ইসলামের অন্যতম একটি বিধান হলো অজু। নামাজের জন্য প্রতিদিন আমাদের অজু করতে হয়। অজুর বিধান কমবেশি সবারই জানা। তবে ইসলামে যেকোনো আমলের ক্ষেত্রে সুন্নাহসম্মত পদ্ধতিই অগ্রগণ্য।
রাসুল (সা.) যে কাজ যেভাবে করেছেন, ঠিক সেভাবে করাই সুন্নত। এই লেখায় আমরা বিভিন্ন হাদিস থেকে সরাসরি রাসুলের অজুর পদ্ধতি দেখব।
রাসুলের অজু ছিল অত্যন্ত নিখুঁত ও সুশৃঙ্খল। সবচেয়ে বড় কথা, তাঁর অজু ছিল সরাসরি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ফেরেশতা জিবরাইলের মাধ্যমে শেখানো।
সাহাবিরা তাঁর অজু করার দৃশ্য যেভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন, হাদিসের কিতাবগুলোতে তা বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে। এই পদ্ধতিগুলো অনুসরণের মাধ্যমেই অজু হতে পারে পূর্ণাঙ্গ ও সুন্নাহসম্মত।
পানির পরিমাণ ও মিতব্যয়িতা
রাসুল (সা.) সাধারণত প্রতিটি ফরজ নামাজের জন্যই নতুন করে অজু করতেন (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২১৪)
তবে কখনো কখনো এক অজু দিয়ে একাধিক নামাজও আদায় করেছেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৭)
অজুর জন্য তিনি সাধারণত এক ‘মুদ’ পরিমাণ পানি ব্যবহার করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০১)
সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমের মতে, মুদ হলো এমন একটি পাত্র, যাতে এক ও এক-তৃতীয়াংশ বাগদাদি ‘রতল’ পানি ধরে; আধুনিক হিসাবে যা প্রায় ৬২৫ মিলিলিটার—অর্থাৎ আধা লিটারের সামান্য বেশি।
হানাফি আলেমদের মতে, মুদ দুই রতলের সমান, যা আধুনিক হিসাবে প্রায় এক লিটারের কাছাকাছি। অর্থাৎ একটি সাধারণ পানির বোতলের অর্ধেক থেকে বড়জোর এক বোতল পানি দিয়েই রাসুল (সা.) পূর্ণ অজু সেরে নিতেন।
অজু ও পবিত্রতা অর্জনের ক্ষেত্রে পানির অপচয় করতে তিনি কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন এবং অতিরিক্ত পানি ব্যবহারকে শয়তানের প্ররোচনা আখ্যা দিয়েছেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৫৭)
অঙ্গ ধোয়ার সংখ্যা
হাদিস থেকে প্রমাণিত, তিনি অজুর অঙ্গগুলো কখনো একবার, কখনো দুবার, তবে বেশির ভাগ সময় তিনবার করে ধৌত করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৫৭)
তিনবারের বেশি ধৌত করাকে তিনি অপছন্দ করেছেন এবং একে সীমালঙ্ঘন ও অবিচার বলেছেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৩৫)
ঘুমের আগে অজু করার ৪ উপকারিতাকুলি ও নাকে পানি দেওয়া
কুলি করা এবং নাকে পানি দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ডান হাত দিয়ে পানি মুখে ও নাকে দিতেন এবং বাঁ হাত দিয়ে নাক ঝাড়তেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯১)
কখনো তিনি কুলি ও নাকে পানি দেওয়া আলাদাভাবেও করতেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৩৯)
এ ছাড়া চোখের ভেতরের কোণ (মা’কাইন) ধৌত বা মাসাহ করার কথাও হাদিসে এসেছে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৩৪)
মাথা ও কান ‘মাসাহ’
মাসাহ মানে ভেজা হাতে কোনো অঙ্গ বা বস্তুর ওপর আলতোভাবে বুলিয়ে দেওয়া। মাথা মাসাহ করার ক্ষেত্রে তিনি দুই হাত দিয়ে মাথার সামনের দিক থেকে শুরু করে পেছনের দিকে যেতেন এবং আবার সামনে ফিরে আসতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৮৫)
মাথায় পাগড়ি থাকলে তিনি মাথার সামনের অংশে মাসাহ করে বাকিটা পাগড়ির ওপর মাসাহ করে পূর্ণ করতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৪)
