরঁশে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। সেই পারফরম্যান্স তাকে নিয়ে যায় আঁজেতে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে দুর্দান্ত নৈপুণ্যের পর যোগ দেন অলিম্পিক মার্শেইয়ে। গ্রিসের প্যানাথিনাইকোসে ধারে খেলে নজর কাড়েন এবং গত বছর স্পেনের লা লিগার ক্লাব জিরোনায় যোগ দেন। ইউরোপের বিভিন্ন লিগে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাকে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম পরিপূর্ণ মিডফিল্ডারে পরিণত করেছে।
জাতীয় দলের জার্সিতে উনাহির উত্থান রূপকথার মতো। কাতার বিশ্বকাপে আফ্রিকার প্রথম দেশ হিসাবে মরক্কোকে সেমিফাইনালে তুলতে তার অবদান ছিল অনন্য। স্পেন ও পর্তুগালের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে তার নৈপুণ্য বিশ্ব ফুটবলের নজর কেড়েছিল। স্পেনের তৎকালীন কোচ লুইস এনরিকে ম্যাচ শেষে উনাহির প্রশংসা করেছিলেন। সেই বিশ্বকাপ থেকেই তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবলের বড় তারকাদের কাতারে জায়গা করে নেন। এই বিশ্বকাপেও সেই ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন উনাহি। মাঝমাঠে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ, নিখুঁত পাস, প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে আক্রমণ তৈরি এবং প্রয়োজনে নিজেই গোল করে হয়ে উঠেছেন মরক্কোর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অস্ত্র।
হিউস্টনের সেই রাতটি ছিল উনাহির। প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকার পর দ্বিতীয়ার্ধে বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। ৫০ মিনিটে আশরাফ হাকিমির নিচু ফ্রিকিক থেকে আসা বল বক্সের বাইরে পেয়ে প্রথম স্পর্শেই ডান পায়ের দুর্দান্ত নিচু শটে কানাডার জাল কাঁপান তিনি। ৮২ মিনিটে পালটা আক্রমণ থেকে আবারও নিখুঁত ফিনিশিংয়ে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন। উনাহির জোড়া গোল তাকে ম্যাচের অবিসংবাদিত নায়কে পরিণত করে।
পরে উনাহি বলেন, ‘এটি সহজ ম্যাচ ছিল না। কানাডা আমাদের কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছিল। আমরা দ্বিতীয়ার্ধে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছি। আমরা এখানেই থামতে চাই না।’ মরক্কোর প্রধান কোচ মোহাম্মদ ওয়াহাবি বলেন, ‘উনাহিকে আরও আক্রমণাত্মক ভূমিকায় খেলানোর সিদ্ধান্তই সাফল্যের অন্যতম কারণ। আমরা জানতাম উনাহি প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙতে পারে। তাই তাকে একটু সামনে খেলিয়েছি। সে আমাদের আস্থার প্রতিদান দিয়েছে।’
ফুটবল বিশ্লেষকদেরও প্রশংসা থামছে না। উনাহি শুধু মরক্কোর নন, বিশ্বের অন্যতম সেরা বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডার। কানাডার বিপক্ষে তিনটি গোলের মধ্যে দুটি এসেছে তার পা থেকে। পুরো ম্যাচে তিনি মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রেখেছিলেন। মরক্কোর ক্লিনিক্যাল ফুটবলের প্রতীক হয়ে উঠেছেন এই ২৬ বছর বয়সি তারকা। হিউস্টনের গ্যালারিতে হাজারো মরক্কান সমর্থকের কণ্ঠে একটাই ধ্বনি-‘উনাহি, উনাহি...’। কেউ আনন্দে কেঁদেছেন, কেউ জাতীয় পতাকা কাঁধে নিয়ে নেচেছেন। মনে হচ্ছিল, এই একজন ফুটবলারই যেন কোটি মানুষের স্বপ্নকে নতুন করে ডানা মেলে দিয়েছেন।
আধুনিক ফুটবলে মিডফিল্ডারদের কাজ শুধু রক্ষণ সামলানো নয়, খেলার ছন্দ নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণ গড়ে তোলা এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে গোল করা। উনাহি এই তিনটি কাজই সমান দক্ষতায় করেন।
মরক্কোর কোটি সমর্থকের সবচেয়ে বড় ভরসা উনাহি। বড় মঞ্চে যখন একজন নায়কের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয়, তখনই জ্বলে ওঠেন এই মিডফিল্ডার।








