৪ জুলাই। সরকারি ছুটির দিন। আজ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দিবস ফোর্থ অব জুলাই। দেশজুড়ে উৎসবের আমেজ। কোথাও পতাকার রঙে সাজানো বাড়িঘর, কোথাও পরিবার পরিজনের মিলনমেলা, আবার কোথাও স্বাধীনতা উদ্যাপনের নানা আয়োজন। এমন এক উৎসবমুখর সকালেই শুরু হলো আমাদের নায়াগ্রা ফলস স্টেট পার্ক ভ্রমণ। গত রাতেই আমাদের পরিকল্পনা ছিল ঠিক সকাল নয়টায় এয়ারবিএনবি থেকে রওয়ানা হওয়ার। কিন্তু আগের দিনের দীর্ঘ ভ্রমণ শরীরে বেশ ক্লান্তি এনে দিয়েছিল। তাই ঘুম ভাঙতে, সবাইকে প্রস্তুত হতে এবং নাস্তা শেষ করতে করতে নির্ধারিত সময় অনেকটাই পেরিয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত বেলা প্রায় এগারোটায় আমরা নায়াগ্রা ফলস স্টেট পার্কের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলাম। গাড়ি যত নায়াগ্রার দিকে এগোচ্ছিল, সবার মধ্যেই উত্তেজনা তত বাড়ছিল। বহুদিন ধরে বইয়ের পাতায়, টেলিভিশনের পর্দায় কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে জলপ্রপাতের ছবি দেখে বিস্মিত হয়েছি, আজ সেটিকে নিজের চোখে দেখার অপেক্ষা যেন আর শেষ হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল, বহুদিনের একটি স্বপ্ন ধীরে ধীরে বাস্তবের রূপ নিতে চলেছে, আর সেই স্বপ্নকে ছুঁয়ে দেখার আনন্দে পথের প্রতিটি মুহূর্তই হয়ে উঠছিল আরও বেশি রোমাঞ্চকর।
স্টেট পার্কে পৌঁছে প্রথমেই ভিজিটর পার্কিংয়ে গাড়ি রেখে আমরা হাঁটতে শুরু করলাম বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় আকর্ষণ মেইড অব দ্য মিস্টের দিকে। কয়েকদিন আগেই অনলাইনে টিকিট কেটে রাখা হয়েছিল। জনপ্রতি টিকিটের মূল্য ছিল ৩২ মার্কিন ডলার। মনে হয়েছিল, অনলাইনে টিকিট কেটে রেখেছি বলে হয়তো সরাসরি প্রবেশ করা যাবে। কিন্তু বাস্তবে গিয়ে দেখা গেল, অনলাইন টিকিট থাকলেও নির্দিষ্ট কাউন্টার থেকে আবার টিকিট সংগ্রহ করতে হয়। সেখানে ছিল দীর্ঘ অপেক্ষার লাইন। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা হাজারো পর্যটকের মুখে একই রকম উৎসাহ, কৌতূহল আর আনন্দের ঝিলিক। অবশেষে টিকিট সংগ্রহের পর আমাদের হাতে তুলে দেওয়া হলো নীল রঙের বিশেষ পলিথিনের রেইন পঞ্চো। সবাই সেটি পরে নিলাম। তখনো বুঝিনি, কয়েক মিনিট পর এই সাধারণ পোশাকটিই আমাদের সম্পূর্ণ ভিজে যাওয়া থেকে বাঁচাবে। এরপর শুরু হলো নিচে নামার পালা। বিশাল লিফটে চেপে আমরা প্রায় ২৪ তলা ভবনের সমান গভীরে নদীর তীরে নেমে এলাম। লিফটের দরজা খুলতেই কানে ভেসে এলো প্রচণ্ড জলধ্বনি। বাতাসে ভেসে আসছিল পানির কণা। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি যেন দূর থেকেই নিজের শক্তির পরিচয় দিতে শুরু করেছে।

নদীর ঘাটে নোঙর করা বিশাল দ্বিতল বোটে উঠে আমরা নির্ধারিত স্থানে দাঁড়ালাম। ইচ্ছে ছিল ওপরের খোলা ডেকে দাঁড়িয়ে নায়াগ্রাকে আরও কাছ থেকে উপভোগ করার। কিন্তু কর্তব্যরত স্বেচ্ছাসেবক জানালেন, ওপরের ডেক ইতোমধ্যেই পূর্ণ হয়ে গেছে, তাই নিরাপত্তার কারণে আর কাউকে সেখানে ওঠার অনুমতি দেওয়া যাবে না। মুহূর্তের জন্য খানিকটা আক্ষেপ হলেও বুঝলাম, কয়েক মুহূর্ত পর যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে যাচ্ছি, তার কাছে এই আক্ষেপের কোনো মূল্য নেই। ধীরে ধীরে বোটটি যাত্রা শুরু করল। প্রথমে