শিরোনাম দেখে একটু অবাক লাগতে পারে। ভাবতে পারো, নরওয়ের ছেলে হলান্ড নরওয়ের হয়ে খেলবে না তো কোন দেশের হয়ে খেলবে? এতে আবার প্রশ্ন করার কী আছে? কিন্তু প্রশ্নটা যেহেতু করেছি, নিশ্চয়ই কোনো একটা ব্যাপার আছে। সে ব্যাপারে যাওয়ার আগে একটু কল্পনার রাজ্যে কিছুক্ষণ কাটিয়ে আসা যাক।

ইংল্যান্ড ফুটবল দলের আক্রমণভাগের কথা একবার কল্পনা করো তো! একদিকে হ্যারি কেইন, জুড বেলিংহাম, ফিল ফোডেন, বুকায়ো সাকা; আর আক্রমণের একদম মাঝে আছেন আর্লিং হলান্ড! এই দলের বিপক্ষে মাঠে নামার আগেই তো প্রতিপক্ষ দলের ডিফেন্ডারদের ভয়ে হাত–পা কাঁপার কথা। কিন্তু হলান্ড তো নরওয়ের খেলোয়াড়, তিনি ইংল্যান্ডের জার্সিতে কেন খেলবেন?

মজার ব্যাপার হলো, এই দুর্ধর্ষ স্ট্রাইকারের গায়ে কিন্তু অনায়াসেই ইংল্যান্ড জাতীয় দলের সাদা জার্সিটা উঠতে পারত। শুধু তা–ই নয়, চাইলেই তিনি ইংল্যান্ড দলের হয়ে বিশ্বকাপ বা ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের মতো বড় বড় টুর্নামেন্ট মাতাতে পারতেন। কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছেন নিজের শিকড় নরওয়েকেই। কেন তিনি এমনটা করলেন? চলো, আজ সেই গল্প শোনা যাক।

ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে একের পর এক রেকর্ড ভাঙা এই স্ট্রাইকারকে সবাই নরওয়েজিয়ান ভাইকিং নামেই চেনেন। কিন্তু তাঁর জন্ম আসলে ইংল্যান্ডে। ২০০০ সালের ২১ জুলাই ইংল্যান্ডের লিডস শহরে হলান্ডের জন্ম।

অফসাইড বুঝব কী করে

সে সময় হলান্ডের বাবা আলফ–ইঙ্গে হলান্ড ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের দল লিডস ইউনাইটেডে খেলতেন। তারপর তাঁর বাবা যোগ দেন ম্যানচেস্টার সিটিতে। সে হিসেবে হলান্ডের জীবনের প্রথম কয়েকটা বছর কেটেছে ইংল্যান্ডের মাটিতেই। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, কোনো খেলোয়াড় যে দেশে জন্মগ্রহণ করেন, তিনি চাইলে সে দেশের জাতীয় দলের হয়ে খেলতে পারেন। এই একটা নিয়মের সুবাদেই জন্মসূত্রে ইংল্যান্ড জাতীয় দলের হয়ে খেলার পুরো অধিকার হলান্ডের ছিল।

পেনাল্টি থেকে গোল করেন আর্লিং হলান্ড

তবে ইংল্যান্ডে জন্ম নিলেও হলান্ডের ভাগ্য লেখা ছিল নরওয়ের বরফে ঢাকা পাহাড় ও সবুজ মাঠ। তাঁর বাবার ক্যারিয়ার যখন চোটের কারণে শেষ হয়ে যায়, তখন পুরো পরিবার আবার নরওয়ের ব্রায়ানে ফিরে আসে। হলান্ডের বয়স তখন মাত্র তিন বা চার বছর।

এই ব্রায়ান শহরেই হলান্ডের বেড়ে ওঠা। স্থানীয় ক্লাব ব্রায়ান এফকে দলে তাঁর ফুটবলে হাতেখড়ি হয়। এখানকার আলো–বাতাস, স্কুল, শৈশবের বন্ধুবান্ধব—সবকিছুর সঙ্গেই তিনি বড় হয়েছেন। নরওয়ের শান্ত পরিবেশ ও সংস্কৃতি তাঁকে পুরোপুরি একজন খাঁটি নরওয়েজিয়ানে পরিণত করে। তিনি নরওয়ের অনূর্ধ্ব–১৫ থেকে শুরু করে বয়সভিত্তিক প্রতিটি দলেই খেলেছেন। নিজের বয়সের চেয়ে বড় খেলোয়াড়দের সঙ্গে খেলেও তিনি সব সময় নরওয়ের বয়সভিত্তিক দলগুলোয় নিজের জায়গা পাকা করে নিয়েছিলেন।

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, ইংল্যান্ডের মতো এত শক্তিশালী একটা দল, যাদের হয়ে খেললে বিশ্বকাপ বা ইউরো জেতার সুযোগ বেশি থাকে, সেই দলটাকে হলান্ড কেন ‘না’ বললেন?

