বিশ্বকাপে রেফারির কিছু সিদ্ধান্ত যেন পুরো ফুটবল বিশ্বকে দুই ভাগে ভাগ করে দিয়েছে। মিশরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার নাটকীয় ৩-২ গোলের জয়ের পর ফলাফলের চেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে ভিএআরের হস্তক্ষেপ। গোল বাতিলের সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে এবার সরব হয়েছেন ইউরোপের দুই অভিজ্ঞ সাবেক রেফারি। তাদের দাবি, মিসরের বাতিল হওয়া গোলটি আসলে বৈধই ছিল।

বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে মিশরকে ৩-২ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে আর্জেন্টিনা। তবে ম্যাচের ৬৭তম মিনিটে মোস্তাফা জিকোর করা গোল বাতিল হওয়ার ঘটনাই এখন ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি।

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের সাবেক রেফারি ও রেফারিং বিশ্লেষক গ্রাহাম স্কট মনে করেন, ভিএআরের হস্তক্ষেপে ওই গোল বাতিল করাই ছিল ভুল সিদ্ধান্ত।

দ্য অ্যাথলেটিকে প্রকাশিত নিজের বিশ্লেষণে স্কট বলেন, ‘মিসরের গোলটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। জিকোর করা গোলের ঠিক আগের মুহূর্তে লিসান্দ্রো মার্তিনেজের ওপর আত্তিয়ার চ্যালেঞ্জটি ছিল খুবই স্বাভাবিক কনট্যাক্ট (শারীরিক লড়াই)। এটিকে ফাউল না ধরে ম্যাচ রেফারিদের স্বাভাবিক হিসেবেই নেওয়া উচিত ছিল।’

তার মতে, ঘটনাটি গোল হওয়ার অনেক আগেই ঘটেছিল এবং আর্জেন্টিনার রক্ষণ নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার যথেষ্ট সময় পেয়েছিল।

‘ঘটনাটি ঘটেছিল গোলপোস্ট থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে। ফলে নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে রক্ষণ সামলানোর পর্যাপ্ত সুযোগ ছিল আর্জেন্টিনার সামনে। তাই ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) রিভিউয়ের পর গোলটি বাতিল হওয়ায় মিশর দল যে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করবে, তা বলাই বাহুল্য।’

স্কটের মতে, খেলোয়াড়দের মধ্যে সামান্য শরীরী লড়াইকে ফাউল হিসেবে দেখার মতো পরিস্থিতি ছিল না। তিনি বলেন, ‘যদি ঘটনায় তাকাই, তবে দেখা যাবে, খেলোয়াড়দের মধ্যে সামান্য শরীরী লড়াই হয়েছিল, পায়ের ওপর পা রাখার পাশাপাশি জার্সি সামান্য টেনে ধরার ঘটনাও ঘটেছিল। তবে সেটি এমন কোনো বড় অপরাধ ছিল না, যার জন্য ভিএআরের হস্তক্ষেপে গোলটি বাতিল করতে হবে।’

সাবেক প্রিমিয়ার লিগ রেফারি স্কটের মতে, ভিএআর এখানে নিজেদের সীমা অতিক্রম করেছে, ‘প্রতিটি গোলের ঠিক আগে আক্রমণের পর্যায়গুলো খতিয়ে দেখে ভিএআর। এই গোলের ক্ষেত্রেও তারা বলের দখল হারানোর মুহূর্ত পর্যন্ত পেছনে ফিরে তাকিয়েছে। গোল বাতিল করতে হলে সেখানে স্পষ্ট ফাউল থাকতে হয়, যা এখানে একেবারেই ছিল না। অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, ফাউলের ঘটনা এবং গোলের মধ্যকার দূরত্ব ও সময় যত বেশি হবে, অভিযুক্ত ফাউলটি ততটাই গুরুতর হতে হবে।’

তবে একই ম্যাচে আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের আগে মোহাম্মদ সালাহকে ফাউলের অভিযোগে মিসরের পেনাল্টির দাবি নাকচ করার সিদ্ধান্তকে সঠিক বলেই মনে করেন তিনি। স্কটের ভাষায়, ‘অথচ এখানে উল্লেখ করার মতো কোনো ফাউলই হয়নি। ভিএআর হস্তক্ষেপ করার মতো ন্যূনতম কোনো পরিস্থিতিও এটি ছিল না। একই যুক্তিতে, আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের আগে মোহাম্মদ সালাহকে ফাউলের অভিযোগে মিসরের পেনাল্টির দাবিটি নাকচ করে দিয়ে সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন রেফারি। সালাহর বুটে সামান্য আঘাত লেগেছিল ঠিকই, তবে সেটা তাঁকে ফেলে দেওয়ার মতো যথেষ্ট ছিল না। এটি কোনোভাবেই ফাউল ছিল না।’

