মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হলেও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের অন্যতম ট্রানজিটে পরিণত করেছে। শুধু তাই নয়, এই মাদকের বিশাল এক বাজারে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি এখানে ইয়াবার পাশাপাশি ভয়াবহ সিনথেটিক মাদক ‘আইস’ বা ক্রিস্টাল মেথের বেচাকেনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। পাশাপাশি নিউ সাইকোঅ্যাকটিভ সাবস্ট্যান্সের বিস্তার এবং এর অনলাইন কেনাবেচা নতুন আতঙ্ক তৈরি করছে। মাদকের বিস্তারে সবচেয়ে ঝুঁকিতে ১৬ থেকে ৩০ বছরের তরুণরা। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ভাবিয়ে তুলেছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৫’-এ এ চিত্র উঠে এসেছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল, গোল্ডেন ক্রিসেন্ট এবং গোল্ডেন ওয়েজের মতো বৈশ্বিক মাদক উৎপাদন কেন্দ্রগুলো থেকে বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে মাদক পাঠানো হয়। আর যেসব রুটে মাদক পাঠানো হয় তার সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান। এছাড়া ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে থাকা দীর্ঘ ও দুর্গম সীমান্ত এলাকাকে ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রগুলো বাংলাদেশে মাদক প্রবেশ করাচ্ছে।
জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মেহেদী হাসান যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন ধরনের সিনথেটিক মাদক ধরছি। তবে এটা বন্ধ করার জন্য সমন্বিত চেষ্টা দরকার। আইন প্রয়োগকারী সব সংস্থা এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অপারেশন হলে এটা বন্ধ করা সম্ভব।’
তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে আমরা এমডিএমবি, কেটামিন মাদক উদ্ধার করেছি। এছাড়া আরও কিছু সিন্থেটিক মাদক- যেগুলো বাংলাদেশে আসার সম্ভাবনা রয়েছে; সেগুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি।’
ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথের আধিপত্য ও রেকর্ড পরিমাণ জব্দ : ২০২৫ সালের মাদক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘দেশের অবৈধ মাদকের বাজারে এখনো অ্যাম্পেটামিন-টাইপ স্টিমুল্যান্ট, বিশেষ করে ইয়াবা এবং ক্রিস্টাল মেথ বা আইসের আধিপত্য বেশি। গত এক বছরে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সমন্বিত অভিযানে প্রায় চার কোটি ৩৫ লাখ ৬০ হাজার (৪৩.৫ মিলিয়ন) পিস ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করা হয়েছে, যা আগের বছরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি।’
এছাড়া ভয়াবহ সিনথেটিক মাদক ‘আইস’ বা ক্রিস্টাল মেথের চোরাচালানও আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি সৃষ্টি করছে। গাঁজা, হেরোইন, কোডিনযুক্ত সিরাপ (ফেনসিডিল) এবং ইনজেকশনযোগ্য মাদকের বিস্তারও অব্যাহত রয়েছে।
নতুন আতঙ্ক নিউ সাইকোঅ্যাকটিভ সাবস্ট্যান্স ও অনলাইন কেনাবেচা : প্রতিবেদনে সবচেয়ে উদ্বেগজনক যে বিষয়টি এসেছে, তা হলো-বাজারে নতুন নতুন রাসায়নিক বা সিনথেটিক মাদকের প্রবেশ। ‘নিউ সাইকোঅ্যাকটিভ সাবস্ট্যান্স’ হিসাবে পরিচিত এমডিএমএ, এলএসডি, সিনথেটিক ক্যানাবিনয়েডস, ট্যাপেন্টাডল, বুপ্রেনরফিন এবং কুশ-এর মতো মারাত্মক মাদকের বিস্তার ঘটছে। পাচারকারীরা এখন আর কেবল সনাতন বা প্রচলিত মাদকের ওপর নির্ভর করছে না। তারা মাদকের বাজারে বৈচিত্র্য আনছে। বিক্রির কৌশলেও ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চোখ ফাঁকি দিতে চক্রগুলো এখন ডিজিটাল যোগাযোগমাধ্যম, এনক্রিপ্টেড অ্যাপস এবং অনলাইন ব্ল্যাকমার্কেট বা ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করছে। ফলে অনলাইনে খুব সহজে মাদক লেনদেন সম্পন্ন হচ্ছে; যা নিয়ন্ত্রণ করা জটিল হয়ে উঠছে। পাচারের জন্য স্থলপথের পাশাপাশি নদীপথ, সমুদ্রপথ ও আকাশপথকেও ব্যবহার করা হচ্ছে।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে ১৬ থেকে ৩০ বছরের তরুণরা : মাদকের সামাজিক ও জনসংখ্যাগত প্রভাব বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মাদকাসক্ত ও মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িতদের একটি বিশাল অংশ ১৬-৩০ বছর বয়সি তরুণ-তরুণী। যুবশক্তি মাদকের জালে জড়িয়ে পড়ায় পারিবারিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে এবং অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভাগীয় শহর এবং সীমান্তসংলগ্ন জেলাগুলো মাদক পাচার ও ব্যবহারের প্রধান কেন্দ্র বা ‘হাব’ হিসাবে কাজ করছে।
ল্যাবরেটরি কার্যক্রম ও বৈজ্ঞানিক তদন্ত : প্রতিবেদনে বলা হয়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় রাসায়নিক পরীক্ষাগার এবং বিভাগীয় ফরেনসিক ল্যাবরেটরিগুলোতে ২০২৫ সালে জব্দকৃত মাদকের ১৯ হাজারের বেশি নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। নমুনাগুলোর বেশির ভাগের ফলাফলে নিষিদ্ধ মাদক বা নিয়ন্ত্রিত উপাদানের উপস্থিতি প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমানে ডিএনসি মাদক শনাক্তকরণে আধুনিক প্রযুক্তি যেমন জিসি-এমএস, এইচপিএলসি এবং এফটিআইআর ব্যবহার করছে। যার ফলে নতুন সিনথেটিক মাদকগুলো দ্রুত ও নিখুঁতভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।
সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ও সমন্বিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা : মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসন রুখতে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি বাস্তবায়ন করছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি সুস্থ, কর্মক্ষম ও মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে এই নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে।
কেবল একক কোনো সংস্থার পক্ষে বিশাল এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয় বিধায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি), বাংলাদেশ পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), কোস্ট গার্ড এবং কাস্টমস ইন্টেলিজেন্স সম্মিলিতভাবে কাজ করছে। গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান এবং সীমান্তে কড়া নজরদারির মাধ্যমে দেশব্যাপী চিরুনি অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
চাহিদা হ্রাস, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম : প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কেবল আইন প্রয়োগ বা মাদকের সরবরাহ কমিয়ে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বরং মাদকের চাহিদা হ্রাস করতে হবে। এ লক্ষ্যে বছরব্যাপী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং গণমাধ্যমের সহায়তায় ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে প্রতি বছর ২৬ জুন মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস’ দেশজুড়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হয়, যা জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে। আর মাদকাসক্তদের সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনতে চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবার আওতা বাড়ানো হয়েছে।


