মানুষের দুঃখ-কষ্টে পাশে না দাঁড়িয়ে নিজের অন্তরের পরিশুদ্ধি বা তাজকিয়া অর্জন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমাদের মন থেকে এই ধারণাটি একদম ঝেড়ে ফেলা উচিত যে, আমি যদি নিজেকে পবিত্র বা খাঁটি করতে চাই, তবে আমাকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনো গুহায় গিয়ে লুকিয়ে থাকতে হবে এবং কেবল নিজের ভেতরের সমস্যাগুলো নিয়েই পড়ে থাকতে হবে।
আমাদের প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পরিষ্কারভাবে বলেছেন, ইসলামে কোনো বৈরাগ্যবাদ বা সংসারবিরাগ নেই। এই হাদিসের মর্মার্থ হলো, একজন ভালো মুসলিম হওয়ার মানে এই নয় যে সে সমাজ থেকে নিজেকে পুরোপুরি আলাদা করে ফেলবে, একা থাকবে এবং গোপনে কেবল আল্লাহর ইবাদত করবে। বরং সর্বোত্তম মুসলিম তো সেই ব্যক্তি যে সমাজের মানুষের সাথে মেলামেশা ও পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া বজায় রাখে এবং পাশাপাশি নিজের একান্ত ব্যক্তিগত সময়ও আল্লাহর ইবাদতে কাটায়। আপনাকে মানবজাতির সামনে এই বাস্তব সত্যটি ফুটিয়ে তুলতে হবে যে, আল্লাহর একজন প্রকৃত উপাসক বা বান্দা হওয়ার আসল অর্থ কী। আর আপনি যখন মানুষের সামনে সেই বাস্তব রূপটি তুলে ধরবেন, তখনই কেবল আপনার নিজের অন্তরের আসল তাজকিয়া বা পরিশুদ্ধি ঘটবে।
এই ক্ষেত্রে আপনারা আমাদের রাসুলকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) একমাত্র আদর্শ হিসেবে লক্ষ্য করুন। নবুয়ত প্রাপ্তির আগের দীর্ঘ ৪০টি বছর তিনি কী করেছিলেন তা একটু ভেবে দেখুন। তাঁর সেই পুরো ৪০ বছরের জীবনটাই ছিল মানুষের কল্যাণে ও অন্যকে সাহায্য করার কাজে নিবেদিত। তিনি সমাজে নিজেকে সবচেয়ে দয়ালু, সবচেয়ে সৎ এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাঁর এমন এক সুনাম তৈরি হয়েছিল যে, যে কোনো ক্ষুধার্ত মানুষ খাবার চাইলে রাসুলের (সা.) কাছে চলে যেতে পারত, যে কোনো সাহায্যপ্রার্থী নিঃসংকোচে তাঁর দ্বারস্থ হতে পারত। এটি তো নবুয়তের আগের কথা, তাহলে নবুয়ত পাওয়ার পর কী অবস্থা হয়েছিল তা সহজেই অনুমেয়।
সুতরাং এটি অন্তরের পরিশুদ্ধির একটি প্রধান এবং অপরিহার্য অংশ। বিপদে পড়া মানুষের পাশে না দাঁড়িয়ে আত্মশুদ্ধির দাবি করার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম বা সবচেয়ে কল্যাণকর ব্যক্তি সে-ই, যে অন্য মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে আনসারদের প্রশংসা করেছেন এবং বলেছেন যে আল্লাহ তাদের অন্তরে ইমান লিখে দিয়েছেন। কিন্তু কেন? তারা এমন কী করেছিলেন যার জন্য আনসাররা আল্লাহর এত প্রিয় হয়ে উঠলেন? কোরআন আমাদের বলে, যখন মুহাজিররা মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় আসলেন, তখন আনসারদের অন্তরে তাদের জন্য কী ধরনের অনুভূতি ছিল? আল্লাহ আনসারদের অন্তরের যে বিবরণ দিয়েছেন তা লক্ষ্য করুন—নিজেদের ভাইদের প্রতি তাদের অন্তরে ছিল একদম খাঁটি এবং অকৃত্রিম ভালোবাসা। মক্কা থেকে আসা ভাইদের যখন তারা নিজেদের খাবার, সম্পদ এবং অর্থ ভাগ করে দিচ্ছিলেন, তখন তাদের অন্তরে বিন্দুমাত্র কৃপণতা বা সংকীর্ণতা ছিল না; বরং তাদের অন্তর ছিল বিশাল ও উদার।
