প্রিয় দল হারলেই অনেকের মন খারাপ হয়ে যায়, কেউ হতাশ হন, আবার কারো আত্মবিশ্বাসও কমে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি অস্বাভাবিক নয়। তবে সেই হতাশা কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার কিছু কার্যকর উপায়ও রয়েছে।

খেলা দেখা শুধু বিনোদন নয়, বিশ্বের কোটি মানুষের কাছে এটি দৈনন্দিন জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গবেষণা বলছে, খেলা মানুষকে সামাজিকভাবে যুক্ত রাখে, নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করে এবং নিজের আবেগ বুঝে নিয়ন্ত্রণ করতেও ভূমিকা রাখে।

তবে খেলা দেখার সময় আবেগও দ্রুত বদলে যায়। এক মুহূর্তে উচ্ছ্বাস, পরের মুহূর্তেই রাগ বা হতাশা। বিশেষ করে যারা কোনো দলের নিবেদিত সমর্থক, তাদের কাছে দলের জয়-পরাজয় মানসিক অবস্থার ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

দল জিতলে অনেকেই নিজের সাফল্যের মতো আনন্দ অনুভব করেন, আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। আবার দল হারলে হতাশা, দুঃখ, উদ্বেগ এমনকি আত্মসম্মানবোধও কমে যেতে পারে। এই অবস্থাকে অনেকেই ‘স্পোর্টস ফ্যান ডিপ্রেশন’ নামে উল্লেখ করেন।

‘স্পোর্টস ফ্যান ডিপ্রেশন’ কি সত্যিই আছে? ‘স্পোর্টস ফ্যান ডিপ্রেশন’ বলতে সাধারণত প্রিয় দল হারার পর যে দুঃখ, হতাশা বা মন খারাপের অনুভূতি তৈরি হয়, সেই অবস্থাকেই বোঝানো হয়। তবে, এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্বীকৃত কোনো মানসিক রোগ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যানজাইটি অ্যান্ড ডিপ্রেশন অ্যাসোসিয়েশনের মতে, এ অবস্থাকে ‘স্পোর্টস ফ্যান ব্লুজ’ বলা বেশি উপযুক্ত, কারণ বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে এই অনুভূতি কয়েক দিনের মধ্যেই কেটে যায়।

যদি দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে মন খারাপ, হতাশা বা বিষণ্নতার লক্ষণ থাকে এবং তা দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

কেন এত প্রভাব ফেলে? গবেষকদের মতে, এর পেছনে রয়েছে ‘সামাজিক পরিচয় তত্ত্ব’ (Social Identity Theory)। মানুষ যে দল, সংগঠন বা গোষ্ঠীর সঙ্গে নিজেকে যুক্ত মনে করে, সেখান থেকেই নিজের পরিচয়, মর্যাদা ও আত্মসম্মানের একটি অংশ গড়ে ওঠে। খেলার ক্ষেত্রে সেই গোষ্ঠী হলো প্রিয় দল এবং সেই দলের সমর্থকেরা। একজন নিবেদিত সমর্থক সাধারণত নিজের দলের জন্য অনেক সময়, অর্থ ও আবেগ ব্যয় করেন। যেমন— •    দলের জার্সি বা অন্যান্য সামগ্রী কেনেন ও ব্যবহার করেন। •    প্রায় সব ম্যাচই দেখেন, অনেক সময় অন্য সমর্থকদের সঙ্গে। •    দলের বিভিন্ন অনুষ্ঠান বা তহবিল সংগ্রহ কার্যক্রমে অংশ নেন। •    দলের নিজস্ব ভাষা, স্লোগান, কৌতুক ও সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন। এসব কারণে দলের সঙ্গে গভীর আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়, যা ইতিবাচকও হতে পারে।

দল জিতলে অনেক সমর্থক সেটাকে নিজের জয় হিসেবে দেখেন। তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ে, সামাজিক মর্যাদাবোধও শক্তিশালী হয়। অনেকেই বলেন, ‘আমরা জিতেছি।’ মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় বাস্কিং ইন রিফ্লেকটেড গ্লোরি।

অন্যদিকে, দল হারলে অনেকের মনে হয়, যেন নিজেরই পরাজয় হয়েছে। কেউ কেউ তখন দল থেকে নিজেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে নিয়ে বলেন, ‘ওরা হেরেছে’, ‘আমরা হারিনি’। এই প্রবণতাকে বলা হয় ‘কাটিং অব রিফ্লেকটেড ফেইলর’।

হারের কষ্ট সামলাবেন কীভাবে?

