যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যেই আজ সোমবার তেহরানে অবতরণ করেছে রাশিয়ার একটি বিশেষ সামরিক বিমান। বৈশ্বিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ‘ফ্লাইটরাডার২৪’-এর তথ্য অনুযায়ী, রুশ স্কোয়াড্রনের বিশেষ ‘টুপোলেভ তু-২১৪পিইউ’ মডেলের এই বিমানটি আজ সকালে মস্কো থেকে উড্ডয়ন করে সরাসরি তেহরানের ইমাম খোমেনী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়।

ডুমসডে প্লেন বা কেয়ামতের বিমান নামে পরিচিত এই অত্যাধুনিক ও সুরক্ষিত বিমানটি মূলত পারমাণবিক যুদ্ধ বা জাতীয় বিপর্যয়ের সময় আকাশ থেকে সরকার পরিচালনার একটি ‘ভ্রাম্যমাণ কমান্ড সেন্টার’ হিসেবে কাজ করে। তবে হঠাৎ এই বিমানের তেহরান আগমন বিশ্বজুড়ে ব্যাপক কৌতূহল ও ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

এই বিমানে এমন সব স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী ডেটা লিংক যুক্ত রয়েছে, যা যেকোনো আধুনিক ইলেকট্রনিক বা জ্যামিং প্রযুক্তির মধ্যেও সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকে। এমনকি ভূমির যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেলেও এই বিমান থেকে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের কমান্ড পরিচালনা করা সম্ভব।

সম্প্রতি মার্কিন বাহিনী কর্তৃক ইরানের সামরিক ও বিমান প্রতিরক্ষা ঘাঁটিগুলোতে সিরিজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর পরপরই মস্কো তাদের এই বিশেষ বিমানটি তেহরানে পাঠাল। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ক্রেমলিন তার মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র ইরানকে সরাসরি কূটনৈতিক সংহতি ও সংকটের মুহূর্তে জরুরি যোগাযোগ সহায়তার বার্তা দিচ্ছে বলেই মনে করা হচ্ছে।

রাশিয়া ও ইরানের সরকারি সূত্রগুলো এই মিশনের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য বা বিমানের ভেতরে থাকা প্রতিনিধি দলের পরিচয় প্রকাশ করেনি। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আজ সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে, রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের আসন্ন তেহরান সফরের প্রস্তুতি এবং দুই দেশের মধ্যকার কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তির অধীনে উদ্ভূত নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার অংশ হিসেবে এই বিশেষ ফ্লাইটটি পরিচালনা করা হয়েছে।

এর আগেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংকট এবং উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সময় এই বিশেষ বিমানটিকে ব্যবহার করতে দেখা গেছে। গত জুনে রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মিখাইল মিশুস্টিনের উজবেকিস্তান সফরের সময় এই বিমানটি তাসখন্দে অবতরণ করেছিল। তারও আগে গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী ইরানে যৌথ বিমান হামলা চালানোর ঠিক কয়েক দিন আগে, রুশ জ্বালানি মন্ত্রী সের্গেই সিভিলিওভের সফরকে সহায়তা দিতে এই তু-২১৪পিইউ বিমানটি টানা দুই দিন তেহরানে অবস্থান করেছিল। গত বছর পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দ্বিপক্ষীয় জ্বালানি সংক্রান্ত বৈঠকের সময়ও এই বিমানটির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি ভেঙে পড়ার পর, রাশিয়ার এই ফ্লাইং কমান্ড সেন্টারের আগমন ওয়াশিংটন এবং ইসরায়েলের সামরিক পরিকল্পনাবিদদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বিমান মোতায়েন এটাই প্রমাণ করে যে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপের মুখেও তেহরান রাশিয়ার মতো পরাশক্তির কাছ থেকে শক্তিশালী প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত ব্যাকআপ পাচ্ছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।