চলতি বিশ্বকাপের রোমাঞ্চ ও উন্মাদনা যখন মাঠজুড়ে, ঠিক তখনই পর্দার আড়ালে ডাগআউটে চলছে এক নীরব ভাঙাগড়ার খেলা। ফুটবল বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে ট্রফি জয়ের চাপ যেমন থাকে, তেমনি সামান্য ব্যর্থতায় চাকরি হারানোর খড়্গও ঝুলে থাকে কোচদের ঘাড়ে। পরিসংখ্যান বলছে, চলতি আসরে অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে প্রায় ২৭ শতাংশ দেশের কোচ ইতিমধ্যেই তাঁদের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। কারও কপালে জুটেছে বরখাস্তের অপমান, আবার কারও দল আশানুরূপ ফল না পাওয়ায় নিজে থেকেই সম্মানের সঙ্গে সরে দাঁড়িয়েছেন। সব মিলিয়ে ১৩ জন হাইপ্রোফাইল কোচের এই বিদায়মিছিল ফুটবল দুনিয়ায় এক বড় আলোড়ন তৈরি করেছে। চলো দেখি, কার বিদায়টা কেমন হলো।

তিউনিসিয়ার ডাগআউটে নাটকের পর নাটক
আফ্রিকান নেশনস কাপে মালির কাছে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নেওয়ার পর গত ১৪ জানুয়ারি তিউনিসিয়ার কোচের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সাব্রি লামুশিকে। কিন্তু বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই সুইডেনের কাছে ৫-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে হেরে বসে তাঁর দল। তিউনিসিয়ার ফুটবল ফেডারেশন কালবিলম্ব না করে লামুশিকে বরখাস্ত করে। লামুশি অবশ্য যাওয়ার আগে বলেছিলেন, ‘আমাদের আত্মসম্মান আছে, ঘুরে দাঁড়ানো উচিত।’
লামুশির জায়গায় ১৬ জুন তিউনিসিয়ার ডাগআউটে আসেন বিখ্যাত ফরাসি কোচ হার্ভে রেনার্ড। কিন্তু তিউনিসিয়ার ভাগ্য তাতেও বদলায়নি। গ্রুপ পর্বে রেকর্ড ১২টি গোল হজম করে বিদায় নেয় তারা। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১৮ দিনের মাথায় সোশ্যাল মিডিয়ায় এক আবেগঘন পোস্টে রেনার্ড পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে লেখেন, ‘তিউনিসিয়ার জার্সি গায়ে জড়ানো এবং এই অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা অর্জন করা আমার জন্য সম্মানের ছিল।’
এআই যুগে ফুটবল বিশ্বকাপস্বপ্নের অপমৃত্যু এবং রবার্তো মার্তিনেজের বিদায়
২০২২ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর কাছে হেরে পর্তুগাল বিদায় নেওয়ার পর ফের্নান্দো সান্তোসের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন স্প্যনিশ কোচ রবার্তো মার্তিনেজ। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোদের ডাগআউট সামলানোর পর তাঁর বিদায়টা নিশ্চিত হলো চলতি বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে স্পেনের কাছে হেরে। মার্তিনেজ নিজেই মার্জিতভাবে সরে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আমি এখানে এসেছিলাম বিশ্বকাপ জেতার লক্ষ্য নিয়ে। যেহেতু আমি সেটা জিততে পারিনি, তাই আমার দায়িত্বে থাকাটা আর কোনো অর্থ বহন করে না।’

দক্ষিণ কোরিয়ায় তীব্র সমালোচনায় হং মিয়ং-বো’র পদত্যাগ
২০১৪ বিশ্বকাপে কোনো ম্যাচ না জিতে বিদায় নেওয়ার পর ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে দক্ষিণ কোরিয়ার দায়িত্ব পেয়েছিলেন হং মিয়ং-বো। কিন্তু এবার মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হেরে তাঁর দল যখন বিদায়ের অপেক্ষায়, তখন দেশজুড়ে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ুং কঠোর ভাষায় বলেন, ‘নেতা হিসেবে যদি কোনো অযোগ্য মানুষকে বসানো হয়, তবে তার ফলাফল আগুনের মতোই অনুমান করা যায়।’ চাপের মুখে হং মিয়ং-বো লিখিত বিবৃতিতে বলেন, ‘প্রধান কোচের দায়িত্বটা এত বড় যে ফলাফল যখন আশানুরূপ হয় না, তখন আর কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন থাকে না।’
বিশ্বকাপ থেকে সেলিব্রিটিচেক প্রজাতন্ত্রের মিডিয়া ট্রায়াল ও স্টিভ ক্লার্কের আক্ষেপ
চেক প্রজাতন্ত্রকে ২০০৬ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপে নিয়ে এসেছিলেন মিরোস্লাভ কুবেক। কিন্তু গ্রুপ পর্বের তলানিতে থেকে দল বিদায় নেওয়ার পর ২৯ জুন তিনি পারস্পরিক সমঝোতায় কোচের পদ ছাড়েন। তবে তাঁর বিদায়টা সুখকর ছিল না। কুবেক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যমের কিছু অর্ধসত্য ও বানোয়াট প্রচারণাই আমাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে।’
অন্যদিকে স্কটল্যান্ডকে ইতিহাসে প্রথম কোচ হিসেবে তিনটি বড় টুর্নামেন্টে নিয়ে যাওয়া স্টিভ ক্লার্কও পদত্যাগ করেছেন। সেরা আটটি তৃতীয় স্থান অধিকারী দলের মধ্যে জায়গা করতে না পেরে স্কটল্যান্ডের বিশ্বকাপ শেষ হলে ক্লার্ক সমর্থকদের উদ্দেশে খোলা চিঠিতে লেখেন, ‘সবচেয়ে বড় তৃপ্তির জায়গা ছিল আমাদের জাতীয় দল ও সমর্থকদের মধ্যে আবার সেই পুরোনো আত্মিক বন্ধন ফিরিয়ে আনা।’

