‘এমন দিনে তারে বলা যায় / এমন ঘনঘোর বরিষায়...।’ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কলমে বর্ষা কেবল একটি ঋতু হয়ে আসেনি, এসেছে এক পরম অনুভূতি হয়ে। রবীন্দ্রমানসের এক বিশাল অংশ জুড়ে ছিল আষাঢ়-শ্রাবণের মেঘ আর বৃষ্টির খেলা। শান্তিনিকেতনের উন্মুক্ত প্রান্তর কিংবা শিলাইদহের পদ্মার বুকে নৌকার ওপর বসে তিনি যেভাবে বর্ষার রূপকে ছুঁয়েছিলেন, তা বাংলা সাহিত্যকে এক চিরন্তন রোমান্টিকতা দিয়েছিল। তবে আজকের ইট-পাথরের খাঁচায় বন্দি জীবনে দাঁড়িয়ে বড়ই আক্ষেপের সঙ্গে বলতে হয়, আমাদের প্রকৃতি ও যান্ত্রিক সমাজ থেকে আজ সত্যি সত্যিই হারিয়ে গেছে রবীন্দ্রনাথের সেই স্নিগ্ধ, ভাবুক বর্ষা। রবীন্দ্রনাথের মতো বর্ষাকে এত গভীরভাবে আর কেউ ভালোবাসেনি। বর্ষার প্রথম জলকণা তার মনে জাগিয়ে তুলত সৃষ্টির আদিম উল্লাস। কখনো তিনি লিখেছেন, ‘নীল নবঘনে আষাঢ়গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে...’। আবার কখনো মেঘমল্লার রাগে ব্যাকুল হয়ে গেয়ে উঠেছেন, ‘হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে, ময়ূরের মতো নাচেরে...’।রবীন্দ্র-কাব্যে বর্ষা ছিল একাধারে বিরহ, মিলন, অন্তহীন অপেক্ষা আর আধ্যাত্মিকতার প্রতীক। ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ আর কদম-কেতকীর সুবাস কবিকে এক চেনা অথচ অচিনলোকে নিয়ে যেত। রবীন্দ্র অনুসারীদের কাছে বর্ষা মানেই ছিল জানলার ধারে বসে উদাস মনে সুদূরের পিয়াসী হওয়া। রবীন্দ্রনাথ যে বর্ষার রূপ দেখে মুগ্ধ হতেন, আজকের নাগরিক জীবনে তার লেশমাত্র অবশিষ্ট নেই। অপরিকল্পিত নগরায়ণ আর আকাশচুম্বী বহুতল ভবনের ভিড়ে আকাশের সেই ‘নীল নবঘন’ আজ উধাও। শহরের মানুষের কাছে আজ বর্ষা মানেই এক বিভীষিকা। কবি যে বর্ষায় কৃষ্ণের অভিসার দেখতেন, আজ শহরের পিচঢালা রাস্তায় তা রূপ নেয় অন্তহীন যানজট আর জলবদ্ধতায়। জানলা দিয়ে এখন আর দিগন্তজোড়া কালো মেঘের ভেলা দেখা যায় না; চোখে পড়ে শুধু সামনের ভবনের নিষ্প্রাণ দেয়াল। টিনের চালে বৃষ্টির যে ‘রুমঝুম’ নূপুরধ্বনি কবিকে আকুল করত, তার জায়গা নিয়েছে বহুতল ভবনের এসির যান্ত্রিক কর্কশ গর্জন। শহরের মানুষ আজ বৃষ্টি দেখলে মেঘমল্লার গায় না, বরং অফিস বা ঘরে ফেরার দুশ্চিন্তায় কপালে ভাঁজ ফেলে।শুধু শহরেই নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের করাল গ্রাসে খোদ ঋতুর চরিত্রই আজ বদলে গেছে। আষাঢ়-শ্রাবণ আসে, কিন্তু আকাশে সেই ঘনঘোর মেঘের ঘনঘটা আর দেখা যায় না। কখনো আষাঢ় মাস জুড়ে চলে তীব্র দহণ ও তাপদাহ, আবার কখনো কার্তিক-অগ্রহায়ণে এসে নামে অকাল বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়। প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনায় বর্ষা তার স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে ফেলেছে। যে