একই সুর শোনা গেছে সাবেক ফিফা রেফারি এবং ২০১৬ ইউরো ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালের ম্যাচ অফিসিয়াল মার্ক ক্ল্যাটেনবার্গের কণ্ঠেও। ফক্স স্পোর্টসকে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি না যে এটি ফাউল ছিল এবং গোলটি বাতিল করতে ভিএআরের এভাবে হস্তক্ষেপ করা উচিত হয়েছে। এটি এমন কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না, যেখানে ভিএআরের নাক গলানোর প্রয়োজন পড়ে।’

ক্ল্যাটেনবার্গের অভিযোগ, পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই একই ধরনের শারীরিক লড়াইকে খেলার অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে। তাই এই ঘটনায় হঠাৎ করে ভিএআরের হস্তক্ষেপ ধারাবাহিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ক্ল্যাটেনবার্গের ভাষায়, ‘আমার মূল্যায়ন খুবই সহজ; এই টুর্নামেন্টে রেফারিরা যেভাবে ম্যাচ পরিচালনা করছেন, এই চ্যালেঞ্জ বা ফাউলটি তার সঙ্গে কোনোভাবেই মেলে না। তাঁরা ম্যাচে খানিকটা শারীরিক লড়াইয়ের জায়গা রেখেছেন। তাই এটা যে ফাউল ছিল না, সেই যুক্তি দেওয়ার জায়গাটা থাকে। মাঠের রেফারি যখন সিদ্ধান্ত দিয়েই দিয়েছেন, তখন ভিএআরের মাথা ঘামানোর কোনো সুযোগই নেই। ফাউল ছিল কি না, তা সম্পূর্ণ মাঠের রেফারির তাৎক্ষণিক বিবেচনার বিষয়। এটি মোটেও স্পষ্ট ফাউল ছিল না।’

সবশেষে আরও কঠোর মন্তব্য করেন ক্ল্যাটেনবার্গ, ‘ভিএআর একটু বেশিই চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছে এবং মিসরের গোলটি বাতিল করতে তারা যেন ম্যাচের মধ্যে খুঁত খুঁজেছে।’

তবে এই বিতর্কে বিপরীত অবস্থান নিয়েছেন ফক্স স্পোর্টসের রেফারিং বিশেষজ্ঞ ডক্টর জো মাচনিক। তার মতে, সিদ্ধান্তটি পুরোপুরি ভিএআর প্রটোকল অনুযায়ী হয়েছে। ‘ওয়ার্ল্ড কাপ নাউ’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘এটি অনেক আগে থেকেই ভিএআর প্রটোকল বা নিয়মের অংশ। প্রযুক্তিটি চালুর একদম শুরুর দিকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, কোনো ফাউলের সূত্র ধরে গোল হলে, সেই গোল কোনোভাবেই বৈধতা পাবে না। তবে নিয়মে ফাউল ও গোলের মধ্যকার কোনো নির্দিষ্ট দূরত্ব ৫ সেকেন্ড আগে বা ৭৫ গজ দূরে হতে হবে, এমন কোনো সময়সীমার কথা বলা হয়নি। যতক্ষণ পর্যন্ত প্রতিপক্ষ দল বলের নিয়ন্ত্রণ ফিরে না পাচ্ছে বা নতুন কোনো মুভ তৈরি করতে না পারছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ধরে নেওয়া হবে ওই ফাউলের মাধ্যমেই বলের দখল নেওয়া হয়েছিল এবং সেই আক্রমণ থেকেই গোলটি এসেছে। এটি পুরোপুরি নিয়ম মেনেই করা হয়েছে, আর ঠিক এ কারণেই গোলটি বাতিল করা হয়।’

ফলে আটলান্টায় ৯০ মিনিটের ফুটবল শেষ হলেও বিতর্ক যেন এখনো চলছে। একপক্ষ বলছে, ভিএআর আর্জেন্টিনাকে বড় সুবিধা দিয়েছে। অন্যপক্ষের দাবি, ফুটবলের আইন মেনেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।