নদী ছিল শান্ত, কিন্তু সামনে এগোতেই জলরাশির গর্জন ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠল। চোখের সামনে উন্মোচিত হলো পৃথিবীর অন্যতম বিস্ময়কর দৃশ্য। তখন মনে হলো, নায়াগ্রাকে শুধু দেখা যায় না, তাকে অনুভব করতে হয় সমগ্র অস্তিত্ব দিয়ে। হাজার হাজার টন পানি খাড়া পাথরের বুক চিরে নিচে আছড়ে পড়ছে। চারদিকে উড়ে বেড়াচ্ছে কুয়াশার মতো জলকণা। বাতাসের তীব্রতা আর জলপ্রপাতের গর্জনে পাশের মানুষের কথাও শোনা যাচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি যেন তার সমস্ত শক্তি ও সৌন্দর্য একসঙ্গে প্রকাশ করছে। বোট যত হর্সশু ফলসের কাছে পৌঁছাতে লাগল, ততই রোমাঞ্চ বাড়তে থাকল। বাতাসে ভেসে আসা জলরাশি একের পর এক গায়ে আছড়ে পড়ছিল। নীল পঞ্চো শরীরের কিছুটা অংশ রক্ষা করলেও মুখ, হাত ও চুল মুহূর্তেই ভিজে গেল। অথচ সেই ভিজে যাওয়ার মধ্যেই ছিল এক অপার্থিব আনন্দ। মনে হচ্ছিল, নায়াগ্রা তার শীতল জলস্পর্শে প্রতিটি দর্শনার্থীকে আপন করে নিচ্ছে, আর সেই স্পর্শেই লুকিয়ে আছে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক অবিস্মরণীয় মিলন।
আরও পড়ুন
নায়াগ্রার পথে বত্রিশ বছর আগের স্নেহের উপাখ্যান
তবে এই অসাধারণ অভিজ্ঞতার মাঝেই আমাদের ছোট্ট দিদিভাই বাঁশরীর জন্য মুহূর্তটি একেবারেই অন্য রকম হয়ে উঠল। প্রচণ্ড গর্জন, বাতাসের তীব্র চাপ আর উড়ে আসা জলকণায় সে হঠাৎ ভয় পেয়ে কাঁদতে শুরু করল। ছোট্ট দুটি হাত শক্ত করে আমাদের আঁকড়ে ধরল। তার চোখেমুখে তখন স্পষ্ট আতঙ্ক। আমরা সবাই মিলে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করলাম। সাধারণত ওর বাবা খুব সহজেই তাকে হাসাতে পারে, কিন্তু সেদিন প্রকৃতির গর্জনের সামনে সেই পরিচিত কৌশলও যেন কাজ করছিল না। কখনো তিনি তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন, কখনো দূরের পাখি দেখালেন, কখনো বললেন, ‘দেখো, জলপরিরা তোমাকে হাত নাড়ছে’, আবার কখনো মজা করে বললেন, ‘নায়াগ্রা তোমাকে স্বাগত জানিয়ে হাততালি দিচ্ছে।’ আমরাও গল্প, হাসি আর নানা কথায় তার মন অন্যদিকে ফেরানোর চেষ্টা করতে লাগলাম। একসময় কান্নার ফাঁকে চারপাশে তাকিয়ে নীল পলিথিনে মোড়ানো শত শত মানুষকে দেখে সে নিজেও একটু অবাক হয়ে গেল। মুহূর্তেই তার ঠোঁটে ফুটে উঠল এক চিলতে হাসি, আর তাতেই আমরা সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। বোটটি নিরাপদ দূরত্বে ফিরতে শুরু করলে তার ভয়ও কেটে গেল। সে কৌতূহলী চোখে চারপাশের জলরাশি দেখতে লাগল। সেই মুহূর্তে আবারও উপলব্ধি করলাম, ক্ষণিকের ভয়ের মাঝেও পরিবারের ভালোবাসা, স্নেহ আর একসঙ্গে থাকার আশ্বাসই মানুষের সবচেয়ে বড় সাহস এবং সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।

প্রায় বিশ মিনিটের বোট ভ্রমণ শেষে লিফটে করে ওপরে উঠে এলাম। মনে হচ্ছিল, কয়েক মুহূর্তেই এক বিস্ময় জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে এলাম। এরপর শুরু হলো নায়াগ্রা ফলস স্টেট পার্ক ঘুরে দেখার পালা। প্রথমেই গেলাম লুনা আইল্যান্ডে, যেখানে পাশাপাশি দেখা যায় আমেরিকান ফলস এবং ব্রাইডাল ভেইল ফলস। দুটি জলপ্রপাত যেন দুটি ভিন্ন স্বভাবের শিল্পকর্ম, একটি শক্তির প্রতীক, অন্যটি কোমল সৌন্দর্যের প্রকাশ। পাথরে আছড়ে পড়া জলধারা, সূর্যের আলোয় রংধনু আর