দেশের চলচ্চিত্রের আঁতুড়ঘর বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনে (এফডিসি) প্রায় প্রতিদিন শিল্পী, পরিচালক, প্রযোজক, কলাকুশলী ও বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরা কাজ ছাড়াও আসা–যাওয়া করে থাকেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই এই এফডিসিতে অবাধে বহিরাগত প্রবেশ নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। এতে একদিকে যেমন শিল্পীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন হচ্ছে, চুরির ঘটনা ঘটছে, তেমনি অন্যদিকে বাড়ছে নিরাপত্তাঝুঁকি।
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির (বাচশিস) নির্বাচন ঘিরে সম্প্রতি বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা রহমান জানান, বহিরাগত ব্যক্তিদের অবাধ প্রবেশের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে এবং এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট সমিতির কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। দ্রুতই এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

এ বছরের মে মাসেও এফডিসির ডাবিং রুম থেকে চিত্রনায়িকা তানহা তাসনিয়ার মুঠোফোন চুরির ঘটনায় এফডিসির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।
সরেজমিন দেখা গেছে, চুরির ঘটনার পরও এফডিসির প্রবেশ ও নিরাপত্তায় কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি। চুরির দুই দিন পর এফডিসির প্রধান ফটকে গিয়ে দেখা যায়, কে ঢুকছেন, কে বের হচ্ছেন—তা নিয়ে নিরাপত্তাকর্মীদের মধ্যে বাড়তি কোনো সতর্কতাই নেই। দর্শনার্থীদের নাম নিবন্ধনের ব্যবস্থা নেই, পরিচয়পত্র যাচাইয়েরও বালাই নেই। শুটিংয়ের কথা বললে যাচাই না করেই প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
এফডিসি কেপিআইভুক্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান, অথচ এখানে প্রবেশে কার্যকর কোনো নীতিমালাই নেই। এ কারণে যে কেউ সহজেই আসা-যাওয়া করছেন। এ ধরনের ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এই এফডিসি থেকেই বছর দুয়েক আগে একটি ওয়েব ফিল্মের শুটিংয়ের সময় তাসনিয়া ফারিণের দামি মোবাইল ফোন চুরি হয়। অরুণা বিশ্বাসের ব্যাগ চুরি হয়, সেই ব্যাগে ছিল আইফোন, স্যামসাং ফোন, জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক কার্ড, বাসার চাবিসহ গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র। ওই সময় ক্ষোভ প্রকাশ করে অরুণা বিশ্বাস বলেছিলেন, ‘এফডিসিতে একটা চক্র তৈরি হয়েছে, সুযোগ পেলেই যারা চুরি করে। বহিরাগতদের নিয়ন্ত্রণ না করলে এমন ঘটনা চলতেই থাকবে।’ এফডিসিতে শুটিংয়ের সময় অভিনয়শিল্পী তাসনিয়া ফারিণেরও ফোন চুরির ঘটনা ঘটে।

এফডিসির নিরাপত্তাকর্মীদের বিরুদ্ধে টাকা নিয়ে বহিরাগতদের প্রধান ফটক পার করানোর অভিযোগ বহু পুরোনো। এফডিসিতে ‘গেট-বাণিজ্য’ চালু রয়েছে, অনেকবার কর্তৃপক্ষকে এ অভিযোগ জানিয়েছেন শিল্পী, প্রযোজক, পরিচালকেরা। অভিযোগের পর কিছুদিন কড়াকড়ি থাকে, এরপর আবার সেই আগের অবস্থা। একাধিকবার প্রবেশের পাস-ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এফডিসিতে প্রবেশের নিয়ম থাকলেও বাস্তবে তা অনেক সময় মানা হয় না। পরিচালক, প্রযোজক, শিল্পী কিংবা বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যদের পরিচয় ব্যবহার করে বহিরাগত ব্যক্তিরা সহজেই ভেতরে প্রবেশ করেন। প্রধান ফটকে নিরাপত্তারক্ষীরা বাধা দিলে প্রভাবশালী কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলিয়ে দেওয়া হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই নিয়ম উপেক্ষা করে প্রবেশের অনুমতি দিতে বাধ্য হন নিরাপত্তাকর্মীরা।

