চলতি মৌসুমের মধ্যে একদিনে রেকর্ড ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের দেখা পেয়েছে রাজধানী ঢাকা। রোববারের (১২ জুলাই) এই ভারী বর্ষণের জেরে মহানগরীর বহু রাস্তা এখনো তলিয়ে রয়েছে। জলজটে সৃষ্ট স্থবিরতার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব।

ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিউমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড, পান্থপথ, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। সেখানে ব্যবসায়ীদের মালামাল নষ্ট হয়ে গেছে। বহু অফিস ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছিল বন্ধ। সেবা দিতে পারেনি ডেলিভারি সার্ভিস পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও। কিছু এলাকার প্রতিষ্ঠানে এখনো পানি প্রবেশের শঙ্কা করা হচ্ছে।

বৃষ্টি-জলাবদ্ধতায় ঢাকায় দিনে ক্ষতি শত কোটি টাকারাজধানীর মুদি পণ্যের বাজারে জলাবদ্ধতা। এ পানি মাড়িয়ে কেউ দোকানে আসছেন না/ছবি: জাগো নিউজ

ক্ষতির পরিমাণ ১০০ থেকে ১৫০ কোটি

রোববারের বৃষ্টিতে একদিনে রাজধানীর ব্যবসা-বাণিজ্যে কী পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে এর সঠিক পরিসংখ্যান না মিললেও কেউ কেউ বলছেন, ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলছেন, জলাবদ্ধতা ও ভারী বৃষ্টি থাকলে ঢাকায় দিনে ১৫০ থেকে ২০০ কোটি টাকার বেচাকেনা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, আর সারাদেশে দিনে ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার বিক্রি কমে যেতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের ২০১৫ সালের ‘ক্লাইমেট অ্যান্ড ডিজাস্টার রেজিলেন্স অব গ্রেটার ঢাকা এরিয়া’ শীর্ষক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, জলাবদ্ধতা নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ২০১৪ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে ঢাকার মোট ১১ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের চরম বৈরী আবহাওয়া যুক্ত হলে এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ১৩ হাজার ৯০০ কোটি থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকা। এই দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসের বাইরে ঢাকা শহরে জলাবদ্ধতার কারণে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার সরাসরি আর্থিক ক্ষতি হয়ে থাকে। সব মিলিয়ে জলাবদ্ধতায় ক্ষতির অঙ্ক বেশ বড়।

আরও পড়ুন

খাল-নদীর পথ হারিয়েছে বৃষ্টির পানি, বারবার ডুবছে ঢাকা

জলাবদ্ধতায় বিকল মোটরসাইকেল, মেকানিকের দোকানে চালকদের ভিড়

ক্ষতির প্রভাব হবে দীর্ঘমেয়াদি

টানা বৃষ্টিতে ব্যবসায়ীদের যে ক্ষতি হয়েছে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রভাব আরও এক থেকে দেড় মাস থাকবে। বৃষ্টির পানিতে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও মার্কেটের মালামাল নষ্ট হয়ে গেছে। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তারা যেমন ব্যবসা করতে পারেননি, তেমনি অনেকেই তাদের মালামালও রক্ষা করতে পারেননি।’

জলাবদ্ধতা ও অব্যবস্থাপনা এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে উল্লেখ করে এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘রাজধানী ঢাকার মতো একটি শহরে এমন পরিস্থিতি অত্যন্ত দুঃখজনক। কোথাও সুষ্ঠু তদারকি নেই। রাস্তাঘাটের বেহাল অবস্থার কারণে মানুষ ও যানবাহনের চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফ্লাইওভার থেকে নিচে পানি পড়ার কারণে অনেক স্থানে চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।’

বৃষ্টি-জলাবদ্ধতায় ঢাকায় দিনে ক্ষতি শত কোটি টাকাটানা ভারী বৃষ্টিতে মহানগরীতে তলিয়ে যাওয়া বাজার/ছবি: জাগো নিউজ 

হেলাল উদ্দিন অভিযোগ করেন, বিভিন্ন উন্নয়নকাজে অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করা হচ্ছে। এক্সকাভেটর দিয়ে কাজ করতে গিয়ে পানি, গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে। আবার খোঁড়াখুঁড়ির পর দিনের পর দিন কাজ বন্ধ থাকছে। এসব দেখভালেরও কেউ নেই। অথচ ব্যবসায়ীদের নিয়মিত কর, ভ্যাট ও অন্যান্য সরকারি ফি পরিশোধ করতে হচ্ছে।

ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত শুধু বৃষ্টির কারণে ব্যবসায়ীদের আনুমানিক ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।’

