টানা চার দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। তলিয়ে গেছে ঘরবাড়ি, গ্রামীণ সড়ক ও ফসলি জমি। দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে।

এ অবস্থায় বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) উপজেলার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করেছে প্রশাসন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত রোববার থেকে বুধবার পর্যন্ত টানা বৃষ্টিতে মিরসরাইয়ের সার্বিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়েছে। পাহাড়ি ঢল ও নদীর পানি বৃদ্ধি এবং স্থানীয় খাল-বিল উপচে বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি মানুষের পাশাপাশি বিদ্যুৎহীন অবস্থায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা ও শিক্ষা কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। উপজেলার ১৬ ইউনিয়ন দুই পৌরসভার জনজীবন কার্যত ঝিমিয়ে পড়েছে।

জানা গেছে, টানা ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বিভিন্ন খাল-ছড়ায় পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে প্রবেশ করেছে। অনেক বাড়িঘরে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে রয়েছে। উপজেলার খৈয়াছরা, ওয়াহেদপুর, কাটাছরা, ইছাখালী ইউনিয়ন, মিরসরাই পৌরসভা, বারইয়ারহাট পৌরসভার বিভিন্ন বাড়িতে পানি উঠেছে। পানিতে তলিয়ে গেছে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক ও সংযোগ সড়ক। ফলে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

এদিকে কৃষি খাতেও বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আউশের রোপা, আমনের বীজতলা, সবজিখেত তলিয়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকরা।

উপজেলার ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের মধ্যম ওয়াহেদপুর এলাকার কৃষক আব্দুল হান্নান বলেন, ৬ শতক জমিতে আমনের বীজতলা বসিয়েছিলাম। টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ি ঢলের কারণে সব তলিয়ে গেছে। বৃষ্টি কমলে আবার নতুন করে বীজতলা তৈরি করতে হবে।

খৈয়াছরা ইউনিয়নের পূর্বপোলমোগরা এলাকার বাসিন্দা নুরুল হুদা বলেন, টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে হঠাৎ করে পানি বাড়িতে ঢুকে পড়েছে। ঘরের আসবাবপত্র ও খাবার সামগ্রী নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি।

সৈদালী এলাকার গৃহিণী কোহিনুর আক্তার বলেন, সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি উঠানসহ ঘরের ভেতরে পানি। রান্না করতে পারছি না। বিশুদ্ধ পানিরও সংকট দেখা দিয়েছে। টিউবওয়েল পানিতে ডুবে গেছে।

ওচমানপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. আলা উদ্দিন জানান, এমনিতে জোরারগঞ্জ-মুহরী প্রজেক্ট সড়কের বেহাল দশা। তারপর টানা বৃষ্টিতে সড়কে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। টেকেরহাট সড়কের অবস্থাও খুব নাজুক। মানুষ চলাফেরা করতে অনেকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

এদিকে টানা চারদিনের বৃষ্টিতে কর্মহীন হয়ে পড়েছে রিকশা ও ভ্যানচালকসহ দিনমজুররা। কাজ না থাকায় তারা পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।

মিরসরাই উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ফেরদৌস হোসেন জানান, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে বুধবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ও সকল পরীক্ষা স্থগিত ছিল। বৃহস্পতিবারও সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ এবং পরীক্ষা গ্রহণ স্থগিত থাকবে।

মিরসরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় বলেন, টানা বৃষ্টিতে আউশ রোপা, আমন বীজতলা ও সবজিক্ষেতের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। মাঠে পরিদর্শন করে ইতোমধ্যে তালিকা তৈরি করেছি। ৫০ হেক্টর আউশ, ৫ হেক্টর আমন বীজতলা, ১৫ হেক্টর গ্রীস্মকালিন সবজি পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।

মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সোমাইয়া আক্তার বলেন, টানা চারদিনের বৃষ্টিতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কিছু মানুষ পানিবন্দি হয়ে রয়েছে। খবর পেয়ে আমরা শুকনো খাবার নিয়ে ছুটে গেছি। বিভিন্ন ইউনিয়নে পানিবন্দি মানুষের তালিকা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, যেসব এলাকায় লোকজন পাহাড়ে বসবাস করেন তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য মাইকিং করে সচেতন করা হয়েছে।

মিরসরাই আসনের সংসদ সদস্য নুরুল আমিন বলেছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে আমার এলাকার মানুষ যাতে দুর্ভোগে না থাকে সেজন্য দলীয় নেতা-কর্মীদের খোঁজ খবর রাখা ও তালিকা করার নির্দেশ দিয়েছি। যেসব এলাকায় লোকজন পানিতে কষ্ট করছেন তাদের খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে।

এম মাঈন উদ্দিন/কেএইচকে