শামস তাবরিজির একটি প্রসিদ্ধ উক্তি আছে, ‘শেখার জন্য তুমি পড়াশোনা করো, কিন্তু বুঝতে হলে তোমার প্রয়োজন ভালোবাসা।’

অর্থাৎ মানুষ বই পড়ে তথ্য অর্জন করতে পারে, যুক্তি দিয়ে তর্ক জিততে পারে, গবেষণার মাধ্যমে নতুন নতুন জ্ঞান আবিষ্কার করতে পারে। কিন্তু মানুষের অন্তর, তার বেদনা, তার প্রেম, তার আত্মিক অভিযাত্রা—এসব কেবল জ্ঞানের মাধ্যমে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। সেখানে প্রয়োজন ভালোবাসার। আর এই সত্যটিই সবচেয়ে উজ্জ্বলভাবে প্রতিফলিত হয়েছে শামস তাবরিজি ও মাওলানা জালালুদ্দিন রুমির সম্পর্কের মধ্যে।

রুমির জীবনকে সাধারণভাবে দুই ভাগে ভাগ করা যায়—শামসের সঙ্গে সাক্ষাতের আগের রুমি এবং শামসের সঙ্গে সাক্ষাতের পরের রুমি। প্রথম রুমি ছিলেন একজন খ্যাতিমান আলেম, ফকিহ, শিক্ষক ও বক্তা। তিনি ইসলামের বহুবিধ শাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন। কিন্তু শামসের সঙ্গে সাক্ষাতের পর সেই রুমি যেন অন্য এক মানুষ হয়ে ওঠেন। তার ভাষা বদলে যায়, তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়, এমনকি তার সাহিত্যও নতুন প্রাণ পায়। এই পরিবর্তনের মূল কারণ ছিল কেবল নতুন কোনো জ্ঞান অর্জন নয়; বরং একজন মানুষের ভালোবাসা, সাহচর্য এবং আত্মিক স্পর্শ।

শামস তাবরিজির জীবন ছিল রহস্যময়। ইতিহাসে তার পরিচয় যতটা পাওয়া যায়, তার চেয়ে বেশি পাওয়া যায় কিংবদন্তিতে। তাকে বলা হতো ‘পারিন্দা’—অর্থাৎ পাখি। কারণ তিনি কখনো এক জায়গায় স্থির থাকতেন না। তিনি সম্পদের মোহ, সামাজিক প্রতিষ্ঠা কিংবা ক্ষমতার প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন না। তার জীবন ছিল এক অবিরাম যাত্রা—সত্যের সন্ধানে, মানুষের অন্তর জাগানোর প্রয়াসে। 

প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, শামস প্রথম যখন রুমিকে দেখেন, তখন রুমির বয়স ছিল কম। তিনি রুমির মধ্যে অসাধারণ সম্ভাবনা উপলব্ধি করেছিলেন। কিন্তু তিনি জানতেন, প্রতিভা আর পরিপক্বতা এক জিনিস নয়। তাই তিনি অপেক্ষা করেছিলেন। বহু বছর পর, যখন রুমির বয়স চল্লিশের কাছাকাছি, তখন আবার তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। এই সাক্ষাৎ শুধু দুইজন মানুষের দেখা হওয়া নয়; যেন দুটি নদীর মিলন।

শোনা যায়, তাদের দীর্ঘ আলাপচারিতা চলেছিল দিনের পর দিন। সেই আলোচনার বিষয় ছিল কেবল ধর্মতত্ত্ব নয়; ছিল মানুষ, জীবন, মৃত্যু, প্রেম, আত্মা এবং আল্লাহর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। রুমি বুঝতে শুরু করলেন, কেবল শরিয়তের বিধান জানা যথেষ্ট নয়; সেই বিধানের আত্মাও উপলব্ধি করতে হয়। জ্ঞান যদি হৃদয়কে স্পর্শ না করে, তবে তা কেবল তথ্য হয়ে থাকে; প্রজ্ঞা হয়ে ওঠে না।

