পর্তুগালের বিশ্বকাপ স্বপ্ন শেষ হয়েছে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে শেষ ষোলোর নাটকীয় পরাজয়ে। অতিরিক্ত সময়ে মিকেল মেরিনোর একমাত্র গোলে হেরে বিদায় নেয় রবার্তো মার্তিনেজের দল। এই হারের মধ্য দিয়েই ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল খেলোয়াড় ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বিশ্বকাপ অধ্যায়েরও ইতি ঘটেছে।

৪১ বছর বয়সী রোনালদো আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, ২০২৬ বিশ্বকাপই হবে তার শেষ বিশ্বকাপ। সুতরাং, এই আসরটিও শেষ হলো তার শিরোপার স্বাদ না পেয়েই। ফলে তিনি জায়গা করে নিলেন ফুটবল ইতিহাসের সেই কিংবদন্তিদের তালিকায়, যাদের অসাধারণ ক্যারিয়ার থাকলেও বিশ্বকাপ ট্রফি কখনো ছোঁয়া হয়নি।

ছয় বিশ্বকাপ, অসংখ্য রেকর্ড; তবু অধরা বিশ্বকাপ

২০০৬ সালে জার্মানিতে প্রথম বিশ্বকাপ খেলেছিলেন রোনালদো। এরপর ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬- টানা ছয়টি বিশ্বকাপে খেলেছেন তিনি। এবার তিনি গড়েছেন নতুন ইতিহাসও। বিশ্বকাপের ছয়টি ভিন্ন আসরে গোল করা প্রথম ফুটবলার হয়েছেন রোনালদো। পাশাপাশি ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে গোল করে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বেও গোলের দেখা পান।

ক্লাব ফুটবলে পাঁচটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ, ৫টি ব্যালন ডি’অর এবং অসংখ্য ব্যক্তিগত ও দলীয় শিরোপা জিতলেও বিশ্বকাপ তার নাগালের বাইরে থেকে গেছে। পর্তুগালকে তিনি কখনো সেমিফাইনালেরও ওপরে তুলতে পারেননি। ২০০৬ সালে চতুর্থ স্থান অর্জনই ছিল তার সেরা বিশ্বকাপ সাফল্য।

Cruef

ইয়োহান ক্রুয়েফ: ফুটবলের বিপ্লবী, কিন্তু বিশ্বকাপহীন

বিশ্বকাপ না জেতা কিংবদন্তিদের তালিকায় অন্যতম নাম ইয়োহান ক্রুয়েফ। মাত্র একটি বিশ্বকাপ খেলেও ১৯৭৪ সালের আসরে তিনি ফুটবল ইতিহাস বদলে দেন। ‘টোটাল ফুটবল’-এর প্রতীক হয়ে নেদারল্যান্ডসকে ফাইনালে তুলেছিলেন তিনি। কিন্তু ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির কাছে ২-১ গোলে হেরে রানার্সআপ হয় ডাচরা। বিশ্বকাপ জিততে না পারলেও আধুনিক ফুটবলের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে আজও স্মরণীয় ক্রুয়েফ।

আলফ্রেডো ডি স্টেফানো: বিশ্বকাপই খেলতে পারেননি

আলফ্রেডো ডি স্টেফানোর গল্প আরও ব্যতিক্রমী। সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার কখনোই বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলতে পারেননি। আর্জেন্টিনায় জন্ম নিয়ে পরে স্পেনের হয়ে খেললেও বিভিন্ন সময় যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থতা, নাগরিকত্বের জটিলতা ও ইনজুরির কারণে বিশ্বকাপের মঞ্চে নামাই হয়নি তার।

Ferench Puscas

ফেরেঞ্চ পুসকাস: অলৌকিক প্রত্যাবর্তনে ভেঙেছিল স্বপ্ন

হাঙ্গেরির কিংবদন্তি ফেরেঙ্ক পুসকাস ছিলেন পঞ্চাশের দশকের দুর্ধর্ষ হাঙ্গেরি দলের প্রাণভোমরা। ১৯৫৪ বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ফুটবল খেলে ফাইনালে ওঠে তার দল। ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ২-০ গোলে এগিয়েও শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে হেরে যায় হাঙ্গেরি। ইতিহাসে যা ‘মিরাকল অব বার্ন’ নামে পরিচিত। অথচ, এই জার্মানিকেই গ্রুপ পর্বে ৮-৩ গোলের বিশাল ব্যবধানে হারিয়েছিল হাঙ্গেরিয়ানরা। ওই ম্যাচে একাই ৪ গোল করেন ককসিস। পুসকাস করেন ১ গোল।

ইউসেবিও: গোল্ডেন বুট, কিন্তু ট্রফি নয়

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর আগে পর্তুগালের সবচেয়ে বড় ফুটবল তারকা ছিলেন ইউসেবিও। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে মাত্র একবার খেলেই ৯ গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে চার গোল করে দলকে জেতালেও সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের কাছে হেরে যায় পর্তুগাল। তৃতীয় স্থান নিয়েই শেষ হয় তাদের যাত্রা।

Zico

পাওলো মালদিনি: রেকর্ড গড়েও শূন্য হাতে

ইতালির কিংবদন্তি ডিফেন্ডার পাওলো মালদিনি খেলেছেন চারটি বিশ্বকাপ। ১৯৯৪ সালে ব্রাজিলের বিপক্ষে টাইব্রেকারে ফাইনালে হেরে শিরোপার সবচেয়ে কাছে গিয়েও শিরোপা জিততে পারেননি। বিশ্বকাপে দীর্ঘদিন সবচেয়ে বেশি ২,২১৭ মিনিট খেলার রেকর্ডও ছিল তার দখলে, যা ২০২২ সালে ভেঙেছেন লিওনেল মেসি।

আরও যাদের বিশ্বকাপ জেতা হয়নি

এই তালিকা আরও দীর্ঘ। রবার্তো ব্যাজ্জিও, জিকো, সক্রেটিস, ফ্যালকাও, মিশেল প্লাতিনি, জর্জ বেস্ট, লেভ ইয়াসিন, জর্জ উইয়েহ এবং নেইমারের মতো কিংবদন্তিরাও বিশ্বকাপ জিততে পারেননি।

তবে রোনালদোর নামটি আলাদা গুরুত্ব পায় তার দীর্ঘ ক্যারিয়ার, অসংখ্য ব্যক্তিগত রেকর্ড এবং শিরোপাভরা জীবনযাত্রার কারণে। ক্লাব ও আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রায় সব বড় ট্রফিই জিতেছেন তিনি। শুধু বিশ্বকাপটাই থেকে গেল অধরা।

ফুটবল ইতিহাসে সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে তার অবস্থান নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, বিশ্বকাপ ট্রফির অনুপস্থিতি তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা হয়েই থেকে গেল।

আইএইচএস/