ভারতের মেঘালয় রাজ্যে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ডালু-তুরা সড়ক বিধ্বস্ত হওয়ায় প্রায় এক মাস ধরে শেরপুরের নাকুগাঁও স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন হাজারো লোড-আনলোড শ্রমিক। আর লোকসানের মুখে পড়েছেন বন্দরের ব্যবসায়ীরা। একইসঙ্গে বন্দরের রাজস্ব আয় শূন্যের কোঠায় নেমেছে।

জানা গেছে, ১৯৯৭ সালে নালিতাবাড়ী উপজেলার নাকুগাঁও শুল্ক বন্দরের কার্যক্রম শুরু হলেও ২০০২ সালে ১৯টি পণ্যের মধ্যে কয়লা ও পাথর ছাড়া সব পণ্য আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। পরে ২০০৯ সালে বন্দরটি পূর্ণাঙ্গ বন্দর হলেও ২০১৫ সালে স্থলবন্দরের কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে ২১টি পণ্য আমদানির কথা থাকলে আমদানি হচ্ছে শুধু পাথর।

নাকুগাঁও স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে নাকুগাঁও স্থলবন্দর দিয়ে এক লাখ ৯৪ হাজার ৬১৪ টন পাথর বাংলাদেশে আমদানি করা হয়েছে। যাতে কাস্টমস বিভাগ সাত কোটি ৩৪ লাখ ৯১ হাজার ৭৯১ টাকা, স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ তিন কোটি ৫৫ লাখ ৮৭ হাজার ১৬৮ টাকার ট্যারিফ আদায় করেছে। যা ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের চেয়ে অর্ধেক। পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শেরপুরের নাকুগাঁও স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা চরম বিপাকে পড়েছেন। প্রতিদিন শত শত ট্রাক পাথর ও কয়লা আসার কথা থাকলেও বন্দর এখন প্রায় ফাঁকা। বন্দর সচল না থাকায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন শত শত লোড-আনলোড শ্রমিক।

নাকুগাঁও বন্দরের ব্যবসায়ীরা জানান, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ধসের কারণে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পশ্চিম গারো হিলস এবং দক্ষিণ গারো হিলস জেলার ডালু-মহেন্দ্রগঞ্জ-গারোবাঁধা-তুরা এবং ডালু-তুরা সড়কের বেশ কিছু স্থান বিধ্বস্ত হয়েছে এবং রাস্তার ওপর মাটি পড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে শেরপুরের নাকুগাঁও স্থলবন্দর দিয়ে সব ধরনের পণ্য আমদানি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।

আরও পড়ুন

সম্পদ নিয়ে দ্বন্দ্ব / পিটিয়ে জখমের পর ৫ দিন প্রবাসীকে ঘরে আটকে রাখলেন স্ত্রী-সন্তানরা

ব্যবসায়ীরা আরও জানায়, দ্রুত ভারতের রাস্তা মেরামত করা না হলে এ বন্দরে আমদানি-রপ্তানিকারকদের বড় ধরনের লোকসান গুণতে হবে। সরকারও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাবে।

লোড-আনলোড শ্রমিক সেকান্দর মিয়া বলেন, বন্দরে পাথর ভাঙার কাজ করি ১১ বছর ধরে। পাথর ভাঙার কাজ করেই সাত সদস্যের পরিবার চালাই। কিন্তু গত এক মাস ধরে ভুটান ও ভারতীয় পাথর আমদানি বন্ধ থাকায় কাজ নেই। এখন সংসারও চলতেছে খেয়ে না খেয়ে। যা জমানো টাকা ছিল, তাও ফুরিয়ে এসেছে। এখন পরিবার নিয়ে কীভাবে চলবো, চিন্তায় আছি। কিস্তির টাকা নিয়ে আরও বেশি চিন্তা।

পাথর শ্রমিক শাহজাহান আলী বলেন, এক মাস ধরে কাজ বন্ধ থাকায় আমরা পরিবার নিয়ে সমস্যায় আছি। আমরা তো এ কাজই শিখেছি, অন্য কাজ পারি না। যে পরিমাণ টাকা জমানো ছিলো তা শেষ হয়ে গেছে। এখন ঋণ করে চলছি।

নাকগাঁও স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান মুকুল বলেন, প্রায় এক মাস ধরে বন্দরে পাথর না আসায় ব্যবসায়ীরা অনেক ক্ষতির মুখে আছি। মাঝেমধ্যে ঢল হলেই ভারতের রাস্তা বন্ধ থাকে আর আমাদের ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হয়। তবে আমরা জানতে পেরেছি, নতুন করে পাহাড়ি ঢল বা বৃষ্টি না হলে এবং রোদ থাকলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে রাস্তা সংস্কারের কাজ শেষ হবে। সে ক্ষেত্রে এক সপ্তাহের মধ্যে পণ্য আমদানি স্বাভাবিক হওয়ার আশা করছি।

নাকুগাঁও স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক জাহিদুল ইসলাম বলেন, প্রায় এক মাস ধরে ভারতের অংশে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ থাকায় পাথর বা কয়লাসহ কোনো পণ্যবাহী ট্রাক বন্দরে আসেনি। এর ওপর অতিবর্ষণ ও পাহাড়ধসের কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। তবে মঙ্গলবার সকালে বিশেষ ব্যবস্থায় বিকল্প সড়কে ভুটানের একটি পাথরবাহী ট্রাক ঢুকেছে বন্দরে। প্রায় এক মাস ধরে বন্দরে কোনো পণ্য আমদানি না হওয়ায় সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে।

মো. নাঈম ইসলাম/এনএইচআর/জেআইএম