মাদক একটি সামাজিক ব্যাধি। যে পরিবারে মাদকাসক্ত থাকে, সেই পরিবার বুঝে মাদকের ভয়াল যন্ত্রণার প্রকোপ। মাদকের আগ্রাসন বেড়েই চলছে। যেখান থেকে মাদক আসে, সেখানে অভিযান চালাতে হবে। তরুণসহ যুবসমাজকে বাঁচাতে হলে মাদককে ‘না’ বলতে হবে। সবাইকে সচেতন হতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি মাদক প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই মাদক নির্মূল সম্ভব হবে।

আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস উপলক্ষে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে বক্তারা এ কথা বলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া বন্ধুসভার সহযোগিতায় গত ২৬ জুন বিকেলে জেলা প্রেসক্লাবের সামনে এই কর্মসূচির আয়োজন করে প্রথম আলো ট্রাস্ট। এতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বন্ধুসভার সদস্যরাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা অংশ নেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক বাহারুল ইসলাম মোল্লা বলেন, সম্প্রতি জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা খুব কষ্ট নিয়ে বললেন যে মাদকের বড় চালানসহ দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হলেও অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তাঁরা জামিনে ছাড়া পেয়ে যান। এসব তৎপরতা বন্ধ না হলে মাদক ব্যবসায়ীরা আরও উৎসাহিত হবেন। জেলায় বিভিন্ন সরকারি–বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চুরি বেড়েছে। নির্মাণাধীন ভবনের জন্য কেনা রড বেঁধেও রাখা যায় না, চুরি হয়ে যায়। মাদকাসক্ত ব্যক্তিরাই এসব চুরির সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস উপলক্ষে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মানববন্ধন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (অ্যাডিশনাল পিপি) আব্দুর রহিম বলেন, তরুণ প্রজন্ম ও যুবসমাজ ধীরে ধীরে মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে। সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে তাদের রক্ষা করতে হবে। তাই সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, খোঁজ রাখতে হবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. আল আমিন বলেন, মাদক একটি ব্যাধি। এই ব্যাধি ক্যানসারের মতো সমাজকে আক্রান্ত করছে। মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একসঙ্গে এর বিরুদ্ধে মোকাবিলা করতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে বাঁচাতে হবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইউনাইটেড কলেজের উদ্যোক্তা ও পরিচালক হারুন অর রশিদ বলেন, ‘তিনটা জায়গায় আমাদের কাজ করতে হবে। এক, মাদকের সরবরাহ। সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় মাদক সহজলভ্য হয়ে গেছে। প্রতিটি পাড়া ও মহল্লায় যেখানে মাদকের সহজলভ্যতা রয়েছে, সেখানে কঠোর নজরদারি ও অভিযান চালাতে হবে। দুই, সরবরাহকারী। যারা সরবরাহ করে, তাদের সামাজিকভাবে বর্জন করতে হবে এবং আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তিন, সবাইকে সচেতন হয়ে একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। তাহলেই মাদক প্রতিরোধ সম্ভব, তা না হলে পরবর্তী প্রজন্মকে মাদকের ভয়াল থাবার হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না।’

নদী ও প্রকৃতি সুরক্ষার সংগঠন তরী বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক শামীম আহমেদ বলেন, ‘পুলিশের পেছনে পুলিশ ও গোয়েন্দাদের পেছনে গোয়েন্দা থাকতে হবে। তাহলেই মাদক নির্মূল সম্ভব। আমরা যদি মনে করি, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সবাই ভালো হয়ে গেছে, তাহলে সেটি হবে ভুল। আমাদের দাবি থাকবে, পুলিশ যেন মাদকের বিরুদ্ধে আরও বেশি সোচ্চার ও সতর্ক থাকে।’

জেলা রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও সংস্কৃতিকর্মী হৃদয় কামাল বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিনটি উপজেলা—কসবা, আখাউড়া ও বিজয়নগর ভারত সীমান্তঘেঁষা। সীমান্তে বিজিবিসহ পুলিশ, র‍্যাব ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। তারপরও মাদক আসা বন্ধ নেই। যেখান থেকে মাদক আসে, সেখানে অভিযান চালাতে হবে। মাদকের সঙ্গে জড়িত বড় বড় মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকের প্রধান হোতাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

খেলাঘর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাধারণ সম্পাদক নেহার রঞ্জন সরকার বলেন, মাদক কারবারি ও মাদক সেবনকারীদের শাস্তির বিষয় নিয়ে নতুন করে ভাবনার সময় এসেছে। এমন শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে যে একবার গ্রেপ্তার হলে আর মাদকের ব্যবসা শুরুর চিন্তা না করতে পারে।

আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস উপলক্ষে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মানববন্ধন।

ঐক্যবদ্ধ সদর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আহ্বায়ক শেখ আরিফ বিল্লাহ বলেন, পুলিশকে আরও কঠোর হতে হবে এবং কঠোর হস্তে মাদককে দমন করতে হবে।

প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক শাহাদৎ হোসেনের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে আরও বক্তব্য দেন তরী বাংলাদেশের সদস্য সোহেল রানা ভূঁইয়া, শিক্ষার্থী শারমিনুল ইসলাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া বন্ধুসভার সভাপতি শাহজাহান মিয়া, সহসাংগঠনিক সম্পাদক আল মামুন শুভ প্রমুখ। সংহতি প্রকাশ করে মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন অশোকা ফেলো ডা. মাতিন আহমেদ।

মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীদের হাতে ‘মাদকাসক্ত হলে বিয়ে দেওয়া হয়, বিয়ে কোনো চিকিৎসা নয়’, ‘মাদকাসক্তির সঙ্গে মানসিক রোগের একটা সম্পর্ক রয়েছে’, ‘মাদক গ্রহণে দৈহিক ও মানসিক ক্ষতি হয়’, ‘মাদকের সবটাই অপকার, কোনো উপকারী দিক নাই’, ‘স্মার্ট তরুণেরা কখনো মাদক নেয় না’, ‘মাদককে না বলুন, সুন্দর জীবন গড়ুন’, ‘মাদকমুক্ত সমাজ, সুস্থ জীবনের স্বপ্ন’, ‘নেশা ছাড়ো, দেশ গড়ো’, ‘মাদক এক মরণফাঁদ: মাদক থেকে দূরে রাখুন’, ‘মাদক কোনো সমাধান নয়, এটি কেবলই ধ্বংস ডেকে আনে’, ‘আপনার সন্তানকে সময় দিন, মাদক থেকে দূরে রাখুন’, ‘মাদক কোনো ফ্যাশন নয়, এটি জীবনের বড় পরাজয় ও একটি রোগ’সহ নানা স্লোগান–সংবলিত প্ল্যাকার্ড ছিল।

সহসাংগঠনিক সম্পাদক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া বন্ধুসভা