গাড়ির পেছনের সিটে বসা মেয়েটি হঠাৎ একটা সাধারণ অঙ্ক করতে দিল—৭২ × ৭২ = কত? অঙ্কটা খুব কঠিন কিছু নয়, সাধারণ অবস্থায় হয়তো চোখের পলকেই উত্তর দিয়ে দিতাম। কিন্তু সেদিন হয়তো সারা দিনের ক্লান্তি ছিল, অথবা গাড়ি পার্ক করার দিকে মনোযোগ ছিল। সব মিলিয়ে আমার মস্তিষ্ক যেন হঠাৎ কাজ করা বন্ধ করে দিল! সাময়িকভাবে আমি একেবারে আটকে গেলাম।

সাম্প্রতিক সময়ে আমার প্রায়ই মনে হচ্ছে, আমার মস্তিষ্ক আগের মতো চনমনে নেই। শুধু যে অঙ্কের বেলায় এমন হচ্ছে তা নয়, বরং একটা সাধারণ অলসতা যেন ভর করেছে। বিষয়টা আমাকে বেশ ভাবায়। কারণ আমি মস্তিষ্ক নিয়ে লেখালেখি করি, ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করি, ব্যায়াম করি, এমনকি মস্তিষ্ক সচল রাখতে ট্রাম্পেটও বাজাই।

আমাদের ওজন বাড়লে আমরা টের পাই, রক্তচাপ মাপার যন্ত্র দিয়ে প্রেশারও মাপা যায়। কিন্তু পুরু মাথার খুলির আড়ালে থাকা মস্তিষ্কটা কেমন আছে, তা বোঝার তো কোনো সহজ উপায় নেই! তবে আশার কথা হলো, সময় এখন বদলাচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের ল্যাংকাস্টার ইউনিভার্সিটির নিউরোলজিস্ট হেডলি এমসলি মনে করেন, শারীরিক স্বাস্থ্যের মতো আমরা এখন মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য নিয়েও অনেক বেশি সচেতন হচ্ছি। এখন আর আমরা রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার জন্য বসে থাকতে চাই না, বরং আগে থেকেই মস্তিষ্ক ভালো রাখার উপায় খুঁজছি।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতির ফলে এখন এমন সব দারুণ মাধ্যম তৈরি হচ্ছে, যা দিয়ে আমাদের মাথার ভেতরে কী চলছে বা বয়সের তুলনায় মস্তিষ্ক কতটা সুস্থ আছে, তা জানা সম্ভব। আমি নিজেও ঠিক করেছিলাম, এই আধুনিক পদ্ধতিগুলোর কোনটিতে কাজ হয়, তা পরীক্ষা করে দেখব।

মস্তিষ্ক মাঝেমধ্যে হঠাৎ ফাঁকা হয়ে যায় কেন
যুক্তরাজ্যের ল্যাংকাস্টার ইউনিভার্সিটির নিউরোলজিস্ট হেডলি এমসলি মনে করেন, শারীরিক স্বাস্থ্যের মতো আমরা এখন মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য নিয়েও অনেক বেশি সচেতন হচ্ছি।

জিন পরীক্ষা এবং ব্রেইন স্ক্যান

মস্তিষ্কের বর্তমান অবস্থা বুঝতে আমি শুরুতে আমার পুরোনো একটি জিনগত পরীক্ষার রিপোর্টের দিকে তাকালাম। এক দশক আগে করা ওই রিপোর্টে দেখেছিলাম, আমার শরীরে 'APOE4' জিনের একটি ভ্যারিয়েন্ট আছে, যা সাধারণ মানুষের তুলনায় অ্যালঝেইমার্স রোগের ঝুঁকি তিন থেকে চার গুণ বাড়িয়ে দেয়।

কিন্তু চিকিৎসকরা বলছেন, শুধু জিনে থাকলেই যে আপনার অ্যালঝেইমার্স হবে, এমন কোনো কথা নেই। আপনার জীবনযাপন পদ্ধতি এখানে অনেক বড় ভূমিকা রাখে। তাই যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের অ্যালঝেইমার্স সংস্থাগুলো সাধারণ মানুষকে এই ধরনের জিন পরীক্ষা করতে খুব একটা উৎসাহ দেয় না।

এরপর ভাবলাম, একটা এমআরআই স্ক্যান করে ফেললে কেমন হয়? এটি মস্তিষ্কের যেকোনো টিউমার, রক্তক্ষরণ বা বয়সজনিত পরিবর্তন খুব সহজেই ধরতে পারে। কিন্তু ম্যানচেস্টারের একজন স্ট্রোক ফিজিশিয়ান আমাকে সতর্ক করলেন। তিনি জানালেন, প্রায় ৪ শতাংশ ক্ষেত্রে ব্রেইন স্ক্যানে এমন কিছু ছোটখাটো রক্তনালির অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ে, যা হয়তো মানুষের কোনো ক্ষতিই করবে না। কিন্তু এসব দেখে মানুষ অহেতুক দুশ্চিন্তায় ভোগে এবং আরও দামি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পেছনে টাকা নষ্ট করে। তাই কোনো উপসর্গ না থাকলে রুটিন ব্রেইন স্ক্যান করার কোনো মানেই হয় না।