এরপর আল্লাহ বলছেন, তারা নিজেদের অভাব থাকা সত্ত্বেও নিজেদের ওপর অন্যকে প্রাধান্য দিয়েছিল। অর্থাৎ নিজেদের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও তারা অন্যকে আগে দান করাটাকে শ্রেয় মনে করেছিল। আপনার অন্তর যখন এতটা পবিত্র ও উদার হবে যে আপনি অন্যের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিতে পারবেন, আল্লাহ তাআলা সেটাকেই প্রকৃত এবং চূড়ান্ত তাজকিয়া হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সুতরাং আপনার অন্তরের পরিশুদ্ধি কেবল গোপনে আল্লাহর ইবাদত করার মাধ্যমে আসবে না। হ্যাঁ, গোপনে ইবাদত ও আত্মবিশ্লেষণ অবশ্যই করতে হবে এবং তা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু অন্য মানুষকে সাহায্য করাটাও তাজকিয়ার সমান গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। আমাদের রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, যে ব্যক্তি আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান প্রদর্শন করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়। আপনার অন্তরে মানুষের প্রতি প্রকৃত সহানুভূতি, ভালোবাসা থাকতে হবে এবং যাদের সম্মান প্রাপ্য তাদের প্রতি যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। আপনার অন্তরে যদি এই অনুভূতিগুলো না থাকে, তবে আপনার অন্তরের তাজকিয়া বা পরিশুদ্ধি এখনো ঘটেনি।
এই পুরো বিষয়টি খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলে এমন একটি চমৎকার হাদিস রয়েছে, যা আমাদের অন্তরের কোমলতা এবং সর্বোত্তম চরিত্রের শিক্ষাকে সংক্ষেপ করে দেয়। এক ব্যক্তি আল্লাহর রাসুলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কাছে এসে অভিযোগ করল, হে আল্লাহর রাসুল! আমার অন্তরটা ভালো নয়, এটি ভীষণ শক্ত হয়ে গেছে। আমার হৃদয়ে কোনো কোমলতা নেই, আমি একে নরম করতে চাই কিন্তু উপায় খুঁজে পাচ্ছি না। আল্লাহর রাসুল তাকে তখন কী করতে বললেন? এই হাদিসটিতে লক্ষ্য করুন কীভাবে অন্তরের পরিশুদ্ধিকে সামাজিক কাজের সাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি লোকটিকে বললেন, ‘যাও, কোনো এতিম শিশুকে খুঁজে বের করো এবং তার মাথায় হাত বুলিয়ে দাও।’ যাদের কাছে আপনার মতো সুযোগ-সুবিধা নেই, তাদের জীবনের সাথে যুক্ত হোন। মানুষের মুখে হাসি ফোটান, অন্যের জীবনে সুখ ও আনন্দ বয়ে নিয়ে আসুন। তাহলেই আপনার অন্তর নরম ও কোমল হয়ে যাবে। অন্তরের কোমলতা পাওয়ার আসল উপায় এটাই।
তাই আমরা যেন বৃহত্তর সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে না যাই। আল্লাহর কসম, সমাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া মোটেও ইসলামের শিক্ষা নয়। আমরা যদি নিয়মিত আল্লাহর ইবাদত করতে পারি, মসজিদে উপস্থিত হতে পারি, এটা অবশ্যই আমাদের সফলতা। কিন্তু মসজিদের দেয়াল পেরিয়ে বাইরের দুনিয়ায় আমরা কী প্রভাব ফেলছি সেদিকেও লক্ষ করতে হবে। আসুন, আমাদের প্রত্যেকে নিজের কর্মক্ষেত্রে, নিজের পাড়ায়, নিজের সহকর্মীদের মাঝে একটু খতিয়ে দেখি, কীভাবে আমি তাদের জীবনে ইতিবাচক এবং কল্যাণকর প্রভাব ফেলতে পারি।
