ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের ফারসি বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, প্রার্থীর যোগ্যতা এবং একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযোগকে ঘিরে নানা প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশ। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের ফারসি বিভাগে বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ পদে আবেদন করেছেন আল জামিয়া আল মুস্তাফা ইউনিভার্সিটির অন্যতম পরিচালক ড. মাঈন উদ্দিন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। পাশাপাশি ইরানের কোমে ধর্মীয় শাস্ত্রে পড়াশোনা করলেও ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে তার উল্লেখযোগ্য কোনো একাডেমিক ডিগ্রি নেই বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

সংশ্লিষ্ট একটি পক্ষের অভিযোগ, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করা আল মুস্তাফা ইউনিভার্সিটির একটি শাখার বিরুদ্ধে অতীতে নানা অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে ড. সামিউল হক সরকার নামে এক ব্যক্তি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) কাছে একটি উকিল নোটিশ পাঠান।

ইউজিসিতে দেওয়া অভিযোগে ড. সামিউল হক সরকার দাবি করেন, তিনি ২০১৯ সালে ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে এর বাংলাদেশ শাখায় খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। পরে তিনি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন অসংগতি দেখতে পান বলে অভিযোগ করেন। তার অভিযোগে নারী শিক্ষার্থী পাচারসহ আরো কিছু গুরুতর বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ড. মাঈন উদ্দিন। তিনি বলেন, “এসব আজেবাজে কথা। আমরা ২০০৮-০৯ সাল থেকে এখানে আছি। এ ধরনের কোনো ঘটনাই নেই।”

শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়ে তিনি বলেন, “আমি ইরানে নয় মাসের ফারসি ভাষার কোর্স করেছি। ৪০টিরও বেশি বই অনুবাদ করেছি এবং বহু গবেষণাপত্র লিখেছি। আমার যোগ্যতার কোনো ঘাটতি নেই।” তিনি ভাষা ও সাহিত্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে অনুবাদ কাজ করার কথাও জানান।

এদিকে অভিযোগ রয়েছে, ড. মাঈন উদ্দিনকে নিয়োগ দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে বিশেষ সুপারিশপত্র পাঠিয়েছেন। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অধ্যাপক আবু মুসা মোহাম্মদ আরিফ বিল্লাহর খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন গ্রহণে অনীহা দেখানো হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মুমিত আল রশিদ বলেন, “দেশের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ থেকে মেধাবী শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা নিয়ে বের হচ্ছেন। তাদের অনেকেই দেশ-বিদেশ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি ও গবেষণার অভিজ্ঞতা অর্জন করেও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন না।”

তিনি বলেন, “ফারসি ভাষা ও সাহিত্য সংশ্লিষ্ট খণ্ডকালীন কিংবা পূর্ণকালীন শিক্ষক নিয়োগে এ বিষয়ের যোগ্য শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। বিশেষ করে ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।”

তিনি আরো বলেন, “এর ব্যতিক্রম হলে এ বিভাগের শিক্ষার্থীরা আরো হতাশ হয়ে পড়বেন এবং শিক্ষক হিসেবে আমাদেরও শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে।”

একই পদে আবেদনকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ও উর্দু ভাষা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু মুসা মোহাম্মদ আরিফ বিল্লাহ অভিযোগ করেন, আগের প্রশাসনের সময়ও তাকে নিয়োগ থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। পরে তৎকালীন উপাচার্যের হস্তক্ষেপে তার যোগ্যতার ভিত্তিতে ছয় মাসের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, “বর্তমানে আমার নিয়োগের মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে না। আগের সেই চক্র আবার সক্রিয় হয়েছে বলে আমার মনে হচ্ছে। আমি আশা করি, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষ আমার দেশ-বিদেশে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়ন করে ফারসি বিভাগকে শক্তিশালী করার সুযোগ দেবেন। উপাচার্য পরিবর্তনের সঙ্গে ভাগ্য পরিবর্তনের এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা দরকার।”

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক আবছার কামাল বলেন, “আবেদন তো যে কেউই করতে পারেন। কাউকে আবেদন করতে বাধা দেওয়ার সুযোগ নেই। অভিযোগগুলোর বিষয় আমরা খতিয়ে দেখব।”

ড. আবু মুসা মোহাম্মদ আরিফ বিল্লাহর অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “তিনি ওভারকোয়ালিফায়েড। তাকে দিয়ে আরো উচ্চতর পর্যায়ের কোর্স পড়ানো উচিত বলে আমি মনে করি।”