লিচুর নাম উঠতেই যে কারো মনে আসে দিনাজপুর জেলার নাম। আর ‘লিচুর রাজ্য’ খ্যাত জেলার ‘বেদানা লিচু’র নাম তার মধ্যে অন্যতম। স্বাদে-গন্ধে এবং স্বকীয়তায় বিভিন্ন জাতের লিচুর ভিড়ে নিজেকে রেখেছে অন্যতম উচ্চতায়। আদায় করে নিয়েছে উৎপত্তিস্থলের ভৌগলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতি।
দিনাজপুর জেলায় এই বেদানা লিচুর রয়েছে আড়াইশ বছরের বর্ণাঢ্য ইতিহাস। শুরুটা একজন কৃষকের মাধ্যমে হলেও পরে এই বেদানা লিচু চাষের বিস্তার ঘটে রাজা, জমিদার ও ব্রিটিশ শাসকদের হাত ধরে। তবে দিনাজপুরে বেদানা লিচুর বাণিজিক্য উৎপাদন শুরু হয় ৩৫ থেকে ৪০ বছর আগে। যা এক সময় মন্ত্রী, এমপি, সচিব, আমলাদের কাছে কাজ বাগিয়ে নেওয়ার টনিক হিসেবেও কাজ করতো।
‘একটা সময় লিচুর লোভে অনেকে মাশিমপুর গ্রামে বিয়ে করতে চাইতেন। মেয়ে দেখতে এলে বাড়িতে লিচুর গাছ আছে কি না তাও দেখতেন। আমরা আমাদের বাবা-দাদাদের কাছে শুনেছি বৃটিশ আমলের শুরুতে জনৈক আব্দুল হক প্রথম বেদানা লিচুর চারা ভারত থেকে এনে রোপন করেছিলেন। তার হাত ধরেই মাশিমপুরে লিচুর চাষ শুরু হয়।’
জেলায় পাঁচ হাজার ৮৯০ হেক্টর জমিতে লিচুর চাষ হয়ে থাকে। যার মধ্যে বেদানা লিচু চাষ হয় ২৯৫ দশমিক ৫ হেক্টর জমিতে।
আরও পড়ুন
বোম্বাই লিচুতে বাজার মাত, রাজশাহীতে ৫৬ কোটি টাকার বাণিজ্যের আশা
দেশে এখন বিভিন্ন জেলায় ১১টি জাতের লিচু চাষ হয়ে থাকে। যার মধ্যে সবচেয়ে মজাদার এই বেদানা লিচু। যাকে প্রাকৃতিক রসগোল্লা বলা হয়ে থাকে। অন্যান্য জেলায় চাষ হলেও দিনাজপুরের বেদানা লিচুর সঙ্গে কোনো জেলার বেদানা লিচুর স্বাদ, গন্ধ, রং, আকার মিলবেই না। দেশজুড়ে এর কদরই আলাদা।

যেভাবে এলো বেদানা লিচু
প্রায় আড়াইশো বছর আগে ভারতের বোম্বাই অঞ্চল থেকে প্রথম ‘বেদানা’ লিচুর চারা নিয়ে আসেন দিনাজপুর সদর উপজেলার ৬নং আউলিয়াপুর গ্রামের মাশিমপুর গ্রামের আব্দুল হক নামের এক ব্যক্তি। ওই চারা তিনি নিজ বাড়ির সামনে রোপণ করেন। এর কয়েক বছরের মধ্যে এই খবর ছড়িয়ে পড়ে জেলার সর্বত্র। সেসময় রাজা, জমিদার ও ব্রিটিশ শাসকেরা এই লিচু খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তোলেন। পরে ব্রিটিশ শাসক, রাজা ও জমিদারদের হাত ধরেই বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল, বিশেষ করে দিনাজপুরে পক্তভাবে গোড়াপত্তন হয়।
আরও পড়ুন
কেজিতে বিক্রি হচ্ছে লিচু, লাভ নাকি ক্ষতি
এখানকার মাটি ও আবহাওয়া লিচুচাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী প্রমাণিত হওয়ায় এটি দেশজুড়ে বিখ্যাত হয়ে ওঠে। দিনাজপুরের রাজবাড়ীতে লিচু চাষের ইতিহাসও জানা যায়। সেখানে একটি পুরাতন বেদানা লিচুর গাছ এখনো রয়েছে। পরে আস্তে আস্তে সারাদেশে লিচুচাষ ছড়িয়ে পড়ে।
