কোনো স্থানে প্রধানমন্ত্রীর সফর মানেই তো স্থবির জনজীবন। বিশাল এলাকাজুড়ে বন্ধ যানবাহন চলাচল। দুদিন আগে থেকে শুরু হয় চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি। যেসব পথ দিয়ে তিনি যাবেন, সেখানে থাকবে তিন স্তরের নিরাপত্তা। আর সেই সঙ্গে জনসাধারণের জন্য থাকবে পুলিশের লাঠিপেটা আর ব্যাপক হয়রানি। কিন্তু বরিশালে এবার এসবের কিছুই হয়নি। অথচ যিনি এসেছিলেন তিনিও প্রধানমন্ত্রী। তবে তিনি তারেক রহমান। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে যাকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সরকার গঠনের ক্ষমতা দিয়েছে দেশের জনগণ। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সোমবার তিনি প্রথমবারের মতো বরিশালে আসেন। তার এ সফর ছিল একেবারে অন্যরকম। যেন নতুনরূপে তিনি জনসাধারণের মাঝে এসেছেন-যা আগে কেউ ভাবতেই পারতেন না। তাইতো তার প্রশংসায় এখন পঞ্চমুখ এখানকার জনসাধারণ। দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী প্রধানমন্ত্রী যে এভাবেও একবারে সাধারণ মানুষের মতো সবার মাঝে আসতে পারেন-সেটাই এখন নগরবাসীর কাছে বড় বিস্ময়।
ব্রাউন কম্পাউন্ড এলাকার ব্যবসায়ী বাবুল হোসেন বলেন, ‘আমার বাসার খুব কাছেই সার্কিট হাউজ। দুপুরে এখানেই খেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। খানিক সময় বিশ্রামও নিয়েছেন। কিন্তু কিছুই টের পাইনি। আগে প্রধানমন্ত্রীরা সার্কিট হাউজে এলে তো পুরো এলাকায় যান চলাচল বন্ধ থাকত। জরুরি প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়াও কঠিন হয়ে যেত। কিন্তু এবার কোনো অসুবিধাই হয়নি। তিনি (প্রধানমন্ত্রী) ভেতরে থাকা অবস্থায় কয়েকবার চক্কর কেটেছি সার্কিট হাউজের আশপাশে। কেউ কোনো বাধাও দেয়নি। যানবাহন চলাচলও ছিল স্বাভাবিক। বিষয়টি খুবই অবাক ও ভালো লেগেছে।’
নথুল্লাবাদের সুমন রহমান বলেন, ‘একজন প্রধানমন্ত্রী সফরসঙ্গীদের নিয়ে ঢাকা থেকে বাসে বরিশাল এসেছেন। এর চেয়ে বড় ঘটনা আর কী হতে পারে? এর আগে প্রধানমন্ত্রীরা তো আসতেন হেলিকপ্টারে বা গাড়ির বিশাল বহর নিয়ে সড়ক মহাসড়ক বন্ধ করে। এর আগেও শুনেছি, পত্রিকায় দেখেছি যে, তিনি বাসে করে বিভিন্ন জায়গায় যান। এবার নিজের চোখে দেখলাম। আগে প্রধানমন্ত্রীরা এলে রাস্তা ফাঁকা রাখা হতো। এবার দেখলাম হাজার হাজার মানুষের ভিড় ঠেলে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বাস এগোচ্ছে।’
গৌরনদীর বাসিন্দা আসাদুজ্জামান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সকাল সাড়ে ১০টায় বাটাজোড়ে পৌঁছানোর কথা ছিল। তিনি সেখানে পৌঁছে যান সকাল ১০টায়। তাহলে ভাবুন গুলশান থেকে তিনি কত ভোরে রওয়ানা হয়েছেন। আমরা ভেবেছিলাম তার আসতে আসতে ১২/১টা বেজে যাবে। আগের প্রধানমন্ত্রীদের ক্ষেত্রে যেমনটা হতো।’
নগরীর কলেজ অ্যাভিনিউয়ের গৃহবধূ রওশন আরা বেগম বলেন, ‘আগে দেখেছি প্রধানমন্ত্রীদের আসা মানেই কান ফাটানো মাইকিং। ৭-৮ দিন আগে থেকে শুরু হতো শব্দদূষণের সেই অত্যাচার। সেই সঙ্গে চলত তোরণ নির্মাণ আর পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুনের ছড়াছড়ি। প্রধানমন্ত্রীর সফরের চেয়ে দলের চ্যালা চামুন্ডাদের প্রচারই চলত বেশি। এবার দেখলাম সেসবের কিছুই নেই। এটা সত্যিই নতুন কিছু। তারেক রহমানের এই বিষয়টি আমার ভীষণ ভালো লেগেছে।’ বটতলার থ্রি হুইলার চালক হারুন ব্যাপারি বলেন, ‘আগে প্রধানমন্ত্রী এলে নানা দুর্ভোগে পড়তাম। অনেক রাস্তায় গাড়ি নিয়ে যেতে পারতাম না। যাত্রী বহন করতে না পারায় আয়ও কম হতো। কিন্তু এবার তেমন কোনো সমস্যাই হয়নি। দুপুরে তো মেডিকেল কলেজ এলাকায় আমার থ্রি হুইলারের সামনে দিয়ে গেল প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর। থামানো তো দূর, কেউ আমায় জিজ্ঞেসও করেনি।’
সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের বরিশাল বিভাগীয় সদস্য সচিব ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে তারেক রহমানের এসব কর্মকাণ্ডে অভিভূত হচ্ছি। এ যেন চমকের পর চমক। প্রধানমন্ত্রী এলেন, নানা কর্মসূচিতে যোগ দিলেন, অথচ কোনো ঝামেলা হলো না স্বাভাবিক জীবনযাত্রায়। মহাসড়ক ধরে তাকে বহনকারী বাসের পাশাপাশি চলেছে সাধারণ মানুষের যানবাহন। তিনি গাড়ি থামিয়ে শিশুদের সঙ্গে সেলফি তুলেছেন। ভাবা যায়! প্রধানমন্ত্রীর এসব আচরণের কথা এতদিন খবরের কাগজে পড়েছি-টিভিতে দেখেছি। এবার চাক্ষুষ সাক্ষী হলাম। বরিশালের মানুষ দেখল যে, এভাবেও একজন প্রধানমন্ত্রী চলাচল করতে পারেন। আশা করি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে এই ধারা অব্যাহত থাকবে। এতে সাধারণ মানুষের সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের যে দূরত্ব বহুবছর ধরে আমরা দেখে এসেছি, তা দিন দিন কমবে।’








