জিয়াউদ্দিন লিটন
কবিতা মানুষের অন্তর্জগতের সবচেয়ে সূক্ষ্ম ভাষা। মানুষের ভেতরে জমে থাকা আনন্দ, বেদনা, আকাঙ্ক্ষা, অভিমান, প্রেম-বিচ্ছেদ, স্বপ্ন, হতাশা কিংবা অস্তিত্বের গভীর প্রশ্নগুলো যখন শব্দের শরীরের রূপ দেয়; তখন তা আর শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ থাকে না। হয়ে ওঠে সময় ও সমাজের এক নীরব দলিল। একজন কবি কেবল নিজের কথা বলেন না, নিজের অনুভবের ভেতর দিয়ে তিনি তার সময়কে দেখেন, মানুষকে দেখেন, মানুষের অদৃশ্য ক্ষতগুলোকে অনুভব করেন। তাই একজন কবির কবিতা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসে বৃহত্তর মানবিক ও অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে যায়।
মাহফুল আখতারের কাব্যগ্রন্থ ‘চুল জুড়ে ঘাসফুল থাক’ পাঠ করলে এমন এক কবিসত্তার সঙ্গে পরিচয় ঘটে; যিনি প্রেম, বেদনা, স্মৃতি, নিঃসঙ্গতা, সামাজিক বৈষম্য, নারী-অস্তিত্ব এবং এবং মানুষের হারিয়ে যাওয়া মানবিকতার অনুসন্ধান করেছেন। তার সৃজনকৃত এ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোতে একদিকে যেমন আছে ব্যক্তিগত অনুভূতির কোমলতা; অন্যদিকে আছে সমকালীন জীবনের কঠিন বাস্তবতা। কবি শুধু সৌন্দর্যের ছবি আঁকেননি। তিনি খুঁজেছেন সেই সৌন্দর্যের আলোয় লুকিয়ে থাকা ক্ষত, মানুষের ভেতরের শূন্যতা এবং ভালোবাসার জন্য এক গভীর আকাঙ্ক্ষা।
২০২৫ সালে আরশি প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত কবি মাহফুল আখতারের ‘চুল জুড়ে ঘাসফুল থাক’ কাব্যগ্রন্থের নামটিই একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ঘাসফুল কোনো অভিজাত ফুল নয়; কোনো রাজকীয় সৌন্দর্যের প্রতীকও নয়। এটি সাধারণ, অবহেলিত, পথের ধারে জন্ম নেওয়া এক ছোট্ট ফুল। অথচ এই সাধারণ ফুলের মধ্যেই প্রকৃতির নির্মলতা ও স্বাভাবিক সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে। কবি যেন এই নামের মধ্য দিয়েই জানিয়ে দেন—জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য কৃত্রিম সাজে নয় বরং সহজ, স্বাভাবিক এবং মানবিক অনুভূতির মধ্যে। যে সৌন্দর্য নিঃশব্দে জন্ম নেয়, কিন্তু মানুষের জীবনকে গভীরভাবে স্পর্শ করে।
মাহফুল আখতারের কবিতায় প্রেম কখনো শুধু আনন্দের বিষয় নয়। তার প্রেমের ভেতরে রয়েছে অপেক্ষা, না-পাওয়া, অভিমান, স্মৃতি এবং দীর্ঘদিনের জমে থাকা এক ধরনের বিষণ্নতা। আধুনিক মানুষের সম্পর্কের ভেতরে যে অনিশ্চয়তা, দূরত্ব এবং নীরব কষ্ট তৈরি হয়েছে, কবি তা খুব কাছ থেকে অনুভব করেছেন। ‘প্রত্যাবর্তনের চুমু’ কবিতায় তিনি লিখেছেন—
‘প্রত্যাবর্তনের প্রগাঢ় চুমুতে এখনো পুরনো অসুখ লুকিয়ে প্রাচীন অবজ্ঞা জ্বরে।
মৌন সাঁঝের দুঃখ গানে দেখো বিরহী কোকিলের কণ্ঠে রক্ত ঝরে।
ফেসবুকপ্রেমীরা যখন লেপ্টে থাকে মাখন ঘুমে,
বিকীর্ণ কথারা আমার উড়ে যায় জামরুল ও আমের শাখায়।’
