একসময় প্রচলিত বিশ্বাস ছিল, ইউরোপের দল ইউরোপের বাইরে বিশ্বকাপ জিততে পারে না। সময়ের সঙ্গে সেই ধারণা ভেঙেছে। এবার উত্তর আমেরিকার মাটিতে আরও একটি বার্তা দিল ইউরোপ; নকআউটের মঞ্চেও তারাই এখন সবচেয়ে শক্তিশালী মহাদেশ। ২০২৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেওয়া আট দলের মধ্যে ছয়টিই ইউরোপের। ১৯৯৪ সালের পর বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে এটাই ইউরোপের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
বিশ্বকাপের রাউন্ড অব সিক্সটিন শেষ হতেই ফুটবল মানচিত্রে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ইউরোপের আধিপত্য। কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কেটেছে ফ্রান্স, নরওয়ে, ইংল্যান্ড, স্পেন, বেলজিয়াম ও সুইজারল্যান্ড। ইউরোপের বাইরে শেষ আটে জায়গা পেয়েছে শুধু আর্জেন্টিনা ও মরক্কো।
নকআউটের প্রথম দিনেই প্যারাগুয়েকে হারিয়ে শেষ আট নিশ্চিত করে ফ্রান্স। এরপর ব্রাজিলকে বিদায় করে চমক দেখায় নরওয়ে। আজতেকা স্টেডিয়ামে স্বাগতিক মেক্সিকোকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে ইংল্যান্ড। পর্তুগাল-স্পেনের অল-ইউরোপিয়ান দ্বৈরথে জয় পায় স্পেন, আর আরেক স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রকে হারিয়ে শেষ আটে জায়গা করে নেয় বেলজিয়াম। শেষ দিনে টাইব্রেকারের নাটক পেরিয়ে কলম্বিয়াকে বিদায় করে ইউরোপের ষষ্ঠ প্রতিনিধি হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে সুইজারল্যান্ড।
ইউরোপের বাইরে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপগুলোর ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপের পর এবারই প্রথম শেষ আটে ইউরোপের ছয়টি দল খেলছে। সেবার ১৩টি ইউরোপীয় দলের মধ্যে সাতটি কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল। যদিও শেষ হাসি হেসেছিল লাতিন আমেরিকার প্রতিনিধি ব্রাজিল।
এরপর ইউরোপের বাইরে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপগুলোতে এমন আধিপত্য আর দেখা যায়নি। ২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে ছিল চারটি ইউরোপীয় দল। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় সেই সংখ্যা নেমে আসে মাত্র তিনটিতে। মজার বিষয়, ইউরোপের বাইরে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে শেষ আটে ইউরোপের সবচেয়ে কম প্রতিনিধি থাকা সেই আসরেই স্পেন প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়।
২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপে ইউরোপ থেকে চারটি দল কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল। আর ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ছিল পাঁচটি ইউরোপীয় দল। এবার সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ছয়ে।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে অবশ্য ইউরোপের সর্বোচ্চ আধিপত্য দেখা গিয়েছিল ১৯৩৪ সালে। ইতালিতে অনুষ্ঠিত সেই আসরের শেষ আটের আটটি দলই ছিল ইউরোপের। এরপর ১৯৫৮ সালের সুইডেন ও ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে সাতটি করে ইউরোপীয় দল জায়গা করে নিয়েছিল কোয়ার্টার ফাইনালে।
তবে ইউরোপের এই আধিপত্যের মাঝেও নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে অন্য মহাদেশের প্রতিনিধিরা। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা আবারও শেষ আটে। অন্যদিকে ইতিহাস গড়ে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলবে মরক্কো, যা আফ্রিকার কোনো দেশের জন্য প্রথম ঘটনা।
শিরোপার লড়াই এখন আরও কঠিন। শেষ আটে ইউরোপের ছয় প্রতিনিধি থাকলেও বিশ্বকাপের ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, পরিসংখ্যান সব সময় শেষ কথা বলে না। তবু উত্তর আমেরিকার মঞ্চে ইউরোপ যে আবারও নিজেদের শক্তির জানান দিল, তা নিয়ে আর কোনো সংশয় নেই।








