আমাদের সমাজে দাম্পত্যজীবনে স্বামীর অধিকার ও মর্যাদা বোঝাতে একটি বাক্য বহুল প্রচলিত—‘স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর জান্নাত বা বেহেশত’। অনেক বক্তা কিংবা লেখক এটিকে সরাসরি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী বা হাদিস হিসেবেও উপস্থাপন করে থাকেন। যার আরবি হিসেবে বলা হয়—‘আল-জান্নাতু তাহতা আকদামিল আজওয়াজ’ (الْجَنَّةُ تَحْتَ أَقْدَامِ الأَزْوَاجِ)।
কিন্তু আসলেই কি ইসলামে এই কথার কোনো ভিত্তি আছে? এটি কি আসলেই হাদিস? পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে এই বিষয়ে সঠিক তথ্য জানা প্রতিটি মুসলিমের জন্য জরুরি।
ইসলামি শরিয়তের বিশুদ্ধ সূত্র ও হাদিস বিশারদদের মতে, ‘স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর জান্নাত’—হুবহু এই শব্দ বা বাক্যে রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে কোনো হাদিস বর্ণিত হয়নি। সুতরাং, এই বাক্যকে আল্লাহর রাসুলের বাণী বা হাদিস হিসেবে চালিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ ভুল ও অনুচিত।
তবে ইসলামে স্ত্রীর কাছে স্বামীর মর্যাদা ও গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে যে সমস্ত সহিহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে, এটি সেগুলোর একটি ভাবার্থ বা মর্মার্থ মাত্র।
হুবহু ওই বাক্য হাদিস না হলেও সহিহ হাদিসের কিতাবগুলোতে স্বামীকে স্ত্রীর জন্য ‘জান্নাত বা জাহান্নাম’ হিসেবে উপমা দেওয়া হয়েছে।
মুআত্তা মালেক, মুসনাদে আহমাদ ও মুসতাদরাকে হাকেমসহ হাদিসের বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে: একবার এক নারী সাহাবি নিজের কোনো প্রয়োজনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এলেন। কথা শেষে বিদায় নেওয়ার সময় নবীজি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার কি স্বামী আছে?’ তিনি বললেন, ‘জি, আছে।’ নবীজি বললেন, ‘তার সঙ্গে তোমার আচরণ কেমন?’ তিনি বললেন, ‘আমি সাধ্যানুযায়ী তাঁর আনুগত্য ও খেদমতে কোনো কমতি বা অবহেলা করি না—যা আমার সাধ্যের বাইরে, তা বাদে।’ তখন নবীজি (সা.) বললেন, ‘হ্যাঁ, তার সঙ্গে তোমার আচরণের বিষয়ে সজাগ থাকো; কারণ, সে-ই তোমার জান্নাত এবং তোমার জাহান্নাম।’ (মুআত্তা মালেক, হাদিস: ৯; মুসনাদে আহমাদ, ৪/৩৪১, হাদিস: ১৯০০৩; মুসতাদরাকে হাকেম: ২৭৬৯)
অর্থাৎ, স্বামীর সন্তুষ্টির মাধ্যমে স্ত্রীর জান্নাত লাভ সহজ হয় আর স্বামীর অবাধ্যতা ও অসন্তুষ্টির কারণে তাঁকে জাহান্নামে যেতে হতে পারে।
ইসলাম কেবল স্ত্রীদেরই স্বামীর আনুগত্য করতে বলেনি, বরং স্বামীদের ওপরও স্ত্রীর প্রতি সদয় আচরণ ও তাঁদের হক আদায়ের ব্যাপারে কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘আর স্বামীদের যেমন তাদের (স্ত্রীদের) ওপর ন্যায়সংগত হক রয়েছে, তেমনি তাদেরও (স্ত্রীদেরও) হক রয়েছে স্বামীদের ওপর।’ (সুরা বাকারা: ২২৮)
এমনকি বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণেও বিশ্বনবী (সা.) পুরুষদের সতর্ক করে বলেছেন, ‘তোমরা নারীদের বিষয়ে আল্লাহকে ভয় করো।’ (সহিহ মুসলিম: ১২১৮)