এ পঙক্তিগুলোর মধ্যে ফিরে আসার আনন্দের চেয়ে পুরোনো ক্ষতের উপস্থিতিই বেশি প্রবল। মানুষের জীবনে কিছু অভিজ্ঞতা থাকে, যা সময়ের সঙ্গে দূরে সরে গেলেও মুছে যায় না। সম্পর্কের পুনরাগমন অনেক সময় পুরোনো স্মৃতির দরজা খুলে দেয়। তাই প্রত্যাবর্তনও এখানে সম্পূর্ণ মুক্তি নয় বরং অতীতের সঙ্গে বর্তমানের এক নীরব সংঘাত।
আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সম্পর্কের একটি শূন্যতাও কবি অনুভব করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের যোগাযোগ বাড়িয়েছে, কিন্তু সব সময় হৃদয়ের দূরত্ব কমাতে পারেনি। অনেক সম্পর্ক শব্দের ভিড়ে থেকেও অনুভূতির দারিদ্র্যে ভুগছে। কবির এই উপলব্ধি তাকে সমকালীন জীবনের একজন সচেতন পর্যবেক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
আরও পড়ুন
বই আলোচনা / অকায়শাস্ত্র: আপন সত্তার অনুভূতি
মাহফুল আখতারের কবিতার একটি বড় শক্তি হলো প্রকৃতির ব্যবহার। তবে তার কবিতায় প্রকৃতি শুধু সৌন্দর্যের অলংকার নয়; প্রকৃতি মানুষের অনুভূতির সঙ্গে মিশে আছে। নদী, ফুল, চাঁদ, বৃষ্টি, আকাশ—এসব উপাদান কবির কাছে মানুষের মনের প্রতিচ্ছবি। ‘অভিবাসী চুলে’ কবিতায় প্রকৃতি ও নারীর অনুভূতি একাকার হয়ে উঠেছে—
‘কপালের উপরে ম্রিয়মান টিপের মতো আকাশের কোণে একটা চকমকি তারা
গন্ধরাজ বিকেলের সুঘ্রাণে শরৎ মেঘের খুনসুটি বৃষ্টি জল ভিজায় প্রণয় অঞ্চল।
বেদে নৌকোয় কিশোরী মন খোঁজে হৃদয় পোতাশ্রয়
নোঙর জলের খলে ডাঙায় ডাঙায় তার অভিবাসী চুলে শীত রোদ ছুঁয়ে।’
এখানে প্রকৃতি শুধু দৃশ্য নয়, অনুভূতির ভাষা। আকাশের তারা, শরতের মেঘ, বৃষ্টির জল—সবকিছু যেন মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে।
কিন্তু কবি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যে থেমে থাকেননি। তিনি নারীর সামাজিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন—
‘প্রতারণার চিরুনীতে যে পুরুষ সাজায় তোমার বেলীফুল মালার বিনুনি;
খুলে ফেলে সে ফুল দলে যাও পায়ে—
ভালোবাসার নামে শৃঙ্খল কেন পড়া পায়?’
এ প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে ভালোবাসার প্রচলিত ধারণার ভেতরের এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ ও অধিকারবোধকে কবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। ভালোবাসা যদি স্বাধীনতা কেড়ে নেয়, যদি তা মানুষকে বন্দি করে। তবে সেই ভালোবাসার প্রকৃতি নিয়েই প্রশ্ন থেকে যায়।
মাহফুল আখতারের কবিতায় নারী কেবল প্রেমের চরিত্র নয়; নারী একটি স্বতন্ত্র মানবিক সত্তা। ‘আমাকে ছুঁয়ে থাক মেয়ে’ কবিতায় যে স্পর্শের ভাষা এসেছে, তা মূলত মমতা, নিরাপত্তা ও আশ্রয়ের ভাষা।
‘আমাকে ছুঁয়ে দেখ মেয়ে আমাকে ছুঁয়ে দেখ মেয়ে তুই।
এ হাতে ঠান্ডা নরম স্নেহ ভালোবাসায় ভরা বুক।
আমাকে ছুঁয়ে থাক মেয়ে আমাকে ছুঁয়ে থাক তুই!