মার্সেলো বিয়েলসার চুক্তি শেষ ও দালিচের বিদায়
২০২৩ সালে উরুগুয়ের দায়িত্ব নিয়েই ফুটবল দুনিয়ায় শোরগোল ফেলে দিয়েছিলেন মার্সেলো বিয়েলসা। একঝাঁক অভিজ্ঞ তারকাকে বাদ দিয়ে তিনি ১৪ জন নতুন মুখ দলে নিয়েছিলেন। কিন্তু গ্রুপ পর্ব থেকে উরুগুয়ের আকস্মিক বিদায়ের পর তাঁর তিন বছরের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয় এবং তিনি বিদায় নেন। ১০০ মিনিটের এক দীর্ঘ ও অনুতপ্ত সংবাদ সম্মেলনে বিয়েলসা বলেন, ‘আমি উরুগুয়ের ফুটবলের জন্য কিছুই রেখে যেতে পারলাম না।’
ক্রোয়েশিয়াকে ২০১৮ সালের রানার্সআপ এবং ২০২২ সালের সেমিফাইনালে নিয়ে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদি কোচ জ্লাতকো দালিচও তাঁর অধ্যায়ের ইতি টেনেছেন। শেষ ৩২-এ পর্তুগালের কাছে বিতর্কিতভাবে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নেয় ক্রোয়েশিয়া। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া দালিচ বলেন, ‘যখন দায়িত্ব নিয়েছিলাম, তখন ভাবতেও পারিনি আমরা এত কিছু অর্জন করব।’

ঘানা ও জার্মানির ডাগআউটে বড় ধাক্কা
এ বছরের এপ্রিলেই ঘানার কোচ হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন কার্লোস কুইরোজ। কিন্তু কলম্বিয়ার কাছে হেরে শেষ ৩২ থেকে দল বাদ পড়ায় সোশ্যাল মিডিয়ায় পদত্যাগের কথা জানান তিনি। ঘানার ক্রীড়ামন্ত্রী কফি অ্যাডামস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘তিনি তো সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়োগ পাননি, তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় পদত্যাগ গ্রহণযোগ্য নয়।’
এদিকে শেষ ৩২-এ প্যারাগুয়ের কাছে হেরে জার্মানির ডাগআউট ছেড়েছেন ইউলিয়ান নাগেলসমান। বিদায়বেলায় তিনি বলেন, ‘এমন তেতো অভিজ্ঞতার পর দলের নতুন করে শুরু করা উচিত।’ শোনা যাচ্ছে, তাঁর জায়গায় জার্মানির ডাগআউটে আসতে পারেন ইয়ুর্গেন ক্লপ।
খেলোয়াড়েরা কেন বুটের গোড়ালি কেটে মাঠে নামছেনহাভিয়ের আগিরোর রক্তারক্তি ও কোম্যানের প্রস্থান
এবার দেশের মানুষকে বড় স্বপ্ন দেখাচ্ছিল স্বাগতিক মেক্সিকো। কিন্তু শেষ ষোলোতে ইংল্যান্ডের কাছে ৩-২ গোলে হেরে বিদায় নেয় তারা। পদত্যাগ করেন ৬৭ বছর বয়সী মেক্সিকান কোচ হাভিয়ের আগিরো। সহকারী রাফায়েল মার্কেজের হাতে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘হার তো হারই, আমি কোনো অজুহাত দেব না।’
অন্যদিকে নেদারল্যান্ডসের ডাগআউট ছেড়েছেন কোচ রোনাল্ড কোম্যানও। শেষ ৩২-এ মরক্কোর কাছে টাইব্রেকারে হেরে বাদ পড়ার পর অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক কৌশলের জন্য সমালোচিত কোম্যান বলেন, ‘এই কয়েক বছর আমাকে বুঝিয়েছে, জীবনে ফুটবলের চেয়েও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে।’
সবশেষে ইকুয়েডরের সেবাস্তিয়ান বেকাচেসেও পদত্যাগ করেছেন। মেক্সিকোর কাছে ২-০ গোলে হেরে বিদায় নেওয়ার পর তিনি বলেন, ‘দর্শকদের সঙ্গে আমার রসায়নটা ঠিক জমেনি।’
সব মিলিয়ে এই বিশ্বকাপ কোচেদের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা প্রমাণিত হলো, যেখানে ব্যর্থতার শাস্তি শুধুই বিদায়।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
বিশ্বকাপে খেলোয়াড়দের সঙ্গে মাঠে নামা শিশুরা কীভাবে নির্বাচিত হয়







