সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। ষড়্ঋতুর এই দেশে নিয়ামতের ডালি নিয়ে বর্ষা আসে প্রকৃতি সজীব করতে। বর্ষাকাল যেমন প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের সময়, তেমন একজন মুমিনের জন্য এটি ইবাদত, আধ্যাত্মিক উন্নয়ন, সমাজসেবা এবং আল্লাহর প্রতি পরম কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক অনন্য সুযোগ।
মেঘ ভেঙে নেমে আসা বৃষ্টির পেছনে রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক বার্তা। আল্লাহর রাসুল (সা.) বৃষ্টিকে ইবাদত ও দোয়ার শ্রেষ্ঠ সময় বানিয়ে নিতেন। বর্ষায় আমাদের করণীয় কিছু আমল হলো:
১. কল্যাণের দোয়া করা: বৃষ্টি শুরু হলে উপকার পেতে রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দোয়াটি বেশি বেশি পড়তেন—‘আল্লাহুম্মা সাইয়্যিবান নাফিআ’ অর্থ: হে আল্লাহ, আপনি মুষলধারায় যে বৃষ্টি দিচ্ছেন, তা যেন আমাদের জন্য উপকারী হয়। (সহিহ বুখারি)
২. বৃষ্টিতে কিছুটা ভেজা: বৃষ্টিকে আল্লাহর সদ্য আগত রহমত বিবেচনা করে এতে শরীর ভেজানো সুন্নত। আনাস (রা.) বলেন, একবার বৃষ্টি শুরু হলে নবীজি (সা.) তাঁর পোশাকের কিছু অংশ সরিয়ে নিলেন, যাতে শরীরে বৃষ্টির পানি লাগে। কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘এটা (বৃষ্টি) এইমাত্র আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে।’ (সহিহ মুসলিম)
৩. দোয়া কবুল হওয়ার সুযোগ নেওয়া: বৃষ্টি চলাকালীন দোয়া কখনো ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুই সময়ের দোয়া কখনো ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। এক. আজানের পরে করা দোয়া এবং দুই. বৃষ্টির সময় করা দোয়া।’ (আল-হাকেম)
৪. বজ্রপাতের সময় তাসবিহ ও দোয়া: বজ্রপাত আল্লাহর মহাশক্তির এক ছোট নিদর্শন। বজ্রের শব্দ শুনলে নবীজি (সা.) বলতেন— ‘আল্লাহুম্মা লা তাক্বতুলনা বিগদাবিকা ওয়া লা তুহলিকনা বিআজাবিকা, ওয়া আফিনা ক্ববলা জালিকা।’
৫. অতিবৃষ্টিতে প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে আশ্রয়: যখন অতিবৃষ্টি বা ঝড় হতো, তখন নবীজি (সা.) দোয়া করতেন—‘আল্লাহুম্মা হাওয়ালাইনা ওয়া লা আলাইনা’ অর্থ: হে আল্লাহ, আমাদের আশপাশে বৃষ্টি বর্ষণ করুন, আমাদের ওপর নয়—পাহাড়, মালভূমি ও বনভূমিতে বর্ষণ করুন। (সহিহ বুখারি)
৬. বৃষ্টি শেষে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ: বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে বলতে হয়—‘মুতিরনা বিফাদলিল্লাহি ওয়া রাহমাতিহি’ অর্থ: আমরা আল্লাহর দয়া ও করুণার বৃষ্টি লাভ করেছি। (সহিহ বুখারি)
৭. পরিবেশরক্ষায় বৃক্ষরোপণ: পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার অন্যতম উপাদান হলো উদ্ভিদ। বর্ষাকাল হলো বৃক্ষরোপণের জন্য বছরের শ্রেষ্ঠ সময়। ইসলামে বৃক্ষরোপণকে ‘সদকায়ে জারিয়া’ বা বিশেষ ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ইসলাম গাছ লাগানোর প্রতি এতটাই গুরুত্ব দিয়েছে যে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যদি কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার আগমুহূর্তেও তোমাদের কারও হাতে একটি চারাগাছ থাকে, তাহলে সে যেন তা রোপণ করে দেয়।’ (মুসনাদে আহমাদ: ১২৯০২)
এ ছাড়া হাদিসে এসেছে, কোনো মুসলমান যদি একটি গাছ লাগায় বা ফসল ফলায়, আর তা থেকে কোনো মানুষ, পাখি বা পশু আহার করে—তবে তা উৎপাদনকারীর জন্য কিয়ামত পর্যন্ত ‘সদকা’ বা দান হিসেবে গণ্য হবে। (সহিহ বুখারি: ২৩২০)
নির্বিচারে গাছ কাটা থেকে বিরত থাকতে রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি বিনা প্রয়োজনে গাছ কাটবে, আল্লাহ তার মাথা আগুনের মধ্যে নিক্ষেপ করবেন।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৫২৪১)। তবে যদি কোনো গাছ মানুষের চলাচলে কষ্ট দেয় বা পরিবেশের ক্ষতি করে, তবে তা কেটে ফেলাও জান্নাত লাভের উসিলা হতে পারে। (সহিহ মুসলিম)
৮. বর্ষাকালে মানবসেবা: বর্ষা যেমন রহমত নিয়ে আসে, তেমনি কখনো কখনো অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা ও বন্যার সৃষ্টি হয়ে মানুষের জীবনে দুর্ভোগ নেমে আসে। এই সময়ে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া একজন মুমিনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। বর্ষার দিনে রিকশাচালক, দিনমজুর বা পথের ফেরিওয়ালাদের আয় কমে যায়। তাদের কষ্ট লাঘব করতে একটি ছাতা বা রেইনকোট উপহার দেওয়া কিংবা দরিদ্র পরিবারে শুকনো খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
৯. সামাজিক সচেতনতা ও স্বেচ্ছাসেবা: নিজ এলাকার ড্রেন বা পানি চলাচলের পথ পরিষ্কার রাখতে তরুণদের নিয়ে স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। কেননা ইসলামের দৃষ্টিতে রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানো ইমানের একটি শাখার অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া প্লাস্টিক ও ময়লা-আবর্জনা যেখানে-সেখানে না ফেলার ব্যাপারে সচেতনতা তৈরি করা।
এ ছাড়া নিজ এলাকার মসজিদে কয়েকটি অতিরিক্ত ছাতা বা রেইনকোট কিনে রাখা যেতে পারে, যেন হঠাৎ বৃষ্টি এলে মুসল্লিরা তা ব্যবহার করে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন।
১০. বর্ষার দিনগুলোতে বৈরী আবহাওয়ার কারণে বাইরে যাতায়াত বা ঘোরাঘুরি সাধারণত কমে যায়। ফলে পরিবারকে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত ও মানসম্মত সময় পাওয়া যায়। এই সময়ে পরিবারের সব সদস্য মিলে একসঙ্গে কোরআন তিলাওয়াত, সিরাত বা হাদিস পাঠের ছোটখাটো ঘরোয়া আসর করা যেতে পারে। এতে পরিবারের বন্ধন যেমন দৃঢ় হয়, তেমনি ঘরে আল্লাহর রহমত ও শান্তি নেমে আসে।
এ ছাড়া ঘরের কোমলমতি শিশুদের বৃষ্টির নিয়ামত, মেঘের গর্জন, বজ্রপাত এবং এর পেছনে লুকিয়ে থাকা মহান আল্লাহর অপরিসীম কুদরত ও মহিমা সম্পর্কে গল্পে গল্পে শেখানো যায়।