আরও পড়ুন

ইবরাহীম আলী তশনা (রহ.), মরমি কবি ও প্রখ্যাত আলেম

এই সম্পর্ক সমাজ সহজভাবে গ্রহণ করেনি। কারণ শামস ছিলেন প্রতিষ্ঠানের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা এক মানুষ, আর রুমি ছিলেন সমাজের সম্মানিত আলেম। মানুষ ভাবল, শামস রুমিকে বিভ্রান্ত করছেন। তাদের বন্ধুত্বকে সন্দেহের চোখে দেখা হলো। এমনকি বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়, পরিস্থিতি সামাল দিতে রুমি তার সৎকন্যা কিমিয়ার সঙ্গে শামসের বিয়ে দেন, যাতে সমাজের দৃষ্টিতে তার অবস্থান কিছুটা গ্রহণযোগ্য হয়। কিন্তু নিয়তি যেন অন্য গল্প লিখে রেখেছিল। কিমিয়ার অকালমৃত্যু এবং পরবর্তীকালে শামসের রহস্যময় অন্তর্ধান কিংবা হত্যার ঘটনা রুমির জীবনে এক গভীর শূন্যতা তৈরি করে।

এই শূন্যতাই পরবর্তীকালে রুমির সৃষ্টিশীলতার সবচেয়ে বড় উৎস হয়ে ওঠে। প্রিয় মানুষকে হারানোর বেদনা তাকে ভেঙে দেয়নি; বরং তাকে নতুন করে নির্মাণ করেছে। তিনি লিখলেন দেওয়ানে শামস তাবরিজি—যেখানে প্রতিটি কবিতা যেন হারিয়ে যাওয়া বন্ধুর উদ্দেশে লেখা একেকটি দীর্ঘ চিঠি। সেখানে শামস কেবল একজন মানুষ নন; তিনি হয়ে ওঠেন প্রেমের প্রতীক, সত্যের প্রতীক, আলোর প্রতীক।

রুমি এক জায়গায় লিখেছেন—

‘আমি কেন তাকে খুঁজব?

সে আর আমি তো একই।

তার অস্তিত্ব আমার মাঝে বিরাজ করে।

আমি নিজেকেই খুঁজছি।’

এই উপলব্ধি আসলে বাহ্যিক বিচ্ছেদ অতিক্রম করে অন্তরের মিলনের কথা বলে। একজন শিক্ষক যখন সত্যিকার অর্থে তার শিষ্যের ভেতর বেঁচে থাকেন, তখন তার শারীরিক উপস্থিতি আর প্রয়োজন হয় না। তার শিক্ষা, তার চরিত্র, তার ভালোবাসাই হয়ে ওঠে তার স্থায়ী অস্তিত্ব।

তবে শামস তাবরিজি এবং রুমিকে ঘিরে আলোচনা করতে গেলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও সামনে আসে। তাদের সঙ্গে সুফিবাদের সম্পর্ক এবং ইসলামের মূলধারার আকিদার সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। সুফিবাদের মূল শক্তি হলো আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত হওয়ার সাধনা। ইসলামের ইতিহাসে বহু মহান আলেম ও বুযুর্গ—যেমন আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.), মুজাদ্দিদে আলফে সানি (রহ.), বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রহ.)—শরিয়তের পূর্ণ অনুসরণের পাশাপাশি আধ্যাত্মিক জীবনকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। তাদের কাছে শরিয়ত ও আত্মশুদ্ধি ছিল পরস্পরের পরিপূরক।

আরও পড়ুন

বায়েজিদ বোস্তামি: আত্মবিলয়ের সন্ধানে এক মহাসাধকের জীবন

অন্যদিকে, ইতিহাসে এমন কিছু সুফি চিন্তাধারাও গড়ে উঠেছে, যেখানে প্রেম ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যা কখনো কখনো ইসলামের মূল আকিদার সঙ্গে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষত ‘ওয়াহদাতুল ওজুদ’-এর কিছু ব্যাখ্যা কিংবা শরিয়তের বাহ্যিক বিধানকে গৌণ করে দেখার প্রবণতা বহু ইসলামি চিন্তাবিদের সমালোচনার মুখে পড়েছে। ইসলামি আকিদার দৃষ্টিতে আল্লাহ ও বান্দার সম্পর্ক স্পষ্টভাবে নির্ধারিত; বান্দা কখনো আল্লাহর অংশ হয়ে যায় না, কিংবা শরিয়তের বিধান অতিক্রম করার সুযোগও নেই। কোরআন ও সুন্নাহই মুসলমানের জন্য একমাত্র নির্ভরযোগ্য পথনির্দেশ।