‘ইতিহাস এবং ঐতিহ্য থেকে যতটুকু জানা যায়, কয়েক শতাব্দী থেকে এই অঞ্চলের যে লিচুর ঐতিহ্য এবং এখানকার যে খ্যাতি সেটা মাশিমপুর নামক একটি গ্রাম এবং তৎসংলগ্ন এলাকা জুড়ে। সেখান থেকে এটি অনুমিত হয় যে, বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের যে জেলাগুলোতে লিচুর বিস্তার হয়েছে, তা মাশিমপুরকে কেন্দ্র করেই হয়েছে।’
বেদানা লিচুর জাত
বেদানা লিচুর দুটি জাত রয়েছে একটি বেদানা, অপরটি হারিয়ানা বেদানা। দুটি জাতের মধ্যে বেদানা নামের লিচুর চাহিদা ও কদর দেশজুড়ে।

বেদানা লিচুর নামকরণ
বেদানা লিচুর ভেতরের বীজটি বেদানার (ডালিম) বীজের মতো খুব ছোট এবং শাঁস বা মাংসের অংশ অনেক বেশি পুরু হয়। লিচুর ভেতরের বীজ (বিচি) বেদানার (ডালিম) বীজের মতো খুব ছোট হওয়ায় এই লিচুর নাম হয়েছে বেদানা লিচু।
আরও পড়ুন
আমের লাভ গিলে খাচ্ছে ‘ঢলন’ প্রথা
দিনাজপুরের বেদানা লিচু চেনার উপায়
বেদানা লিচুর ভেতরের বীজটি বেদানার (ডালিম) বীজের মতো খুব ছোট এবং শাঁস বা মাংসল অংশ অনেক বেশি পুরু হয়। এর মিষ্টতা অসাধারণ এবং খোসা তুলনামূলকভাবে মশৃণ ও পাতলা। রং উজ্জ্বল লাল মিষ্টি কালারের। এই বিশেষ বৈশিষ্ট্য দেখলেই বুঝবেন এটা দিনাজপুরের বেদানা লিচু।
বেদানা লিচু নিয়ে বিভিন্নজনের বক্তব্য
হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. এজামুল হক বলেন, দিনাজপুর জেলায় বিভিন্ন রকম ফল উৎপাদন হয়। আম, লিচু, কাঁঠালসহ অন্যান্য ফলমূল। এ বছর দিনাজপুর জেলায় প্রায় ৬ হাজার হেক্টর জমিতে লিচু আবাদ হয়েছে। দিনাজপুরে বোম্বাই, কাঠালি, মাদ্রাজী, চায়না থ্রি, বেদানাসহ মোট ১১টি জাতের লিচু চাষ হয়। আমরা এরই মধ্যে বেদানা লিচুকে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছি, এতে কৃষকরা আরও উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। এই লিচুর নতুন ভ্যারাইটির দরকার, যেটি এই বৈশ্বিক আবহাওয়ার উপযোগী হবে। যদি আমরা উন্নত জাত কৃষকদের দিতে পারি তাহলে আরও বেশি লিচু চাষে উদ্বুদ্ধ হবেন তারা।
‘জন্মের পর থেকেই এই বেদানা লিচুর গাছটির নাম শুনে আসছি- জোড়া বুড়া লিচুর গাছ। কিন্তু এই গাছের বয়স কত কেউ বলতে পারেননি। তার মানে এই গাছটি এই গ্রামে সব থেকে পুরাতন একটি লিচু গাছ, অর্থাৎ ধারণা করা হচ্ছে এটি ২০০ বছরের পুরাতন লিচুর গাছ হতে পারে।’
সদর উপজেলার মাসিমপুর সরকার পাড়া গ্রামের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অব্দুল মালেক (৬৫) বাড়ির সামনে একটি বেদানা লিচুর গাছ দেখিয়ে বলেন, আমি যখন ছোট, তখন গাছটা অনেক বড় ছিল। গাছটা সম্ভবত আমার দাদা-দাদি অথবা তার বাবা-মা রোপণ করেছিলেন। এখন গাছটির মাথা ভেঙে গেছে এবং গাছটির শরীরে ঘায়ের মতো ক্ষত হয়েছে। গাছটিকে স্মৃতি হিসেবে রাখা হয়েছে। আমার মনে হয় এই গাছটির বয়স ১৫০ বছর বা তার অধিক হবে। এখন পর্যন্ত কেউ এই গাছটির সঠিক বয়স বলতে পারেনি। আমার বড় ভাই তিনিও এটির বয়স বলতে পারেননি।
আরও পড়ুন
লিচুর বাগানে বদলে গেছে পিরোজপুরের অর্থনীতি
