মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থামিয়ে হরমুজ প্রণালিতে আবারও স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই গত জুনে ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ চুক্তিকে বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসাবেও তুলে ধরেন তিনি। কিন্তু চুক্তির এক মাস না পেরোতেই পরিস্থিতি উলটোদিকে মোড় নিয়েছে। প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা, হরমুজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তেহরানের নতুন দাবি এবং যুক্তরাষ্ট্রের পালটা সামরিক অভিযানে নতুন করে অস্থির হয়ে উঠেছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, হরমুজ প্রণালি নিরাপদ করার বদলে ট্রাম্পের কৌশল উলটো ইরানের অবস্থানই আরও শক্তিশালী করেছে।
রোববার দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বাণিজ্যিক তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজগুলো ওমান উপকূলসংলগ্ন দক্ষিণ দিকের একটি রুট ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করছিল। মার্কিন নৌবাহিনী রেডিওর মাধ্যমে দিকনির্দেশনা দিত এবং প্রয়োজনে আকাশপথে নিরাপত্তা সহায়তাও দেওয়া হতো। এই ব্যবস্থার ফলে মে ও জুনে ধীরে ধীরে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করেছিল।
গত জুনের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির পর এটিকে বড় সাফল্য হিসাবে তুলে ধরে বিশ্বজুড়ে জাহাজ চলাচল ও তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। কিন্তু সমালোচকদের মতে, চুক্তির কয়েকটি ধারা এতটাই অস্পষ্ট ছিল যে, ইরান সেগুলো নিজেদের পক্ষে ব্যাখ্যা করার সুযোগ পেয়েছে। বিশেষ করে একটি ধারায় বলা হয়, ইরান ‘সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার মাধ্যমে’ বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ভাষা ইরানকে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচলের ওপর বিশেষ কর্তৃত্ব দাবি করার সুযোগ দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর তথ্যানুযায়ী, গত মঙ্গলবার ওমান উপকূলঘেঁষা দক্ষিণ রুটে চলাচলকারী তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায় ইরান। এর জবাবে ট্রাম্প ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় বিমান হামলার নির্দেশ দেন। এরপর ইরানের নৌবাহিনী ঘোষণা দেয়, তারা আরও একটি জাহাজে গুলি চালিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ অব্যাহত থাকলে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে।
এদিকে ট্রাম্পও বলেছেন, জুনের সমঝোতা কার্যত আর কার্যকর নয়। ফলে আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে তা নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়পক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, দীর্ঘ মেয়াদে এই সংঘাতের বড় ধাক্কা আগে কে সামলাতে পারবে, ইরানের অর্থনীতি, নাকি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ৫ সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে পালটাপালটি হামলার প্রভাব পড়েছে হরমুজ প্রণালিতে। জাহাজ পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, রোববার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র ছয়টি জাহাজ চলাচল করেছে, যা গত পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন।
প্রণালি ছেড়ে যাওয়া জাহাজগুলোর মধ্যে ছিল ‘হিউম্যানিটি’ নামের একটি ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার, যা প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল ইরানি অপরিশোধিত তেল বহন করছিল। এছাড়া ‘ক্যাপেটান আন্দ্রেয়াস’ নামের একটি ট্যাংকার প্রায় ৫ লাখ ব্যারেল কুয়েতি তেলজাত পণ্য নিয়ে প্রণালি অতিক্রম করেছে। জাহাজ পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠানটি আরও বলছে, হরমুজ প্রণালিতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বহনকারী কোনো জাহাজ প্রবেশ করতে দেখা যায়নি।