এ কারণে শামস বা রুমির সাহিত্য পাঠের ক্ষেত্রেও ভারসাম্য প্রয়োজন। তাদের কবিতা ও রচনাকে আধ্যাত্মিক সাহিত্য হিসেবে মূল্যায়ন করা যেতে পারে, কিন্তু ধর্মীয় আকিদা নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনাই মুসলমানের জন্য চূড়ান্ত মানদণ্ড। সাহিত্য হৃদয়কে আন্দোলিত করতে পারে, কিন্তু আকিদার ভিত্তি হতে পারে না।

তবুও শামস তাবরিজির জীবনের একটি শিক্ষা আজও বিস্ময়করভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি মানুষকে শিখিয়েছেন, অহংকার জ্ঞানের সবচেয়ে বড় শত্রু। যে মানুষ মনে করে যে, সে সব জেনে গেছে, তার শেখা বন্ধ হয়ে যায়। আর যে মানুষ ভালোবাসতে শেখে, সে প্রতিদিন নতুন করে জানতে শেখে। কারণ ভালোবাসা মানুষকে বিনয়ী করে, অন্যের কথা শুনতে শেখায়, নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করতে শেখায়।

আজকের পৃথিবীতে তথ্যের অভাব নেই। একটি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে মুহূর্তেই কোটি কোটি তথ্য হাতের মুঠোয় চলে আসে। কিন্তু তথ্যের এই প্রাচুর্য মানুষের হৃদয়কে সব সময় সমৃদ্ধ করে না। আমরা আগের চেয়ে বেশি জানি, কিন্তু হয়তো আগের চেয়ে কম বুঝি। কারণ বোঝার জন্য কেবল মেধা নয়, দরকার হৃদয়ের উন্মুক্ততা। দরকার মানুষের প্রতি সহানুভূতি, দরকার সত্যের প্রতি বিনয়, দরকার ভালোবাসা।

এই কারণেই শামসের সেই উক্তি আজও সময়কে অতিক্রম করে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে—‘শেখার জন্য তুমি পড়াশোনা করো, কিন্তু বুঝতে হলে তোমার প্রয়োজন ভালোবাসা।’ এখানে ভালোবাসা মানে অন্ধ আবেগ নয়; বরং সত্যকে গ্রহণ করার আন্তরিকতা, মানুষের প্রতি মমত্ব, স্রষ্টার প্রতি আনুগত্য এবং নিজের অহংকারকে অতিক্রম করার সাহস।

রুমি তার শিক্ষককে হারিয়েছিলেন, কিন্তু তার আলো হারাননি। কারণ প্রকৃত শিক্ষক কখনো কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি একটি চেতনা। আর প্রকৃত জ্ঞান কখনো কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; তা মানুষের চরিত্রে, আচরণে এবং জীবনবোধে প্রকাশিত হয়। শামস তাবরিজি তাই আজও জীবিত—তার ব্যক্তিগত জীবনের রহস্যে নয়, বরং সেই প্রশ্নে, যা তিনি মানুষের সামনে রেখে গেছেন, তুমি কি শুধু জানো, নাকি সত্যিই বোঝো?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই হয়তো আমরা উপলব্ধি করি—জ্ঞান মানুষকে আলোকিত করে, কিন্তু ভালোবাসা সেই আলোকে অর্থপূর্ণ করে তোলে। আর যখন জ্ঞান, বিনয়, শরিয়তের আনুগত্য ও হৃদয়ের পবিত্রতা একত্রিত হয়, তখনই মানুষের আত্মিক যাত্রা পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যায়।

আরও পড়ুন

ইবনে খাল্লিকান ও তার অমর গ্রন্থ ওফায়াতুল-আ’য়ান

ওএফএফ