সবুজ প্রকৃতি মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল অপার্থিব দৃশ্য। লুনা আইল্যান্ডের ইতিহাসও বিশেষ। উনিশ শতকের মাঝামাঝি পূর্ণিমার রাতে নায়াগ্রার রূপ দেখে মুগ্ধ হয়ে পর্যটকরা এর নাম দেন লুনা, অর্থাৎ চাঁদ। এই ছোট দ্বীপটিই আজ নায়াগ্রার অন্যতম শ্রেষ্ঠ দর্শনস্থল। এর এক পাশে আমেরিকান ফলস, অন্য পাশে ব্রাইডাল ভেইল ফলস, মাঝখানে সরু শিলাখণ্ডই লুনা আইল্যান্ড। এই অবস্থানের কারণেই একই সঙ্গে দুটি জলপ্রপাতকে এত কাছ থেকে দেখা যায়।
আরও পড়ুন
শিকাগোর বুকে দর্শন ও বিশ্বাসের অনুপম মিলনক্ষেত্র
আমেরিকান ফলসের ইতিহাসও হাজার বছরের। প্রায় বারো হাজার বছর আগে বরফ যুগ শেষে হিমবাহ গলে গ্রেট লেকস ও নায়াগ্রা নদীর সৃষ্টি হয়। কোটি কোটি ঘনফুট পানি চুনাপাথর ক্ষয় করতে করতে গড়ে তোলে আজকের জলপ্রপাত। ধীর ক্ষয়প্রক্রিয়ায় এটি আজও উজানের দিকে সরে যাচ্ছে, আর নিচের বিশাল শিলাখণ্ডগুলো তার দীর্ঘ ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে। এর পাশে ব্রাইডাল ভেইল ফলস, আকারে ছোট হলেও সৌন্দর্যে অনন্য। ওপর থেকে নেমে আসা জলধারা দূর থেকে নববধূর ওড়নার মতো দেখায়, তাই এর নাম ব্রাইডাল ভেইল। সামনে দাঁড়ালে জলকণা মুখে ছুঁয়ে যায়, সূর্যের আলোয় রংধনু ফুটে ওঠে, আর চারপাশ রূপ নেয় স্বপ্নময় দৃশ্যে। সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, আমরা শুধু জলপ্রপাত দেখছি না, বরং প্রকৃতির শক্তি, সৌন্দর্য এবং হাজার বছরের ইতিহাসের এক জীবন্ত মহাকাব্যের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। নীরবে সেই মহিমা উপভোগ করলাম, ছবি তুললাম, আবার কিছুক্ষণ শুধু দেখলাম, কারণ এমন দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা গেলেও তার আসল সৌন্দর্য অনুভব করা যায় কেবল উপস্থিতির মধ্যেই।

দীর্ঘ হাঁটাহাঁটির পর কাছের একটি কেএফসিতে দুপুরের খাবার সারলাম। ক্লান্ত শরীরে সাধারণ খাবারও তখন অসাধারণ সুস্বাদু মনে হচ্ছিল। দিনের শেষ আলো ফুরিয়ে এলে রাত প্রায় নয়টার দিকে আমরা আবার বাফেলো শহরের এয়ারবিএনবিতে ফিরে এলাম। শরীর তখন ক্লান্ত, কিন্তু মন ছিল গভীর তৃপ্তিতে পরিপূর্ণ। বারবার মনে ভেসে উঠছিল মেইড অব দ্য মিস্টের জলকণা, নায়াগ্রার গর্জন, ছোট্ট বাঁশরীর ভয় আর পরে ফিরে পাওয়া নির্মল হাসি, লুনা আইল্যান্ডের রংধনু এবং পরিবারের সঙ্গে কাটানো অমূল্য মুহূর্তগুলো। ভ্রমণ শুধু নতুন কোনো স্থান দেখায় না, মানুষের অনুভূতিকেও নতুন করে জাগিয়ে তোলে। নায়াগ্রা আমাদের কাছে ছিল শুধু একটি জলপ্রপাত নয়, প্রকৃতির মহিমা, পারিবারিক ভালোবাসা এবং একসঙ্গে কাটানো সময়ের অনন্য সৌন্দর্যের এক জীবন্ত স্মারক। সময়ের সঙ্গে হয়তো অনেক ঘটনার খুঁটিনাটি মুছে যাবে, কিন্তু নায়াগ্রার গর্জনের মাঝে একে অপরের হাত শক্ত করে ধরে থাকার সেই মুহূর্তগুলো আজীবন হৃদয়ের পাতায় অমলিন হয়ে থাকবে। কারণ নায়াগ্রা শুধু চোখে দেখা একটি জলপ্রপাত নয়, এটি এমন এক অনুভূতির নাম; যা একবার হৃদয়ে স্থান করে নিলে তার গর্জন বহু বছর পরও স্মৃতির গভীরে নীরবে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।
আরও পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাটারাক্ট ফলসে স্মৃতিময় একদিন
আটলান্টা থেকে ওয়েস্ট লাফায়েত: পথে পথে জীবনের গল্প
এসইউ








