বিকেল গড়াতেই রাজধানীর আকাশ ঢেকে যায় কালো মেঘে। কিছুক্ষণ পরই শুরু হয় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। বৃষ্টির ফোঁটায় ভিজতে থাকে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, কোথাও কোথাও জমে পানি। এমন আবহাওয়ায় শুরুর দিকে দর্শক-শ্রোতার উপস্থিতি ছিল কিছুটা কম। তবে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যপট বদলে যেতে থাকে। ছাতা হাতে, রেইনকোট গায়ে কিংবা বৃষ্টিতে ভিজেই দলে দলে তরুণ-তরুণী ও সংগীতপ্রেমীরা ছুটে আসেন ‘কনসার্ট ফর ডেমোক্রেসি’তে। অল্প সময়ের মধ্যেই গানের সুর, দর্শকদের করতালি আর উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে পুরো সোহরাওয়ার্দী উদ্যান।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির তত্ত্বাবধানে এবং বাংলাদেশ মিউজিক্যাল ব্যান্ডস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএএমবিএ) সহযোগিতায় এই উন্মুক্ত কনসার্টের আয়োজন করা হয়েছে। আয়োজকেরা জানিয়েছেন, গণতন্ত্র, সাম্য, সম্প্রীতি ও সংস্কৃতির চেতনাকে সংগীতের মাধ্যমে উদ্যাপন করতেই এ আয়োজন।
বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। শুরুতেই বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরিবেশনায় এস এম আবদুল ফারাবির কণ্ঠে জুলাইকে স্মরণ করে পরিবেশিত হয় ‘বাংলাদেশ বুকে জেগে আছে জুলাই’ গানটি। এরপর শিল্পকলা একাডেমির শিল্পীরা আরও দুটি সংগীত পরিবেশন করেন। উদ্বোধনী পরিবেশনার পর মঞ্চে আসে জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘রে রে’। পর্যায়ক্রমে অ্যাশেজ, ডিফারেন্ট টাচ, লালন, হাইওয়ে, মাইলস ও ওয়ারফেইজের পরিবেশনা হওয়ার কথা রয়েছে।
বৃষ্টির কারণে উদ্যানের বিভিন্ন স্থানে পানি জমলেও দর্শকদের উৎসাহে কোনো ভাটা পড়েনি। মঞ্চে শিল্পীরা গান শুরু করতেই হাজারো কণ্ঠ একসঙ্গে গলা মেলায়। কেউ মোবাইল ফোনে প্রিয় গান ধারণ করছেন, কেউ আবার বন্ধুদের নিয়ে নেচে গেয়ে উপভোগ করছেন আয়োজন। বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় গান, আলো আর দর্শকদের উচ্ছ্বাস মিলেমিশে তৈরি করেছে এক ভিন্ন আবহ।
শুরুর দিকে মাঠে ফাঁকা জায়গা চোখে পড়লেও সন্ধ্যা ঘনানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে মানুষের ঢল। প্রবেশপথে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে নিরাপত্তা তল্লাশি শেষে দর্শনার্থীরা অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করেন। তরুণদের পাশাপাশি মধ্যবয়সী ও পরিবার নিয়ে আসা দর্শনার্থীদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো।
কনসার্টে অংশ নিতে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারজিয়া রহমান বলেন, ‘শুধু গান শুনতে নয়, জুলাইয়ের স্মৃতির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করতেই এখানে এসেছি। এই আয়োজন আমাদের কাছে শুধু বিনোদন নয়, একটি ইতিহাস ও চেতনারও স্মারক।’
বেসরকারি চাকরিজীবী আহমেদ হাসান বলেন, ‘এক মঞ্চে মাইলস, ওয়ারফেইজ, ডিফারেন্ট টাচের মতো ব্যান্ডের পরিবেশনা খুব একটা দেখা যায় না। আবার অনুষ্ঠানটি সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়ায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও অনেক বেশি। বৃষ্টি কোনো বাধাই হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।’
আয়োজকদের মতে, ‘কনসার্ট ফর ডেমোক্রেসি’ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং সাংস্কৃতিক সম্প্রীতির বার্তা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি সাংস্কৃতিক প্রয়াস। তাদের প্রত্যাশা, সংগীতের শক্তির মাধ্যমে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও সহনশীলতার বার্তা আরও বিস্তৃত হবে।