লিচু নিয়ে গবেষণা করে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত তরুণ গবেষক মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, ‘দিনাজপুরের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য বা জিআই পণ্য হিসেবে এরই মধ্যে দিনাজপুরের বেদানা লিচু স্বীকৃতি অর্জন করেছে। দিনাজপুরিয়া হিসেবে আমরা গর্ববোধ করি। ইতিহাস এবং ঐতিহ্য থেকে যতটুকু জানা যায়, কয়েক শতাব্দী থেকে এই অঞ্চলের যে লিচুর ঐতিহ্য এবং এখানকার যে খ্যাতি সেটা মাশিমপুর নামক একটি গ্রাম এবং তৎসংলগ্ন এলাকা জুড়ে। সেখান থেকে এটি অনুমিত হয় যে, বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের যে জেলাগুলোতে লিচুর বিস্তার হয়েছে, তা মাশিমপুরকে কেন্দ্র করেই হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এখন আমরা লিচু চাষ করছি, প্রবীণ ব্যক্তির কাছেও আমরা শুনেছি যে গত কয়েক শতক বাবা, দাদা, বাবার দাদা এবং তাদের বাবারা এখানে লিচু চাষ করতেন। কিছু মৌখিক এবং প্রথাগত ইতিহাস এখানে জানা যায়। জনশ্রুতি রয়েছে মাশিমপুর গ্রামের আব্দুল হক নামের এক ব্যক্তি প্রথম বেদানা লিচু চাষ শুরু করেন। পরে একে একে ১১টি জাতের লিচু এসেছে।’
এই অঞ্চলটি জলবায়ুগতভাবে নাতিশীতোষ্ণ হওয়ার কারণে মাটিতে প্রাকৃতিকভাবে মাইক্রোবিয়াল উপস্থিতি লিচু উৎপাদনের জন্য একটি ভালো সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। ফলশ্রুতিতে এখানে যে বেদানা লিচুটি হচ্ছে, এটি আর বাংলাদেশের কোথাও উৎপাদন হওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেনি। ফলে এখানকার মিষ্টতা, দানা এবং ভৌগোলিক পণ্য হিসেবে এটি খ্যাতি অর্জন করছে।
আরও পড়ুন
বোম্বাই লিচুতে বাজার মাত, রাজশাহীতে ৫৬ কোটি টাকার বাণিজ্যের আশা
এ সময় একটি বিশাল আকৃতির লিচু গাছ দেখিয়ে বলেন, জন্মের পর থেকেই এই বেদানা লিচুর গাছটির নাম শুনে আসছি- জোড়া বুড়া লিচুর গাছ। কিন্তু এই গাছের বয়স কত কেউ বলতে পারেননি। তার মানে এই গাছটি এই গ্রামে সব থেকে পুরাতন একটি লিচু গাছ, অর্থাৎ ধারণা করা হচ্ছে এটি ২০০ বছরের পুরাতন লিচুর গাছ হতে পারে।
মাশিমপুর গ্রামের সবচেয়ে প্রবীণ ব্যক্তি ইউসুফ আলী (৯০) বলেন, ‘একটা সময় লিচুর লোভে অনেকে মাশিমপুর গ্রামে বিয়ে করতে চাইতেন। মেয়ে দেখতে এলে বাড়িতে লিচুর গাছ আছে কি না তাও দেখতেন। আমরা আমাদের বাবা-দাদাদের কাছে শুনেছি ব্রিটিশ আমলের শুরুতে জনৈক আব্দুল হক প্রথম বেদানা লিচুর চারা ভারত থেকে এনে রোপণ করেছিলেন। তার হাত ধরেই মাশিমপুরে লিচুর চাষ শুরু হয়। পরে ব্রিটিশ শাসক, বিভিন্ন রাজা ও জমিদাররা শৌখিন ফল হিসেবে লিচু চাষ করতেন। এই গ্রাম থেকেই সারাদেশে লিচু চাষের খবর ছড়িয়ে পড়ে।’
তবে লিচু চাষের ইতিহাস সুনির্দিষ্টভাবে কেউ জানাতে পারেননি। দিনাজপুরে লিচুর উন্নত জাত, লিচু সংরক্ষণ, আবহাওয়া সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনে সুনির্দিষ্ট কোনো গবেষণা নেই।
এফএ/জেআইএম