তোকে নিয়ে দেখ কতো যে নিঠুর হল্লা চিল্লা নিতুই।’
এ কবিতায় কবি নারীকে কোনো দুর্বল সত্তা হিসেবে দেখেননি বরং সমাজের নিষ্ঠুরতা ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে একটি নিরাপদ মানবিক সম্পর্কের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন।
আরও বলেন—
‘মেয়ে তুই নষ্ট সুতো ছেড়ে দে ভেঙে দিই কামুক বাতাসের দুল।
আমাকে ছুঁতে থাক মেয়ে আমাকেই ছুঁয়ে থাক তুই।
নখের আঁচড় মুছে ফেল মেয়ে কেটে দিই পিশাচের আনন্দ হুল।’
এ উচ্চারণের মধ্যে আছে প্রতিবাদ। নারীকে ভোগের বস্তু হিসেবে দেখার প্রবণতার বিরুদ্ধে কবির অবস্থান স্পষ্ট। তিনি ভালোবাসার মধ্যে সম্মান ও নিরাপত্তার উপস্থিতি দেখতে চান।
আধুনিক নগরজীবনের বিচ্ছিন্নতা ও কৃত্রিমতা ‘নাগরিক ক্যামোফেজ’ কবিতায় বিশেষভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ক্যামোফেজ মানে ছদ্মবেশ। আধুনিক মানুষও যেন নিজের প্রকৃত অনুভূতি লুকিয়ে নানা সামাজিক মুখোশ পরে বেঁচে আছে। কবি লিখেছেন—
‘পাতার ওড়না পরে নাও মেয়ে পানের বরজে অন্ধকার...।
বোহেমিয়ান যন্ত্রণায় আতঙ্ক আশ্রয় অন্ধকারে মানুষ বাঁচে
বাঁচে কীটপতঙ্গ বাদামী জ্বরে মরে যায় ঘাসফুল!
বকুল বিকেল তুলে আনো মেয়ে-সান্ধ্যচুলে বিলি কাটুক বরজের ফুল।’
এ কবিতায় প্রকৃতির কোমলতা এবং মানুষের অস্তিত্ব সংকট পাশাপাশি এসেছে। আধুনিক সভ্যতা যত এগিয়েছে, মানুষের ভেতরের একাকিত্বও যেন তত বেড়েছে। মানুষ বেঁচে আছে কিন্তু সেই বেঁচে থাকার মধ্যে অনেক সময় প্রাণের উচ্ছ্বাস নেই।
বই আলোচনা / প্যাকেজিং ইতিহাস ও ডিজাইন তত্ত্ব: মোড়কের আড়ালে সভ্যতার গল্প
আবার ‘শ্যামের বাঁশি বাজে না’ কবিতায় প্রেমের গভীরতা এবং তার অসম্পূর্ণতার এক চমৎকার প্রকাশ দেখা যায়—
‘বিস্মৃতির আড়ালে কাঁদে আখ্যান; মূলত ভুলে যাওয়া যতটা কঠিন
মনে রাখা ততটা নয়।
পথ চলতে দৃষ্টি বিনিময়ে অযাচিত কথনে
বৃথা শব্দচয় ভালোবাসার অলৌকিক সম্পদ নয়।’
এখানে কবি বুঝিয়েছেন, ভালোবাসা শুধু আকর্ষণ বা কথার বিষয় নয়। ভালোবাসার জন্য প্রয়োজন গভীর অনুভব, বিশ্বাস এবং আত্মিক সংযোগ।
তিনি আরও লিখেছেন—
‘ভালোবাসা! ঠুনকো কাঁচের চুড়ি নয়
সে চুড়িতেই বাজে যাতনা সুর।
রাতভর রাধার আলিঙ্গন থাকলেও
শ্যামের বাঁশি বাজে না।’
এ পঙক্তিতে প্রেমের এক গভীর বিষণ্ন দর্শন রয়েছে। বাহ্যিক নৈকট্য থাকলেও হৃদয়ের দূরত্ব থেকে যেতে পারে।
মাহফুল আখতারের ভাষা মুক্তছন্দনির্ভর। তিনি প্রচলিত ছন্দের কাঠামোর চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন অনুভূতির স্বাভাবিক প্রবাহকে। তার কবিতায় প্রকৃতি, প্রযুক্তি, পুরাণ, ধর্মীয় প্রতীক এবং আধুনিক জীবনবোধ একসঙ্গে কাজ করেছে। ‘চুল জুড়ে ঘাসফুল থাক’ কবিতায় তিনি লিখেছেন—
‘তুমি আর আমি তড়িৎ প্রবাহের মত একজন ঋণাত্মক অন্যজন ধনাত্মক