শিল্পীদের অভিযোগ, শুটিংয়ের ফাঁকে কিংবা ব্যক্তিগত সময়ে কিংবা আড্ডার সময়েও অনেক অচেনা ব্যক্তি ছবি তোলা, ভিডিও ধারণ কিংবা অযাচিতভাবে কাছে আসার চেষ্টা করেন। এরপর দেখা যায়, বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও ইউটিউবে উদ্ভট সব শিরোনাম দিয়ে কনটেন্ট প্রকাশ করেন। এতে তাঁদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হয়। বিশেষ করে জনপ্রিয় নায়ক–নায়িকাদের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটে বলে জানা গেছে।
শুধু গোপনীয়তা নয়, নিরাপত্তার বিষয়টিও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। অতীতে এফডিসিতে চুরি, শুটিং সরঞ্জাম হারিয়ে যাওয়া, বিভিন্ন সেট ও কক্ষ থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র উধাও হওয়ার অভিযোগও এসেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, এফডিসিতে ঢোকার ক্ষেত্রে প্রশাসনের দুর্বলতা থাকায় এসব ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

চলচ্চিত্রের জেষ্ঠ্য পরিচালক, প্রযোজক এবং সময়ের ব্যস্ত নায়ক–নায়িকাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলোর এই প্রতিবেদক। তাঁদের মতে, এফডিসি কোনো বিনোদন পার্ক নয়; এটি একটি পেশাদার কর্মক্ষেত্র। শিল্পী–পরিচালক, প্রযোজক–কলাকুশলী এখানে কাজ করবেন—এরপর তাঁরা এই জায়গা ছেড়ে চলে যাবেন। শুটিংয়ের সময় এখানে অবাধে দর্শনার্থী ঢোকার সুযোগ থাকলে শুটিং কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিল্পীদের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক কাজের পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা প্রায় সময়ই ঘটে থাকে। শুটিংয়ের সময়টাতে অবশ্য ইউনিটের লোকজনও এর সঙ্গে জড়িত থাকেন। তাঁদের মতে, এফডিসি নিয়ে হয়তো সাধারণ মানুষের আগ্রহ থাকতেই পারে, তাঁরা এটা পরিদর্শন করতেই পারেন—কিন্তু তা অবশ্যই একটা নির্দিষ্ট সময়ে এবং নিয়ম মেনেই যেন হয়।
এফডিসিতে বর্তমানে চলচ্চিত্র–সংশ্লিষ্ট ১৯টি সংগঠনের কার্যালয় রয়েছে। বিভিন্ন সংগঠনের নির্বাচন, সভা কিংবা বিশেষ আয়োজনের সময় উপস্থিতি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সেই সুযোগে বহিরাগত ব্যক্তিদের প্রবেশও বাড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে। নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, পরিচয়ের পাশাপাশি অনিয়মের মাধ্যমে ঢোকার সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগও দীর্ঘদিনের।

এ অবস্থায় প্রযোজক, শিল্পী, পরিচালক ও কলাকুশলীদের অনেকেই এফডিসিতে ডিজিটাল প্রবেশপত্র, দর্শনার্থী নিবন্ধনব্যবস্থা, সিসিটিভি নজরদারি জোরদার এবং অনুমতি ছাড়া ঢোকা সম্পূর্ণ বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, দেশের চলচ্চিত্রশিল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনায় শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। নইলে যেসব তারকা, পরিচালক কিংবা প্রযোজক নিয়মিত কাজ করেন, তাঁরা আরও বেশি এই প্রতিষ্ঠানবিমুখ হয়ে পড়বেন।

এদিকে চলচ্চিত্র–সংশ্লিষ্ট একাধিক সংগঠনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, বহিরাগত ব্যক্তিদের ঢোকা বন্ধে এফডিসিকে কঠোর হতে হবে। এখানকার সবকিছুর দায়ভার তাদের। এই প্রতিষ্ঠানকে তারা যেভাবে পরিচালিত করবে—সেভাবেই পরিচালিত হবে।
এফডিসির প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বহিরাগত প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে নতুন করে কড়াকড়ি আরোপ করা হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশা করছেন, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শিল্পীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা, বহিরাগত ব্যক্তিদের ঢোকা বন্ধ, নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং এফডিসির পেশাদার পরিবেশ বজায় রাখা সহজ হবে। এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা রহমান বলেন, ‘আমাকে জানানো হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিক পরিচয় দিয়েও কেউ কেউ ঢোকেন। আমরা এখানে সাংবাদিকদের একটা ডেটাবেজ তৈরি করছি। সবার ক্ষেত্রে এফডিসির আলাদা পরিচয়পত্র থাকছে। এর বাইরে এখানে কারোরই ঢোকার অনুমতি থাকবে না। এমনকি সমিতির দায়িত্বশীল যাঁরা রয়েছেন, তাঁদেরও আমরা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছি, সদস্যদের বাইরে কেউ যেন এখানে ঢুকতে না পারেন। এ ব্যাপারে সবার আন্তরিক সহযোগিতাও চেয়েছি।’