তিনি দুই কানের ভেতরের ও বাইরের অংশ মাসাহ করতেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১২১)
দাড়ি ও আঙুল ‘খিলাল’
অজুর সময় রাসুল (সা.) অত্যন্ত যত্নসহকারে দাড়ি খিলাল করতেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৯)
খিলাল মানে ভেতর আঙুল প্রবেশ করিয়ে ভালোভাবে ভিজিয়ে দেওয়া বা নেড়েচেড়ে পরিষ্কার করা।
তিনি এককোষ পানি থুতনির নিচ দিয়ে প্রবেশ করিয়ে আঙুল দিয়ে দাড়ি খিলাল করতেন এবং বলতেন, তাঁর প্রতিপালক তাঁকে এভাবেই নির্দেশ দিয়েছেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৪৫)
পায়ের ক্ষেত্রে তিনি হাতের কনিষ্ঠা আঙুল দিয়ে পায়ের আঙুলগুলোর মাঝখানে খিলাল করতেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৪৮)
সীমানার চেয়ে বাড়িয়ে ধোয়া
অজুর অঙ্গগুলো ধৌত করার সময় তিনি নির্ধারিত সীমানার চেয়ে কিছুটা বাড়িয়ে ধুতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩৬)
তিনি বলেছেন, কিয়ামতের দিন তাঁর উম্মতকে অজুর চিহ্নের কারণে উজ্জ্বল মুখমণ্ডল ও হাত-পা বিশিষ্ট অবস্থায় ডাকা হবে। তাই তিনি এই উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে নেওয়ার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩৬)
অজুর শুরুতে বিসমিল্লাহ কি বাধ্যতামূলকঅজুতে নবীজি যে দোয়া পড়তেন
অজুর শুরুতে রাসুল (সা.) ‘বিসমিল্লাহ’ বলে আল্লাহর নাম স্মরণ করতেন। এরপর কিছু দোয়া পড়তেন।
১. একবার আবু মুসা আশআরি (রা.) নবীজির জন্য অজুর পানি আনলে তিনি অজু করলেন এবং তাঁকে এই দোয়া পড়তে শোনা গেল:
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাগফির লি জামবি, ওয়া ওয়াসসি লি ফি দারি, ওয়া বারিক লি ফি রিযকি।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমার গুনাহ ক্ষমা করুন, আমার ঘরকে প্রশস্ত করে দিন এবং আমার রিজিকে বরকত দান করুন। (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৮০)
৩. অজু শেষে এই দোয়া পড়তেন:
উচ্চারণ: আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহ।
অর্থ: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই। আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মদ তাঁর বান্দা ও রাসুল।
যে ব্যক্তি অজু শেষে এই দোয়া পড়বে, তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেওয়া হবে—সে যেটি দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস:: ২৩৪)
৪. এরপর তিনি পড়তেন:
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাজ আলনি মিনাত-তাওয়াবিনা ওয়াজ আলনি মিনাল-মুতাত্বাহহিরিন।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমাকে তওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৫৫)
৫. পাশাপাশি তিনি এই দোয়াও পাঠ করতেন:
উচ্চারণ: সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা, আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লা আনতা, আসতাগফিরুকা ওয়া আতুবু ইলাইক।
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র, সব প্রশংসা আপনারই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাই এবং আপনার দিকেই ফিরে আসি। (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৮১)
অজু কেবল শারীরিক পরিচ্ছন্নতা নয়, এটি আত্মিক পবিত্রতারও প্রধান মাধ্যম। সুন্নাহ মেনে অজু করার ক্ষেত্রে এই হাদিসগুলোই হতে পারে প্রধান আলোকবর্তিকা।
অজু-গোসলের পর শরীর মুছলে কি সওয়াব কমে যায়