আর আমরা যখন মানুষের কল্যাণে কাজ করবো, অন্যকে সাহায্য করবো, ক্ষুধার্তকে খাওয়াবো, এতিমের দায়িত্ব নেবো কিংবা আশ্রয়হীনদের জন্য কাজ করবো, তখন আমরা যেন কখনোই মনে না করি যে এটি ইসলামের কোনো সস্তা প্রচার বা ‘পিআর’ (PR) কৌশল। এই মানসিকতা যেন না থাকে যে, আমরা এসব করছি যাতে মানুষের চোখে ইসলামের একটা ভালো ইমেজ বা ছবি তৈরি হয়। আপনি যদি এই উদ্দেশ্যে কাজ করেন, তবে আপনার নিয়ত বা উদ্দেশ্যটাই ভুল।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট করে বলেছেন, মুমিনরা আল্লাহর ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ হয়ে অভাবী, এতিম ও বন্দিদের খাবার দেয়—সেখানে তারা মানুষের ধর্ম, গায়ের রঙ বা জাতিগত পরিচয় দেখতে যায় না। তারা খাবার দেয় এবং মুখে বলে, আমরা তো কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই তোমাদের খাওয়াচ্ছি, আমরা তোমাদের কাছে এর কোনো প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতাসূচক ধন্যবাদও চাই না। তাই মানুষকে সাহায্য করার সময় কোনো প্রশংসাসূচক প্রচার বা ছবি তোলার মুহূর্ত খুঁজবেন না। মানুষের পাশে দাঁড়ান একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।
ক্ষুধার্তকে অন্ন দেওয়া মুসলমানদের জন্য কোনো কৌশল নয় যে, খাবার দেখিয়ে আমরা মানুষকে ইসলামে দীক্ষিত বা কনভার্ট করব। ক্ষুধার্তকে খাওয়ানোটাই ইসলামের অন্যতম প্রধান ইবাদত। আমরা যদি এই সত্যটি অনুধাবন করতে না পারি, তবে খোদার কসম, আমরা এখনো ইসলামকেই বুঝতে পারিনি। ক্ষুধার্তকে খাওয়ানোই ইসলাম, এতিমের পাশে দাঁড়ানোই একজন মুসলিমের কাজ এবং অন্য মানুষকে সাহায্য করাই নিজের অন্তরকে শুদ্ধ করার অন্যতম প্রধান উপায়।
এরপর এই কল্যাণমূলক কাজের প্রক্রিয়ায় যদি কেউ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে মুসলিম হয়, তবে আলহামদুলিল্লাহ, তাতে কোনো সমস্যা নেই; কিন্তু আমাদের মূল নিয়ত বা উদ্দেশ্য যেন কখনোই মানুষকে ধর্মান্তরিত করার কোনো গোপন কৌশল না হয়। এমন ভাবার কোনো অবকাশ নেই যে, একটু খাবার ঝুলিয়ে দিই, আর মানুষ ইসলামে চলে আসুক। বরং আমরা মানুষকে সাহায্য করি কারণ আমাদের ধর্ম আমাদের এই নির্দেশ দেয়, সীরাহ আমাদের এই শিক্ষা দেয়, আমাদের প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজের জীবনে এটাই করে গেছেন।
তাই আমরা মানুষকে উজাড় করে দেব, মানবজাতির প্রতি উদারতা দেখাব, দরিদ্র, অনাথ এবং মিসকিনদের পাশে দাঁড়াব কারণ একজন মুসলিম হওয়ার প্রকৃত অর্থই এটা। এই দায়িত্ব পালন করার পর যদি কেউ ইসলামকে ভালোবেসে আমাদের কাছে আসে তো ভালো, আর যদি নাও আসে, তবুও আমরা আল্লাহর দরবারে আমাদের দায়িত্বটুকু পালন করেছি এবং আল্লাহর চোখে আমরা আমাদের প্রিয় নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পদচিহ্নই অনুসরণ করেছি।
সূত্র: এপিক মসজিদ
ওএফএফ








