অফিসে একটি বড় প্রজেক্ট সফলভাবে শেষ করেছেন। ঊর্ধ্বতনের প্রশংসাও পেয়েছেন। সহকর্মীরাও আপনার কাজের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তবু বাড়ি ফেরার পরও মনে হচ্ছে, এবার যদি একইভাবে করতে না পারি? পরেরবার যদি সবাই হতাশ হয়? এমন চিন্তা বারবার মাথায় ঘুরতে থাকে।
অনেকেই এটিকে শুধু ‘পারফেকশনিস্ট’ স্বভাব বা ‘ব্যর্থতার ভয়’ বলে মনে করেন। কিন্তু মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে এর আসল কারণ হলো ‘ফেয়ার অব ডিসপটেনিং আদার্স, অর্থাৎ অন্যকে হতাশ করার ভয়।
ব্যর্থতার ভয় আর অন্যকে হতাশ করার ভয় এক নয়
প্রথম দেখায় দুটি বিষয় একই রকম মনে হলেও বাস্তবে এদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ব্যর্থতার ভয় মূলত নিজের লক্ষ্য পূরণ করতে না পারার আশঙ্কা থেকে তৈরি হয়। সেখানে একজন ব্যক্তি নিজের সাফল্য বা ব্যর্থতাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন।
অন্যদিকে অন্যকে হতাশ করার ভয় তৈরি হয় সম্পর্ক, প্রত্যাশা এবং অন্যের বিশ্বাসকে ঘিরে। এখানে নিজের ক্ষতির চেয়ে বেশি কষ্ট হয় এই ভেবে যে, পরিবার, সহকর্মী, শিক্ষক বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হয়তো আর আগের মতো বিশ্বাস করবেন না। অনেক সময় এই ভয়ই মানুষকে অতিরিক্ত দায়িত্ব নিতে বাধ্য করে, এমনকি বিশ্রাম নেওয়ার ক্ষেত্রেও অপরাধবোধ তৈরি করে।
ইম্পোস্টার সিন্ড্রোম অনেক সময় আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়
প্রশংসা পাওয়ার পরও কেন বাড়ে উদ্বেগ?
সাধারণভাবে মনে করা হয়, প্রশংসা আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। কিন্তু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এর উল্টোটা ঘটে। একবার ভালো কাজ করার পর তারা মনে করতে শুরু করেন, এবার সবাই তাদের কাছ থেকে একই মানের কাজই আশা করবে। ফলে প্রতিটি নতুন দায়িত্ব আরও বেশি চাপের হয়ে ওঠে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এ ধরনের মানুষ প্রায়ই নিজের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করেন। অসুস্থ হলেও ছুটি নিতে চান না, অতিরিক্ত কাজ করেও 'না' বলতে পারেন না। কারণ তাদের মনে হয়, একটু ভুল হলেই অন্যরা হতাশ হয়ে পড়বেন।
ইম্পোস্টার সিন্ড্রোমের সঙ্গে এর সম্পর্ক
এই মানসিক অবস্থার সঙ্গে অনেক সময় ইম্পোস্টার সিন্ড্রোম-এরও সম্পর্ক থাকে। এটি এমন একটি মানসিক প্রবণতা, যেখানে ব্যক্তি নিজের সাফল্যকে নিজের দক্ষতার ফল হিসেবে মেনে নিতে পারেন না। বরং মনে করেন, ভাগ্য, কাকতালীয় ঘটনা বা অন্যের ভুল মূল্যায়নের কারণেই তিনি সফল হয়েছেন। তাদের মনে সবসময় একটি ভয় কাজ করে-একদিন সবাই বুঝে যাবে যে তিনি আসলে ততটা যোগ্য নন। ফলে প্রতিটি নতুন দায়িত্ব তাদের কাছে নিজেকে প্রমাণ করার পরীক্ষার মতো মনে হয়।
শৈশবের অভিজ্ঞতা যেভাবে প্রভাব ফেলে
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মানসিক প্রবণতার শিকড় অনেক সময় শৈশবেই তৈরি হয়। যেসব শিশু কেবল ভালো ফলাফল, বাধ্য আচরণ বা নিখুঁত কাজের জন্য প্রশংসা পায়, তারা ধীরে ধীরে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তাদের মূল্য শুধু সাফল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
আবার যেসব পরিবারে নিয়ম, শৃঙ্খলা বা অন্যের প্রত্যাশা পূরণের ওপর অতিরিক্ত জোর দেওয়া হয়, সেসব পরিবেশে বড় হওয়া অনেকেই নিজের আত্মসম্মান গড়ে তোলেন অন্যের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করে। ফলে বড় হওয়ার পরও তারা সবসময় অন্যকে খুশি রাখার চেষ্টায় নিজের মানসিক শান্তি হারিয়ে ফেলেন।
আরও পড়ুন
থালা-বাসন ধোয়াতে কমতে পারে মানসিক চাপ
মানসিক চাপ থেকে বেরিয়ে আসার উপায়
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, নিজের সাফল্যকে স্বীকার করতে শেখা এবং ভুল করার অধিকারকে গ্রহণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেক কাজেই শতভাগ নিখুঁত হওয়া সম্ভব নয়। মাঝে মাঝে বিশ্রাম নেওয়া, প্রয়োজন হলে সাহায্য চাওয়া এবং নিজের সীমাবদ্ধতাকে মেনে নেওয়াও সুস্থ কর্মজীবনের অংশ। একই সঙ্গে মনে রাখা দরকার, মানুষের ভালোবাসা বা সম্মান শুধু কর্মদক্ষতার ওপর নির্ভর করে না। সম্পর্কের ভিত্তি বিশ্বাস, আন্তরিকতা এবং মানবিকতা-শুধু নিখুঁত পারফরম্যান্স নয়।
আরও পড়ুন
সুখী দম্পতিরাও পরকীয়ায় জড়ায়, বলছে গবেষণা
যদি অন্যকে হতাশ করার ভয় আপনার ঘুম, কাজ, সম্পর্ক বা মানসিক সুস্থতার ওপর দীর্ঘদিন ধরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তবে একজন মনোবিজ্ঞানী বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা উপকারী হতে পারে। সময়মতো এই অনুভূতিকে চিহ্নিত করতে পারলে অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপ কমিয়ে আরও আত্মবিশ্বাসী ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন করা সম্ভব।
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, সাইকোলজি টুডে
এসএকেওয়াই