মাত্র ১৯ বছরেই অ্যালঝেইমার্স, চিকিৎসাবিজ্ঞানের বড় বিস্ময়
চিকিৎসকরা বলছেন, শুধু জিনে থাকলেই যে আপনার অ্যালঝেইমার্স হবে, এমন কোনো কথা নেই। আপনার জীবনযাপন পদ্ধতি এখানে অনেক বড় ভূমিকা রাখে।

সাধারণ রক্ত পরীক্ষা থেকে আধুনিক আবিষ্কার

স্ক্যান না করে আমি বরং রক্তের সাধারণ কিছু পরীক্ষা করলাম। রক্তে ভিটামিন বি-১২, ফলেট বা থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি থাকলে মানুষের স্মৃতিশক্তি কমে যেতে পারে বা মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। আমার রিপোর্টে সব স্বাভাবিক এল।

তবে বিজ্ঞান এখন অনেক এগিয়ে গেছে। এখন রক্তের বিশেষ পরীক্ষার মাধ্যমে মস্তিষ্কে বিটা-অ্যামাইলয়েড এবং টাউয়ের মতো ক্ষতিকর প্রোটিনের মাত্রা মাপা যায়, যা অ্যালঝেইমার্সের জন্য দায়ী। কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির গবেষক ইভজেনিয়া লোবানোভা এবং তাঁর দল রক্তে একধরনের প্রোটিনের ক্ষুদ্র কণা নিয়ে কাজ করছেন। মস্তিষ্কের ইমিউন কোষগুলো বিপদে পড়লে এই কণাগুলো ছাড়ে। এই কণাগুলো পরীক্ষা করে উপসর্গ দেখা দেওয়ার অন্তত পাঁচ বছর আগেই পারকিনসন্স বা অ্যালঝেইমার্সের মতো রোগের আভাস দেওয়া সম্ভব! যদিও এগুলো এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আছে, তবে ভবিষ্যৎ যে এদিকেই এগোচ্ছে, তা নিশ্চিত।

মেমোরি লস কেন হয়
কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির গবেষক ইভজেনিয়া লোবানোভা এবং তাঁর দল রক্তে একধরনের প্রোটিনের ক্ষুদ্র কণা নিয়ে কাজ করছেন। মস্তিষ্কের ইমিউন কোষগুলো বিপদে পড়লে এই কণাগুলো ছাড়ে।

হাতের স্মার্টওয়াচেই লুকিয়ে আছে মস্তিষ্কের খবর

মজার ব্যাপার হলো, মস্তিষ্কের খবর জানতে হয়তো ল্যাবরেটরিতে যাওয়ারও দরকার নেই; আপনার হাতের স্মার্টওয়াচটাই যথেষ্ট! গবেষকেরা এখন আমাদের প্যাসিভ সিগন্যাল বা শরীরের অন্য অঙ্গের সংকেত থেকে মস্তিষ্কের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করছেন।

এর শুরুটা হয় ঘুম দিয়ে। ঘুম শুধু আমাদের ক্লান্তিই দূর করে না, বরং ঘুমের সময় গ্লিমফ্যাটিক সিস্টেম নামে এক জাদুকরী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমাদের মস্তিষ্ক তার ভেতরের সমস্ত ক্ষতিকর প্রোটিনের মতো আবর্জনা পরিষ্কার করে। নিউইয়র্কের ইউনিভার্সিটি অব রচেস্টারের গবেষক মাইকেন নেডারগার্ড জানান, যারা অ্যালঝেইমার্স বা ডিমেনশিয়ায় ভোগেন, তাদের ঘুমের এই ছন্দে ব্যাঘাত ঘটে।

আপনার মস্তিষ্ক ঠিকমতো আবর্জনা পরিষ্কার করতে পারছে কি না, তা বুঝতে হার্ট রেট ভ্যারিয়াবিলিটি বা এইচআরভি একটি দারুণ সূচক হতে পারে। আমাদের প্রতিটি হৃৎস্পন্দনের মাঝের সময়ের যে অতি সূক্ষ্ম পার্থক্য, তাকেই এইচআরভি বলে। স্মার্টওয়াচ খুব সহজেই এটি মাপতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের এইচআরভি কম, তাদের বিষণ্ণতা, ডিমেনশিয়া বা মানসিক অবসাদের ঝুঁকি অনেক বেশি।

মস্তিষ্ক সুস্থ রাখার জন্য কেমন ঘুম দরকার
ঘুম শুধু আমাদের ক্লান্তিই দূর করে না, বরং ঘুমের সময় গ্লিমফ্যাটিক সিস্টেম নামে এক জাদুকরী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমাদের মস্তিষ্ক তার ভেতরের সমস্ত ক্ষতিকর প্রোটিনের মতো আবর্জনা পরিষ্কার করে।

