টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর দ্রুত বেড়ে যায়। এতে কাপ্তাই পানিবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন লক্ষ্যণীয়ভাবে বেড়েছে। পানির দীর্ঘকালীন স্বল্পতা কাটিয়ে অবশেষে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটই একযোগে চালু করা হয়েছে।
ভারী বর্ষণের সুবাদে বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বস্তি ফিরলেও রাঙামাটির বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধসের উচ্চঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে পাহাড়ি ঢল ও পাহাড় ধসে বাঘাইছড়িতে একজনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং বেশ কয়েকটি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের সবকটি ইউনিট সচল হওয়ায় বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়ে ১৪৪ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। উৎপাদিত এই বিদ্যুৎ সরাসরি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়ে দেশের চলমান বিদ্যুতের সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
কাপ্তাই পানিবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান বলেন, ‘গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে কাপ্তাই লেকের পানির লেভেল সন্তোষজনক হারে বাড়ছে। পানির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল এই কেন্দ্রের উৎপাদন সচল রাখতে আমরা মঙ্গলবার রাত থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটই একসঙ্গে চালু করতে সক্ষম হয়েছি।’
কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চালু হওয়া পাঁচটি ইউনিট থেকে মোট ১৪৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। এর মধ্যে ১ ও ২ নম্বর ইউনিটের প্রতিটি থেকে ৩২ মেগাওয়াট করে ৬৪ মেগাওয়াট, ৩ নম্বর ইউনিট থেকে ৩০ মেগাওয়াট এবং ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিটের প্রতিটি থেকে ২৫ মেগাওয়াট করে মোট ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।
এদিকে টানা বর্ষণে জেলার সার্বিক দুর্যোগ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। ২০১৭ সালে রাঙামাটিতে ভয়াবহ পাহাড় ধসে সেনাসদস্যসহ ১২০ জন ও ২০১৮ সালে ১১ জনের প্রাণহানির পরও পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মানুষের বসবাস, অব্যাহত পাহাড় কাটা এবং অবৈধ বসতি স্থাপন থামেনি। বর্তমানেও জেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা ও পাহাড়ের পাদদেশে অর্ধলক্ষাধিক মানুষ চরম ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছেন।
পৌর এলাকার শিমুলতলী, রূপনগর, নতুনপাড়া, যুব উন্নয়ন এলাকা, রিজার্ভ বাজার, ভেদভেদি, লোকনাথ মন্দির এলাকাসহ ২৮টি স্থানকে পাহাড়ধসপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস ও পৌরসভাকে সঙ্গে নিয়ে জেলা প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে প্রতিনিয়ত মাইকিং করছে।
তবে ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও অবৈধভাবে বসবাসকারীরা নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র যেতে চাচ্ছেন না, তাঁরা স্থায়ী পুনর্বাসনের দাবি জানাচ্ছেন।
টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে রাঙামাটির লংগদু, বিলাইছড়ি, জুরাছড়িসহ কয়েকটি উপজেলার নিম্নাঞ্চল ইতিমধ্যে প্লাবিত হয়েছে। সম্ভাব্য বড় দুর্যোগ ঠেকাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেন, এবারের টানা বর্ষণে যাতে কোনো প্রাণহানি না ঘটে, সে জন্য সচেতনতামূলক প্রচারণার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় রাঙামাটি পৌর এলাকার ৯টি ওয়ার্ডে ১১টিসহ জেলায় মোট ১০৪টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে ইতিমধ্যে আট শতাধিক মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। এ ছাড়া পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখতে প্রতিটি উপজেলায় মনিটরিং সেল চালু করা হয়েছে।