নদী-নালা, খাল-বিল বৃষ্টির জলে থইথই করার কথা, তা আজ শুকিয়ে কাঠ কিংবা মানবসৃষ্ট বর্জ্যে মৃতপ্রায়। জলবায়ুর এই চরমভাবাপন্ন রূপ কবির মনকে আর সিক্ত করে না। বরং এক অজানা আশঙ্কায় ভরিয়ে দেয়। ঋতুর এই বিবর্তন যেন প্রকৃতির এক নীরব কান্না, যা আমরা বধিরতার কারণে শুনতে পাই না। স্মৃতির অ্যালবামে বর্ষার দিনগুলি আজকের ব্যস্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রজন্ম বৃষ্টির দিনে কাগজের নৌকা ভাসানোর অকৃত্রিম আনন্দ চেনে না। তাদের মেঘলা দিন কাটে স্মার্টফোনের চৌকো স্ক্রিনে কিংবা ওটিটি প্ল্যাটফর্মের ভার্চুয়াল জগতে। খিচুড়ি-ইলিশের সেই পারিবারিক চিরায়ত আড্ডা কিংবা বৃষ্টির জলে ভিজে বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলার নির্মল আনন্দ আজ যান্ত্রিক জীবনের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে। শৈশবের সেই বৃষ্টিবিলাসের দিনগুলো আজ শুধুই ডায়েরির পাতায় বন্দি স্মৃতি। কবির খাতার পাতা ওল্টালে এখনো বর্ষার সুবাস পাওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু বাস্তব পৃথিবী থেকে সেই রূপ দিন দিন ফিকে হয়ে আসছে। কৃত্রিমতার এই যুগে এসে তাই খুব আক্ষেপের সঙ্গেই বলতে হয়-প্রকৃতির অবহেলা আর আমাদের তীব্র যান্ত্রিকতার ভিড়ে সত্যি হারিয়ে গেছে কবিতার সেই চিরায়ত, স্নিগ্ধ বর্ষা। কদম ফুলের শাখাগুলো আজ শূন্য, আর কবির কলম আজ বর্ষার মেঘ দেখে নয়, বরং প্রকৃতির এই ধ্বংসযজ্ঞ দেখে বেদনায় স্তব্ধ হয়ে থাকে।পরিবেশ বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে আমরা ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ বা ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ বলি, তা মূলত বাংলা সাহিত্যের চিরচেনা ষড়ঋতুর কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দিয়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে ঢাকা বা কলকাতার মতো মেগাসিটিগুলো আজ একেকটি ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ বা ‘নগর তাপদ্বীপে’ পরিণত হয়েছে। চারপাশের কংক্রিটের দেয়াল আর পিচঢালা রাস্তা দিনের বেলা যে বিপুল পরিমাণ উত্তাপ শোষণ করে, তা রাতের বেলা বাতাসে ছেড়ে দেয়। ফলাফলস্বরূপ, বর্ষার সেই চিরায়ত স্নিগ্ধ ও শীতল হাওয়া আজ উধাও। বায়ুমণ্ডলের এই অস্বাভাবিক উষ্ণতা এবং ‘এল নিনো’র মতো বৈশ্বিক জলবায়ুগত পরিবর্তনের কারণে মেঘের আচরণ বদলে গেছে। এখন আর আষাঢ় জুড়ে রিনিঝিনি সুদীর্ঘ বৃষ্টি হয় না; বরং মেঘ ভেঙে একনাগাড়ে ‘ক্লাউডবার্স্ট’ বা অতিবৃষ্টি হয়, যা রোমান্টিকতার বদলে আকস্মিক বন্যা আর নাগরিক দুর্ভোগ নিয়ে আসে। এককালে টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ শুনে কবিরা বিরহ আর প্রেমের কবিতা লিখতেন। পদার্থবিজ্ঞানের শব্দতত্ত্বের নিয়মে টিনের পাত আর বৃষ্টির