টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম-দোহাজারী, কক্সবাজার, ময়মনসিংহ, শান্তাহার ও লালমনিরহাটসহ রেলপথের বিভিন্ন সেকশন ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে রেলসেবা। কোথাও কোথাও লাইনের ওপর দুই থেকে তিন ফুট পানি জমেছে। কোথাও আবার পানির স্রোতে লাইন ও রেলওয়ে সেতু ধসে পড়ছে। বৃষ্টির পানি দীর্ঘসময় জমে থাকায় কোথাও লাইনও দেবে যাচ্ছে। অতিবৃষ্টিতে কোনো কোনো স্টেশনে পানি জমে বিপর্যয় সৃষ্টি হচ্ছে। এমনকি কোনো কোনো রুটে ৫-৬ দিন ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখতে হয়েছে। আবার রুট চালু হলেও যাত্রীসেবা অনিয়মিত হয়ে পড়ছে।
চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত ৪৭ কিলোমিটার রেলপথ চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। ভারি বৃষ্টি কিংবা পাহাড়ি ঢল নেমে আসলে এ রুটের বিভিন্ন স্থানে রেলপথ ডুবে যায়। পানির তোড়ে লাইন উপড়ে যাওয়ার মতোও অবস্থা সৃষ্টি হচ্ছে।
এদিকে পাঁচ দিন বন্ধ থাকার পর রোববার থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করা হয়েছে। তবে এ রুটে গতি কমিয়ে ট্রেন চালানো হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমানের সঙ্গে কথা বলেছে যুগান্তর। তিনি জানান, আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে অতিবৃষ্টি হচ্ছে। পাহাড়ি ঢলের পানিতে রেলপথ প্রায়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ২০২৩ সালেও পাহাড়ি ঢলে দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরে তা মেরামত করা হয়। আবারও টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেল সেকশনের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মাইলের পর মাইল রেলপথ পানির নিচে ডুবে যাচ্ছে। এতে ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। বাতিল হওয়া ট্রেনের টিকিটের মূল্য ফেরত দিতে হচ্ছে। ক্ষতির শিকার সেকশন মেরামত করতেও প্রচুর অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। আগে যেসব স্থানে রেললাইন পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল, সেসব জায়াগায় লাইন উঁচু করার চেষ্টা হয়েছে।
গত কয়েকদিনের টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে গত ৭ জুলাই চট্টগ্রাম ও জানআলী হাট স্টেশনের মধ্যবর্তী রেললাইন প্লাবিত হয়। রেললাইনের ওপর প্রায় তিন থেকে চার ফুট পানি জমে যায়। এতে প্রথমে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় ট্রেনগুলোকে পেছনের স্টেশনে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। চলাচল বাতিল হয় সব ট্রেনের।
অতিরিক্ত মহাপরিচালক বলেন, টানা বৃষ্টির পানি রেলপথে জমে থাকলে লাইনের ক্ষতি হয়। মাটি নরম হয়ে লাইন দেবে যায়। এমন অবস্থায় পানি কমে গেলে ট্রেন পরিচালনায় লাইন নতুন করে উপযুক্ত করা হয়। পানিতে রেলওয়ে সেতুও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুপাশের মাটি ধসে গিয়ে সেতু ঝুঁকিতে পড়ে। ফলে বারবার ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়। পানি শুকিয়ে যাওয়ার পর ট্রেন গতিতে চালাতে হয়।
এদিকে বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে শুধু চট্টগ্রাম কক্সবাজার সেকশন নয়, পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন সেকশনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শান্তাহার, লালমনিরহাট, আখাউড়া, কুমিল্লা, সিলেট, ময়মনসিংহ রেলপথের বিভিন্ন সেকশনও পানিতে তলিয়ে যায়। ওই কর্মকর্তা জানান, বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে রেলপথের ক্ষয়ক্ষতি রোধে সরকার প্রকল্প গ্রহণ করছে।
রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ জানান, রেললাইন পাঁচ ফুট উঁচু করা হলে ভবিষ্যতে তিন ফুট পর্যন্ত পানি বাড়লেও ট্রেন চলাচলে সমস্যা হবে না। সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণ সামনে রেখে কোথায় কতটুকু পানি জমছে, সেসব তথ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার চিন্তা রয়েছে। চট্টগ্রামে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, অনেকে বলছেন গত ৪৫ বছরেও এত বৃষ্টি চট্টগ্রামে হয়নি। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হচ্ছে রেললাইন উঁচু করা, যাতে ভারী বৃষ্টি হলেও রেল চলাচল বিঘ্নিত না হয়।
রেলওয়ে অপারেশন দপ্তর সূত্র জানায়, অতিবৃষ্টিতে রেললাইন ভেঙে ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। রোববার ময়মনসিংহ নগরীর ভাবখালী এলাকায় রেললাইনের একটি অংশ ভেঙে যাওয়ায় ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
এ প্রসঙ্গে রেলওয়ে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মো. নাজমুল হোসেন বলেন, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের ক্ষতি এড়াতে রেলপথের বিভিন্ন সেকশনে লাইন উঁচু করা জরুরি হয়ে পড়ছে।







