হাওর অঞ্চলের কৃষি, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য ও পরিবেশের সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) গবেষণায় ১২৪টি স্বল্পমেয়াদি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে, হাওরবেষ্টিত সাত জেলার ৯০৪ জন কৃষক সরাসরি উপকৃত হয়েছেন। তিন বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের আওতায় ২২টি উপ-গবেষণা পরিচালিত হয়েছে।

সোমবার (৩১ আগস্ট) রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেমের (বাউরেস) উদ্যোগে আয়োজিত প্রকল্পের চূড়ান্ত পর্যালোচনা কর্মশালায় এসব তথ্য জানানো হয়।

‘ফাইনাল রিভিউ ওয়ার্কশপ অব সিটি ব্যাংক’স এগ্রিকালচারাল রিসার্চ, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ইনোভেশন ইন দ্য অগ্রো-ইকোলজিক্যাল রিজিয়ন অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রকল্পটির অর্থায়ন করেছে সিটি ব্যাংক। তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পটিতে মোট চার কোটি টাকা অর্থায়ন করা হয়েছে। ২০২৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকল্পটির উদ্বোধনী কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।

বাউরেসের পরিচালক অধ্যাপক মো. শামসুল আলম ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে কর্মশালায় প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাকৃবির উপাচার্য অধ্যাপক এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুস সালাম, কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (কেজিএফ) জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. মো. মনোয়ার করিম খান এবং সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাশরুর আরেফিন। স্বাগত বক্তব্য দেন বাউরেসের সাবেক সহযোগী পরিচালক অধ্যাপক মুহাম্মদ জাভিদুল হক ভূঁঞা।

কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাউরেসের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক এম. হাম্মাদুর রহমান। তিনি বলেন, “হাওর অঞ্চলের কৃষি, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য, পরিবেশ ও মানুষের জীবিকার বিভিন্ন সংকট মোকাবিলার উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। গবেষণায় জলবায়ু সহনশীল কৃষি উৎপাদন, ফসল বহুমুখীকরণ, রোগ ও পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা এবং কৃষকের আয় বৃদ্ধিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।”

তিনি জানান, প্রকল্পের আওতায় হাওরবেষ্টিত সাত জেলায় ২২টি উপ-গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। এতে বাকৃবির ২২ জন প্রধান গবেষকসহ মোট ৮১ জন গবেষক অংশ নেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন ৩৬ জন স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী ও চারজন পিএইচডি ফেলো। গবেষণার ফলাফল মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দিতে ২১টি কর্মশালা ও ১৩টি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে।

অধ্যাপক হাম্মাদুর রহমান বলেন, “উপ-গবেষণাগুলোর ফলাফল থেকে ইতোমধ্যে নয়টি ইমপ্যাক্ট জার্নালে ৪৩টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণা কার্যক্রমের মাধ্যমে ৯০৪ জন কৃষক সরাসরি উপকৃত হয়েছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রমে ১২৪টি স্বল্পমেয়াদি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।”

প্রকল্পের প্রভাব তুলে ধরে তিনি বলেন, “সিটি ব্যাংকের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) বিনিয়োগের মাধ্যমে শুরু হওয়া এ প্রকল্প কৃষি গবেষণার পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়ন, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও উদ্ভাবন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং কৃষকের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। এর মাধ্যমে কৃষি প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণ, শিল্প-শিক্ষা-সরকারের মধ্যে সমন্বয়, আন্তর্জাতিক জ্ঞান বিনিময় এবং কৃষককেন্দ্রিক উদ্ভাবন প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”

গবেষণার ফলাফল, তথ্য-উপাত্ত ও প্রশিক্ষণসামগ্রী সংরক্ষণের জন্য একটি ডিজিটাল জ্ঞানভান্ডার তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষিপণ্যের বাজারসংযোগ জোরদার এবং গবেষণা কার্যক্রমের পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

কর্মশালায় বাকৃবি উপাচার্য অধ্যাপক এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া বলেন, “দেশের হাওর অঞ্চলের কৃষির উন্নয়নে বড় পরিসরে অর্থায়ন করায় সিটি ব্যাংককে ধন্যবাদ জানাই। গবেষকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ২২টি গবেষণা থেকে জনসাধারণের জন্য সমস্যাভিত্তিক সমাধানগুলো পত্রিকার লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরতে হবে।”

তিনি বলেন, “গবেষণা সহজ কোনো কাজ নয়। বাকৃবির গ্রাজুয়েটরা তাদের জ্ঞান, দক্ষতা ও মেধাকে কাজে লাগিয়ে দেশের খাদ্য উৎপাদন, নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও কৃষির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। খামারির কান্নাকে হাসিতে পরিণত করার মানসিকতা নিয়ে শিক্ষার্থীদের তৈরি করা হচ্ছে।”

দিনব্যাপী কর্মশালায় প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত ২২টি গবেষণার ফলাফল সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা উপস্থাপন করেন। পরে গবেষণা কার্যক্রমে অংশ নেওয়া গবেষকদের স্মারক ও সনদপত্র দেওয়া হয়।