আরও পড়ুন

২৪ ঘণ্টা পরও পানির নিচে ‘অভিশপ্ত’ নিউমার্কেটের সড়ক

সড়কে জলাবদ্ধতা, বিকল হওয়া এড়াতে ফ্লাইওভারে ব্যাটারিচালিত রিকশা

ব্যবসা-বাণিজ্য কার্যত স্থবির

জানতে চাইলে বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আরিফুর রহমান টিপু জাগো নিউজকে বলেন, ‘একদিনের ভারী বৃষ্টিতে ঢাকার অধিকাংশ এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ক্রেতারা মার্কেটে আসতে পারেননি, আবার জলাবদ্ধতার কারণে অনেক দোকানদারও দোকান খুলতে পারেননি। ফলে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে একেবারেই বেচাকেনা হয়নি। আমাদের ভাষায় বলতে গেলে, এই মাসে এখন পর্যন্ত ‘বিসমিল্লাহই’ করতে পারিনি।’

তিনি জানান, বৃষ্টির কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মচারীরা কাজে আসতে পারেননি। কোথাও কোথাও ৩০০ দোকানের মার্কেটে ৩০টির মতো দোকানই খোলেনি। সামগ্রিকভাবে সব মার্কেটেই একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে রাস্তার পাশের অনেক দোকানে বৃষ্টির পানি ঢুকে মালামাল নষ্ট হয়েছে। এলিফ্যান্ট রোডসহ বিভিন্ন এলাকার অসংখ্য দোকান পানিতে তলিয়ে গেছে। মার্কেটের ভেতরের দোকানগুলোর তুলনায় রাস্তার পাশের দোকানগুলোতে ক্ষতি বেশি হয়েছে।

বৃষ্টি-জলাবদ্ধতায় ঢাকায় দিনে ক্ষতি শত কোটি টাকাপ্রেসক্লাব এলাকায় দোকানে প্রবেশ করা পানি বের করা হচ্ছে/ছবি: জাগো নিউজ

আরিফুর রহমান টিপুর তথ্য অনুযায়ী, বিশেষ করে কাপড়ের দোকানগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দোকানে পানি ঢুকে কাপড় ভিজে গেছে। এখন অনেকেই দোকানের ভেতরে ফ্যান চালিয়ে ভেজা মালপত্র শুকানোর চেষ্টা করছেন। রোদ না থাকায় স্বাভাবিকভাবে শুকানোরও সুযোগ নেই।

ক্ষতির বিষয়ে দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির এই নেতা বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান এখনো প্রস্তুত হয়নি। তবে পানিতে মালামাল নষ্ট হওয়ার ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। আশা করছি, খুব শিগগিরই ক্ষয়ক্ষতির একটি প্রাথমিক হিসাব পাওয়া যাবে।’

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, জলাবদ্ধতা ও ভারী বৃষ্টি থাকলে ঢাকায় দৈনিক ১৫০ থেকে ২৫০ কোটি টাকার আর সারাদেশে ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার বিক্রি কমে যাওয়ার শঙ্কা থাকে।

আরও পড়ুন

বাদলা দিনে থমকে পুরান ঢাকা, ভোগান্তিতে নগরজীবন

‘বের না হলে বাজার করার টাকাও থাকবে না, পেট তো আর বৃষ্টি বোঝে না’

দ্রুত উদ্যোগ না নিলে ক্ষতি আরও বাড়বে

এ নিয়ে কথা হয় ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘বর্তমানে ভারী বর্ষণের ফলে জলাবদ্ধতা ও বন্যায় বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিশেষ করে কৃষি ও মৎস্য খাত উল্লেখযোগ্য ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। আমরা লক্ষ্য করেছি, চট্টগ্রামে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় শত কোটি টাকা। টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও ভয়াবহ বন্যার কারণে বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। ফলে বাণিজ্যিক প্রক্রিয়া মন্থর হয়ে পড়েছে।’

বৃষ্টি-জলাবদ্ধতায় ঢাকায় দিনে ক্ষতি শত কোটি টাকাতিন ব্যবসায়ী নেতা (বাঁ থেকে) তাসকীন আহমেদ, হেলাল উদ্দিন ও মো. আরিফুর রহমান টিপু

ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ চট্টগ্রামের বাইরেও প্রকট জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এরই মধ্যে দেশের হাওর অঞ্চলে বোরো ধান কাটার আগেই বন্যায় ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষকের আয় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি রাজধানী ঢাকার প্রায় বেশিরভাগ জায়গাতে জলাবদ্ধতার কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিঘ্নিত হচ্ছে।’

তাসকীন আহমেদ আশঙ্কা প্রকাশ করে জানান, এই সমস্যা সমাধানে দ্রুত কার্যকর নগর পরিকল্পনা, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধার এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে জলাবদ্ধতার অর্থনৈতিক ক্ষতি আগামী বছরগুলোতে আরও বৃদ্ধি পাবে।

ইএইচটি/একিউএফ