মস্তিষ্কের বয়স কমানোর উপায়

সম্প্রতি ব্রেইন হেলথ ইনডেক্স নামে একটি ধারণা বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। যুক্তরাজ্যের গ্লাসগো ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা একাধিক এমআরআই স্ক্যানের তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি নির্দিষ্ট স্কোর তৈরি করেছেন, যা থেকে বোঝা যায় বয়সের তুলনায় একজন মানুষের মস্তিষ্ক কতটা সুস্থ। গবেষণায় দেখা গেছে, ভালো শিক্ষাগত যোগ্যতা এই স্কোর বাড়ায়, অন্যদিকে ধূমপান, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ এই স্কোর কমিয়ে দেয়।

২০২৪ সালে ল্যানসেট কমিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমরা যদি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ১৪টি অভ্যাস ঠিক করতে পারি, তবে প্রায় অর্ধেক ডিমেনশিয়া রোগ ঠেকানো সম্ভব! এর মধ্যে আছে ধূমপান ত্যাগ, ব্যায়াম, সামাজিক মেলামেশা ইত্যাদি।

নিউরোএজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ক্রিস্টিন গ্লোরিওসো দেখিয়েছেন, কারও মস্তিষ্কের বয়স যদি তার আসল বয়সের চেয়ে মাত্র পাঁচ বছর কমানো যায়, তবে জিনে অ্যালঝেইমার্সের ঝুঁকি থাকলেও তা অনেকটা এড়ানো সম্ভব। তাদের একটি কগনিটিভ পরীক্ষা করে আমি নিজেও চমকে গিয়েছিলাম! ফলাফল বলেছিল, আমার আসল বয়সের তুলনায় মস্তিষ্কের বয়স ২১ বছর কম! হয়তো মেমরি ট্রিকস জানা থাকার কারণে এমন ফল এসেছিল, তবে এটা আমাকে দারুণ মানসিক প্রশান্তি দিয়েছে।

ডিমেনশিয়া কী 
২০২৪ সালে ল্যানসেট কমিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমরা যদি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ১৪টি অভ্যাস ঠিক করতে পারি, তবে প্রায় অর্ধেক ডিমেনশিয়া রোগ ঠেকানো সম্ভব!

মাল্টিটাস্কিং: মস্তিষ্কের নীরব ঘাতক

মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য নিয়ে ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসের লোরি কুক একটি বিশাল প্রজেক্ট চালাচ্ছেন, যেখানে এক লাখ মানুষ ১০ বছর ধরে অংশ নিচ্ছেন। তাঁর মতে, মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য মানে শুধু ভালো স্মৃতিশক্তি নয়। আপনি কতটা সামাজিকভাবে যুক্ত, কীভাবে স্ট্রেস বা চাপ সামলাচ্ছেন, সবকিছুই এর অংশ।

তাঁদের গবেষণার প্রাথমিক ফলাফলে একটি দারুণ তথ্য উঠে এসেছে। পর্যাপ্ত ঘুম ও মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়াটা মস্তিষ্কের জন্য দারুণ উপকারী। অন্যদিকে, মাল্টিটাস্কিং বা একসঙ্গে অনেকগুলো কাজ করাটা মস্তিষ্কের জন্য রীতিমতো বিষের মতো কাজ করে! এটি আমাদের মস্তিষ্কে দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস তৈরি করে, যা স্নায়ুর স্বাভাবিক কাজকে বাধাগ্রস্ত করে।

এই গবেষণার ফলাফল জানার পর থেকে আমি অন্তত একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। একসঙ্গে অনেক কিছু করার যে বদভ্যাস আমাদের আছে, তা মস্তিষ্ককে ক্লান্ত করে ফেলে। তাই আমি ঠিক করেছি, গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে বসে পার্কিং করার সময় অন্তত আর মনে মনে অঙ্কের হিসাব কষতে যাব না!

মস্তিষ্ক কেমন আছে, তা মাপার জন্য হয়তো একক কোনো নিখুঁত পরীক্ষা এখনো আবিষ্কার হয়নি। তবে ঘুম, এইচআরভি, ভালো খাদ্যাভ্যাস ও সামাজিক মেলামেশার মতো সহজ বিষয়গুলো নজরে রাখলে আমরা নিজেরাই বুঝতে পারব আমাদের মস্তিষ্ক সঠিক পথে আছে কি না। কে জানে, এসব মেনে চললে হয়তো পরের বার পেছনের সিট থেকে উড়ে আসা ৭২ গুণ ৭২-এর উত্তরটা আমি চোখের পলকেই দিয়ে দিতে পারব!

সূত্র: নিউ সায়েন্টিস্ট

অনুবাদ: অনিক রায়

মস্তিষ্ক কি একসঙ্গে একাধিক কাজ করতে পারে