তবুও যখন কথা হয় সব্যসাচীর মত লোকে শুনে ভাবে জরুরি অফিস বার্তা কোনো।
আসলে আঁধারের একটা আধান থাকে
নিকষ কালোটাই তার চার্জিত আলো।’
এ উপমা আধুনিক প্রেমের এক অভিনব ব্যাখ্যা তৈরি করেছে। এখানে প্রেমকে শক্তি ও আকর্ষণের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। দুই বিপরীত সত্তার মধ্যেও যে গভীর টান থাকে, কবি সেই সত্যটিই তুলে ধরেছেন।
‘নফলের নামে ফরজ কামাই’ কবিতায় কবি ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার করে মানুষের নৈতিক সংকটকে সামনে এনেছেন—
‘কে আর বলো সৃজনের নামে লালনের নিঃশব্দ দ্রাঘিমায় জেগে থাকে!
কে চায় বলো—
ফজরের মতো প্রেমাতুর আকুতি ছাপিয়ে তাহাজ্জুদে বসে কাঁদতে?
কজন করে আর নফলের নামে ফরজ কামাই-!’
এখানে কবি বাহ্যিক আচরণের চেয়ে অন্তরের সত্যতাকে বড় করে দেখেছেন। মানুষের সবচেয়ে বড় ধর্ম মানবিকতা—এই বোধ তার কবিতার ভেতরে গভীরভাবে কাজ করেছে।
মাহফুল আখতারের কবিতার বড় বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি সৌন্দর্য ও ক্ষতকে পাশাপাশি স্থাপন করেন। তার কবিতায় যেমন আছে ফুল, চাঁদ, নদী ও প্রকৃতির কোমলতা, তেমনি আছে সময়ের নির্মমতা, মানুষের একাকিত্ব এবং সম্পর্কের ভাঙন। তিনি সরাসরি বক্তব্যের কবি নন বরং প্রতীক, চিত্রকল্প ও অনুভূতির স্তরের মাধ্যমে কথা বলেন। তার কবিতায় নদী, ফুল, নারী, স্মৃতি, অন্ধকার—সবকিছু একটি বৃহত্তর মানবিক অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুন
বই আলোচনা / অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী: নারীবাদের দ্বন্দ্বময় সংলাপ
‘চুল জুড়ে ঘাসফুল থাক’ আধুনিক বাংলা কবিতার ধারায় একটি সংবেদনশীল ও ভাবনামূলক কাব্যগ্রন্থ। মাহফুল আখতার প্রেমকে শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; তিনি তাকে মানবিকতা, সমাজ এবং অস্তিত্বের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তার কবিতায় বিষণ্নতা আছে, কিন্তু হতাশা নেই। বিচ্ছেদ আছে, কিন্তু ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা শেষ হয়ে যায়নি। অন্ধকার আছে, কিন্তু সেই অন্ধকারের ভেতরেও আলো খোঁজার চেষ্টা আছে।
এ কাব্যগ্রন্থের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো—এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য কৃত্রিম সাজে নয়; বরং সেই ছোট্ট ঘাসফুলের মতো অনুভূতিতে, যা নিঃশব্দে জন্ম নেয়, কিন্তু মানুষের জীবনকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। তাই ‘চুল জুড়ে ঘাসফুল থাক’ শুধু একটি কাব্যগ্রন্থের নাম নয়; এটি মানুষের সহজ, নির্মল ও মানবিক জীবনের এক গভীর কাব্যিক আকাঙ্ক্ষা।
লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও কাব্য আলোচক।
এসইউ