আবেগ প্রকাশের জন্য সময় নির্ধারণ করুন প্রিয় দল, বিশেষ করে ফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে হারলে মন খারাপ হওয়া স্বাভাবিক। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ম্যাচ শেষ হওয়ার পর ৪৫ থেকে ৬০ মিনিট সময় নিয়ে অন্য সমর্থকদের সঙ্গে কথা বলুন, হতাশা প্রকাশ করুন, অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করুন। এতে মানসিক চাপ কিছুটা কমতে পারে। অন্য কোনো কাজে মন দেওয়ার চেষ্টা করুন। একা বসে বারবার একই বিষয় ভাবলে বা দীর্ঘ সময় ধরে হতাশায় ডুবে থাকলে কষ্ট আরো বাড়তে পারে।

এ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকেও কিছুটা দূরে থাকা ভালো। ম্যাচ-পরবর্তী বিশ্লেষণ বা মন্তব্যও সীমিতভাবে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনেক মন্তব্য কৃত্রিমভাবে তৈরি বা উসকানিমূলক হতে পারে।

শরীরচর্চা করুন শরীরচর্চা মন ভালো রাখার অন্যতম কার্যকর উপায়। ২০১৮ সালের একটি গবেষণা বলছে, মাত্র ১০ থেকে ৩০ মিনিট ব্যায়াম করলেই মন ভালো হতে পারে এবং শরীরে শক্তিও বাড়ে। এতে ডোপামিনের মাত্রাও বাড়ে। ডোপামিনকে ‘ভালো লাগার হরমোন’ বলা হয়, যা আনন্দ ও উদ্দীপনার অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত।এ জন্য ফুটবল, দৌড়, সাইকেল চালানো, দ্রুত হাঁটা, সাঁতার, পাহাড়ে হাঁটা বা জিমে ব্যায়াম—যে কোনো শারীরিক কর্মকাণ্ডই উপকারী হতে পারে।

মানসিক চাপ কমানোর কাজ করুন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রিয় দল হারলে অনেক সমর্থকের শরীরে কর্টিসল বা স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। এ সময় কিছু কাজ মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। যেমন— •    হাঁটতে বের হওয়া •    গান, পডকাস্ট শোনা বা নাটক দেখা •    বই পড়া •    ছবি আঁকা •    ডায়েরি লেখা •    পাজল সমাধান করা •    শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করা •    যোগব্যায়াম, মেডিটেশন বা মাইন্ডফুলনেস অনুশীলন করা

খেলার বাইরে নতুন শখ গড়ে তুলুন খেলার সমর্থক হওয়া যেমন আনন্দের, তেমনি যদি এটিই নিজের পরিচয়ের একমাত্র উৎস হয়ে যায়, তাহলে পরাজয়ের প্রভাবও বেশি হতে পারে। তাই খেলার বাইরে নতুন কোনো শখ গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। গবেষণায় দেখা গেছে, একাধিক শখ ব্যক্তিগত বিকাশ, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, জীবন নিয়ে সন্তুষ্টি এবং নতুন সামাজিক সম্পর্ক তৈরিতে সহায়তা করে।

নতুন শখ হতে পারে চার ধরনের— •    সৃজনশীল: রান্না, ছবি আঁকা, গান, মৃৎশিল্প, সেলাই, গ্রাফিক ডিজাইন ইত্যাদি। •    বুদ্ধিবৃত্তিক: বই পড়া, লেখা, দাবা, ধাঁধা, কোডিং বা নতুন ভাষা শেখা। •    শারীরিক: বাগান করা, দৌড়, হাঁটা, পাহাড়ে চড়া, সাইকেল চালানো। •    সামাজিক: কোনো ক্লাব বা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া।

মনে রাখুন, ফল আপনার হাতে ছিল না প্রিয় দল হারলে মন খারাপ হওয়া স্বাভাবিক। আমরা যেসব দল বা বিষয়কে ভালোবাসি, সেগুলোর সঙ্গে আবেগ জড়িয়ে যায়। তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—ম্যাচের ফল আপনার নিয়ন্ত্রণে ছিল না। আপনি মাঠে খেলেননি, তাই ম্যাচের ফলাফলেও আপনার কোনো ভূমিকা ছিল না। দলের পারফরম্যান্সে হতাশ হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু সে কারণে নিজের ওপর হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই।

সূত্র: হেলথলাইন