আসলে বিষয়টা ইংল্যান্ডকে প্রত্যাখ্যান করা বা ফিরিয়ে দেওয়া ছিল না। বিষয়টা ছিল নিজের বাড়ি, নিজের মাতৃভূমিকে প্রতিনিধিত্ব করা। ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন যখন বুঝতে পারে, আর্লিং হলান্ড নামের এক ভয়ংকর প্রতিভাবান স্ট্রাইকার উঠে আসছেন এবং জন্মসূত্রে তাঁকে ইংল্যান্ড দলে ভেড়ানো সম্ভব, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ইংল্যান্ডের সাবেক কোচ গ্যারেথ সাউথগেট যখন তাঁকে দলে ডাকার কথা ভাবছিলেন, হলান্ড তত দিনে মনেপ্রাণে নরওয়ের বয়সভিত্তিক দলের একজন অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছেন।

১০০ স্কুলশিক্ষার্থীর বিপক্ষে খেলার কৌশল দিয়েই কি ব্রাজিলকে হারাবে জাপান

হলান্ড নিজেই এই ব্যাপার খুব সুন্দরভাবে পরিষ্কার করেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘হয়তো আমার বাবা যদি ইংল্যান্ডে আরও বেশি দিন থাকতেন, তাহলে আমি হয়তো ইংলিশই হতাম। কে জানে! তবে আমি নরওয়েজিয়ান।’

ইংল্যান্ড জাতীয় দলের হয়ে খেলার বিন্দুমাত্র আক্ষেপ হলান্ডের নেই। তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, নরওয়ের জার্সি গায়ে জড়ানো ছাড়া অন্য কিছু তিনি কখনো ভাবতেই পারেননি। এ ব্যাপারে তাঁর দারুণ একটি কথা আছে, ‘আমি ইংল্যান্ডে মাত্র তিন কি চার বছর ছিলাম। আমার পুরো জীবনটাই কেটেছে নরওয়েতে। তাই নরওয়েকে বেছে নেওয়াটাই আমার জন্য সবচেয়ে স্বাভাবিক ছিল। আমি নরওয়েজিয়ান এবং এই পরিচয় নিয়ে আমি সত্যিই খুব গর্বিত।’

প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলতে এসেছেন আর্লিং হলান্ড। ক্লাব ফুটবলে দুর্দান্ত স্ট্রাইকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এই নরওয়েজীয় তারকা প্রথম ম্যাচে করেছেন দুই গোল। ইরাক–নরওয়ে ম্যাচে।

হলান্ডের এই সিদ্ধান্তের পর ইংলিশ ভক্তরা হয়তো এখনো মাঝেমধ্যে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। তাঁরা ভাবেন, ইশ্! আলফি হলান্ড যদি ইংল্যান্ডে আর কিছুদিন থাকতেন, তাহলে এমন এক গোলমেশিন আজ ইংল্যান্ডের হয়ে গোলবন্যা বইয়ে দিতেন!

নরওয়ে জাতীয় দল ইংল্যান্ডের মতো অতটা শক্তিশালী নয়। তাই আন্তর্জাতিক ফুটবলে বিশ্বকাপ বা ইউরোর মতো বড় মঞ্চে নরওয়েকে খুব একটা দেখা যায় না। এতে হলান্ডকেও আন্তর্জাতিক বড় আসরগুলো মিস করতে হয়। কিন্তু তাতে তাঁর কোনো দুঃখ নেই। কারণ, দিন শেষে যখন তিনি নরওয়ের লাল–নীল–সাদা জার্সিটা গায়ে জড়ান, তখন তিনি শুধু একজন ফুটবলার থাকেন না; তিনি হয়ে ওঠেন তাঁর দেশের সেই হার না–মানা ভাইকিং যোদ্ধা, যে নিজের শিকড়কে বুকে ধারণ করে ফুটবল–বিশ্ব শাসন করছেন।

বিশ্বকাপে কেউ কেউ মাস্ক পরে খেলছেন কেন