জলকণার সংঘর্ষে যে এক ধরনের ছন্দময় কম্পন তৈরি হতো, তা মানুষের মস্তিষ্কে ‘হোয়াইট নয়েজ’ এর মতো কাজ করত। যে নয়েজ মনকে শান্ত ও সৃজনশীল করতে সাহায্য করত। আজকের বহুতল ভবনের পুরু কংক্রিটের ছাদ আর কাঁচের থাই জানলা সেই প্রাকৃতিক সুরকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে দিয়েছে। আধুনিক মানুষের কানে বৃষ্টির শব্দ আর পৌঁছায় না; তার বদলে সেখানে স্থান করে নিয়েছে ঘরের ভেতরের এসির যান্ত্রিক গর্জন আর বাইরের সড়কের হাইড্রোলিক হর্নের তীব্র শব্দদূষণ। বিজ্ঞান বলছে, এই যান্ত্রিক কোলাহল মানুষের মস্তিষ্কের ডোপামিন ও সেরোটোনিনের মতো ‘ফিল গুড’ হরমোনের ক্ষরণ কমিয়ে দেয়। ফলে মেঘলা দিনে মানুষের মনে এখন আর কাব্যের জন্ম হয় না, বরং ভর করে একঘেয়েমি ও বিষণ্ণতা।রবীন্দ্রনাথের বর্ষা যেমন হারিয়ে গেছে, তেমনি হারিয়ে যাচ্ছে সেই বর্ষার প্রধানতম অনুষঙ্গ ও অলংকার-কদম আর জলজ ফুলের মেলা। একসময় আষাঢ়ের প্রথম বৃষ্টি মানেই ছিল গাছে গাছে কদম ফুলের সোনালি-সাদা গোলকের আভা। যা বর্ষার আগমনী বার্তা বহনকারী এক জীবন্ত সূচক। বিল-ঝিল আর ডোবাগুলো সেজে উঠত শাপলা, পদ্ম আর কলমি ফুলের চাদরে। কিন্তু আজকের বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট পরিবেশ বিপর্যয়ের রূঢ় থাবা বর্ষার এই চিরচেনা জলজ ফুলের ক্ষেত্রেও। বলা যায় ফুলগুলো আজ অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে। তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে কদম কিংবা শাপলার মতো বর্ষাকালীন ফুলগুলো তাদের সঠিক সময়ে ফোটার চক্র হারিয়ে ফেলছে।রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতার পাতায় এখনো আষাঢ়ের মেঘ জমে, শ্রাবণের ধারা ঝরে। কবির সাহিত্যের বর্ষা ছিল স্নিগ্ধতার, রোমান্টিকতার এবং পুনর্জন্মের। কিন্তু জলবায়ুর অভিঘাতে তা রূপ নিয়েছে চরম প্রাকৃতিক সংকটে। মেঘের ডাক শুনলে এখন আর মনে উদাসীনতা আসে না। উল্টো কৃষকের মনে জাগে ফসলের ক্ষয়ক্ষতির ভয়, আর নগরবাসীর মনে জাগে জলাবদ্ধতার আতঙ্ক। রবিঠাকুরের সেই ‘সোনার তরী’র ভরা নদী আজ শুকিয়ে কাঠ, কিংবা পলি জমে মৃতপ্রায়। নদী-নালা ভরাট আর নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে প্রকৃতি হারিয়েছে তার স্বাভাবিক আর্দ্রতা। ফলে মেঘ জমেও বৃষ্টি না হয়ে তা বাতাসে মিলিয়ে যায়। এখন আষাঢ় জুড়েই দেখা যায় তীব্র দাবদাহ আর খরা। মেঘে মেঘে আকাশ ছেয়ে যাওয়ার বদলে সূর্যের প্রখর তাপ মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির সেই ভারসাম্য আজ আর নেই।হারিয়ে গেছে রবীঠাকুরের গান, কবিতা, গল্প, উপন্যাসের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে থাকা সেই বর্ষার স্নিগ্ধ-ভাবুক রূপ। লেখক: কবি ও সাংবাদিক
রাজনীতি
হারিয়ে গেছে রবীঠাকুরের স্নিগ্ধ বর্ষা

শেয়ার করুন







