স্বচ্ছ নীল জলের উমগট নদীর ওপর ঝুলে থাকা দৃষ্টিনন্দন এক সেতু ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ডাউকি। সিলেটের জাফলং সীমান্তে দাঁড়ালেই ওপাড়ে পাহাড়ের ভাঁজে চোখে পড়ে এই ঝুলন্ত সেতুটি। পর্যটকদের কাছে এটি এক জীবন্ত পোস্টকার্ড। তবে বিস্ময়কর তথ্য হলো, বিশ্বখ্যাত এই সেতুর নির্মাণের নেপথ্যে ছিলেন তৎকালীন শ্রীহট্ট বা বর্তমান সিলেট অঞ্চলের দুই কৃতি বাঙালি। তারা হলেন- তৎকালীন মন্ত্রী বসন্ত কুমার দাস এবং প্রকৌশলী আবিদ রেজা চৌধুরী।সেতুটির ইতিহাসের শিকড় লুকিয়ে আছে ১৯১৯ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিলং সফরের অভিজ্ঞতায়। তখন সড়কপথের জটিলতায় কবিগুরুকে অনেক পথ ঘুরে রেলপথে শ্রীহট্টে আসতে হয়েছিল। এরপরই শিলং-শ্রীহট্ট সরাসরি সড়ক নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা সামনে আনেন আসাম প্রদেশ কংগ্রেসের নেতা খান বাহাদুর সৈয়দ আবদুল মজিদ (কাপ্তান মিয়া)। তার মৃত্যুর পর সেই উদ্যোগকে এগিয়ে নেন দক্ষিণ সুরমার সন্তান ও তৎকালীন মন্ত্রী বসন্ত কুমার দাস। ১৯৩২ সালে তার প্রচেষ্টায় উমগট নদীর ওপর সেতু নির্মাণের বাজেট বরাদ্দ হয়।তবে পাহাড়ঘেরা খরস্রোতা নদীর ওপর সেতুটি বাস্তবে রূপ দেওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করেন সিলেটের প্রথম প্রজন্মের মুসলিম প্রকৌশলী আবিদ রেজা চৌধুরী। বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (বর্তমানে শিবপুর আইআইইএসটি) থেকে পাস করা এই মেধাবী প্রকৌশলীর নিখুঁত নকশা ও তত্ত্বাবধানে ১৯৩২ সালেই সেতুর নির্মাণ সম্পন্ন হয়। পরবর্তীকালে এটি ‘গেটওয়ে অব শিলং’ নামে পরিচিতি পায়।প্রকৌশলী আবিদ রেজা চৌধুরীর এই উত্তরাধিকার কেবল ডাউকি সেতুতেই থেমে থাকেনি। তারই সুযোগ্য সন্তান ছিলেন বাংলাদেশের কিংবদন্তি প্রকৌশলী ও শিক্ষাবিদ প্রয়াত অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী (জেআরসি)।১৯৩৬ সালে সুরমা নদীর ওপর নির্মিত সিলেটের ঐতিহাসিক কীন ব্রিজেরও কয়েক বছর আগে তৈরি হয়েছিল এই ডাউকি সেতু। আজ জাফলং সীমান্তে দাঁড়িয়ে পর্যটকরা যখন এই সেতুর সৌন্দর্য দেখেন, তখন এটি কেবল একটি স্থাপনা হিসেবে নয়, বরং দুই দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অনন্য মেলবন্ধন হিসেবে ধরা দেয়। এর নেপথ্যের কারিগর বসন্ত কুমার দাস ও আবিদ রেজা চৌধুরী আজও ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল হয়ে আছেন।/